এ মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে আতঙ্ক ও নিরাশার দূতটি অবশ্যই করোনাভাইরাস। জীবাণুটির সংহারমূর্তি পৃথিবীব্যাপী মানুষের ত্রাসের কারণ। ভাইরাস বনাম মানুষের যুদ্ধে মানুষ যেন এক পরাভূত ও অসহায় সৈনিক! ১৯১৮ সালে আমেরিকাসহ কয়েকটি রাষ্ট্রে যে ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারী দেখা গিয়েছিল, তাতে পাঁচ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিলেন। পৃথিবীতে মোট জনসংখ্যার অনুপাত হিসাব করলে আজকের হিসাবে ওই সংখ্যা বিশ কোটি দাঁড়াবে। ১৯১৮ সালে গবেষকদের হাতে যন্ত্রপাতি কিছুই ছিল না। ভাইরাস দেখতে কেমন, তা জানা ছিল না। একশ দুই বছরে গবেষণা অনেকটা এগিয়েছে। এখন ভাইরাসকে যন্ত্রে দেখা যায়। তার জিনগত উপাদানও জানা যায়। তথাপি করোনাভাইরাস সংক্রমণ ‘প্যানডেমিক’ বা ‘অতিমারি’ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে, সাধারণ অর্থে আমরা যেটাকে বলছি ‘বৈশ্বিক মহামারী’। একশ দুই বছর আগের মতো না হলেও, মানুষ এখনো ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধে যথেষ্ট অসহায়।
এই ভাইরাসের ভয়াবহ সংক্রমণ হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিল, বিশ্বায়ন আমাদের বিশ্বকে কোথায় নিয়ে এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী দুনিয়ায় এর আগে এপিডেমিক/প্যানডেমিক/নাইন-ইলেভেন কোনো কিছুতেই এমন দেখা যায়নি যে, গোটা পৃথিবীর সব লোক একই সঙ্গে একটি কথাই ভাবছে আর কিছুই ভাবছে না এবং সবাই একই পরিমাণ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ব্যগ্র হয়ে উঠেছে। এর পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিরাট ভূমিকা আছে নিশ্চয়ই। বর্তমানে যে পরিস্থিতি, তাতে করোনাভাইরাস নিয়ে উপেক্ষা, অবজ্ঞা, ঠাট্টা-তামাশার দিন আর নেই। এখন সিরিয়াস হতে হবে। সিরিয়াস হতে হবে সরকার ও রাজনৈতিক দলকে, একই সঙ্গে নাগরিকদেরও। কারণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে করোনার বিস্তার আর মারণ থাবা। গোটা বিশ্ব আজ এই ভাইরাসের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। এর পরিণতি কী হবে, কবে, কোথায় গিয়ে থামবে, তা কেউই বলতে পারছে না।
করোনাভাইরাস শুধু মানুষকেই নয়, অর্থনীতিকেও পর্যুদস্ত করে ফেলেছে। বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারের পতন বলছে, অর্থনীতিও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। ২০০৩ সালে যখন গোটা দুনিয়ায় সার্স সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে, শেয়ারবাজারে তখন পরিস্থিতি তখন এমন হয়নি। বরং ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লেম্যান ব্রাদার্সের পতন-পরবর্তী অবস্থার সঙ্গে ২০২০ সালের মিল অনেক বেশি। অর্থনীতি নিয়ে বর্তমানে সবাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। কারণ এই মহামারীর কারণে বিভিন্ন দেশে যে ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা হচ্ছে, তার কোনোটিই অর্থনীতির পক্ষে ইতিবাচক নয়। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে দোকান-বাজার বন্ধ; কলকারখানায় তালা ঝুলছে; পর্যটক নেই; একের পর এক বিমান বাতিল হচ্ছে, দেশের দরজা বন্ধ হচ্ছে বিদেশিদের জন্য অর্থাৎ, যে চাকাগুলোর ওপর ভর করে অর্থনীতির গাড়ি চলে, করোনাভাইরাসের দাপটে সেগুলো অচল হয়েছে। বাজার স্তব্ধ হলে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব একদিকে পড়ে রাজকোষের ওপর কর আদায়ের পরিমাণ কমতে থাকে; অন্যদিকে, বাজারের ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত হয় একবার চাহিদার অভাবে মার খেলে সেই ঘাটতি পুষিয়ে ফিরে আসা অনেক সংস্থার পক্ষেই কঠিন কাজ। সবচেয়ে চিন্তার বিষয়, ভাইরাসের দাপট কমলেই যে অর্থনীতিও মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে, সেই নিশ্চয়তা নেই। ফলে, বাজারের প্রতিক্রিয়াটি স্বাভাবিক ও অনিবার্য।
এ অবস্থায় বাজারের ঘাটতি আংশিকভাবে হলেও পুষিয়ে দেওয়ার দায়িত্বটি সরকারের ওপর বর্তায়। বিশ্বের বহু দেশের সরকারই ব্যয়বরাদ্দ বাড়িয়েছে। অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই সরকারকে এই সময়ে টাকাটা খরচ করা উচিত। আর্থিকভাবে বেকায়দায় পড়া সংস্থাগুলো এই ধাক্কা সামলাতে অধিক মুশকিলে পড়বে। তেমন সংস্থার জন্য ঋণ পুনর্গঠন ইত্যাদির কথা সরকারকেই ভাবতে হবে। বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে অন্য একটি শ্রেণির কথাও অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের কথা। আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এই কথাটির গুরুত্ব অপরিসীম। বাজার বন্ধ হলে অসংগঠিত ক্ষেত্রের অধিকাংশ শ্রমিকের বেতনও বন্ধ। ফলে, তাদের অনেকেরই প্রাত্যহিক সংসার খরচটুকুরও সংস্থান থাকবে না। এই মানুষগুলোর কথা সরকারকেই ভাবতে হবে। এই বিপুল বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়ে সরকারকে রাজকোষ ঘাটতির ভাবনাকে সাময়িকভাবে সরিয়ে রাখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় সংকোচনের পাশাপাশি অপব্যয় কমানোর ব্যাপারেও সরকারকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। যেসব মানুষের দেহে আগে থেকেই বিভিন্ন রোগব্যাধি আছে, করোনাভাইরাস তাদের ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী হচ্ছে বলে চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন। কথাটি অর্থনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যে দেশের আর্থিক অবস্থা আগে থেকেই টলমল করছে, এই ভাইরাসের ধাক্কায় তাদের বিপদ বহু গুণ বেশি। বাংলাদেশ তেমন অর্থনীতির একটি মোক্ষম উদাহরণ। বিপুল মন্দার মুখে দাঁড়িয়ে আছে দেশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ঘাটতি রয়েছে, বিভিন্ন রপ্তানিপণ্যের কার্যাদেশ বাতিল হচ্ছে, কর্মসংস্থান কমছে। রাজকোষ ঘাটতির পরিমাণ কোনোভাবেই লক্ষ্যসীমায় বাঁধা সম্ভব হচ্ছে না। টাকা পাচার, লুটপাট, ব্যাংকিং খাতে সংকট, দুর্নীতি লাগামহীন। এই অবস্থায় অর্থনীতি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে সেই ধাক্কা সামলানো যে কঠিন হবে, তা নিশ্চিত। গত কয়েক বছরে অর্থনীতি যে ভঙ্গিতে পরিচালিত হয়েছে, তাতে কোনো কিছুই আশা করা দুষ্কর। তবু ক্ষীণ আশা, করোনাভাইরাসজাত আর্থিক সমস্যার শাকে সরকার অর্থনীতির গভীর স্বাস্থ্যভঙ্গের বিপদটিকে ঢাকতে চাইবে না। এ অবস্থায় কী কর্তব্য, তারা যদি না জানেন, তবে বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিতে হবে। কিন্তু কিছুই হয়নি, আমরাই সব সামলাতে পারব, এমন মিথ্যা অহংকারের হাতে দেশকে ছেড়ে দিলে মহাবিপর্যয় গ্রাস করবে।
সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদেরও এখন সিরিয়াস হওয়ার পালা। করোনাভাইরাস নিয়ে এখনো এক শ্রেণির মানুষ রসিকতায় মত্ত রয়েছে। হাস্যরস নিশ্চয়ই খুব ভালো জিনিস, কিন্তু যেকোনো বিষয় নিয়ে কাণ্ডজ্ঞানহীন হাসাহাসি, আমাদের লঘু-গুরু জ্ঞান গুলিয়ে দেয়। যদি আমরা এমন ভয়াবহ মহামারীর কালেও তা নিয়ে খুব কৌতুকের সঞ্চার ঘটাই, তা ফেইক নিউজের মতো ক্ষতিকর না হলেও আমাদের সংকট মুহূর্তের গুরুত্ব থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিতে পারে। এ মুহূর্তে আমাদের মূল কর্তব্য সচেতনতা ও বিপদ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান। টয়লেট পেপার নিয়ে ‘মিম’ হচ্ছে, মাস্ক বা মুখোশ তো ব্যাপক বিনোদনের খোরাকে পরিণত হয়েছে। মাস্ক নিয়ে এমন ‘মিম’ হচ্ছে যে, বোঝা দায় কে সত্যিই ঘরোয়া বস্তুর সাহায্যে মাস্ক নির্মাণের পরামর্শ দিচ্ছে, কে রসিকতা করছে। সর্বোপরি, এ ধরনের রসিকতা আক্রান্তের ও তার প্রিয়জনের প্রতি, আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে বেপথু মানুষের প্রতি, অত্যন্ত অসংবেদনশীল চিত্তবৃত্তির পরিচায়ক, যা বহু মৃত্যুর, তীব্র ভীতির, উদ্বেগের কারণ, যার কারণে বিশ্বব্যাপী ক্ষতির পরিমাপ করা দুঃসাধ্য, যার পরিণতি এখনো ভেবে ওঠা যাচ্ছে না, তা নিয়ে হেসে লুটিয়ে পড়াটা মোটেও আদর্শ কাজ নয়। এ দেশের ধর্মের বয়ানকারী এক শ্রেণির মানুষ করোনাভাইরাস ও চীনাদের নিয়ে যা বলছেন, যা রটাচ্ছেন, তাকে তো রীতিমতো ‘হেট ক্রাইম’ বলা যেতে পারে। আবার অনেকে প্রকাশ্যে করোনা-পার্টি আয়োজনের সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করছেন! এটাকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। কুলখানি, শ্রাদ্ধবাসর বা দুর্ভিক্ষ উপলক্ষে আমোদ-মজলিশ বসিয়ে দিলে, তা অবশ্যই অনুভূতিহীন ও অশিষ্ট বলে বিবেচিত হবে এটা ভাইরাসের মতো যত কম ছড়াবে ততই মঙ্গল।
না, এখন যদি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের শাশ্বতী স্মরণ করে আনমনে ‘একটি নিমেষ দাঁড়াল সরণি জুড়ে, থামিল কালের চিরচঞ্চল গতি’ আওড়ানো কিংবা সুবহে সাদিকের আগে তিনটি থানকুনি পাতা চিবিয়ে খাওয়ার হুজুগে মাতার সময় নয়। দোয়া, ফুঁ নিতে হাজার হাজার মানুষের পেছনে দাঁড়ানোরও সময় নয়। ‘বাঙালির ইমিউউন ক্ষমতা অনেক ভালো, এই ভাইরাস আমাদের কাবু করতে পারবে না’ এমন নির্বোধ আত্মতুষ্টিতে ভোগার সময়ও নয়। পৃথিবী জুড়ে সংক্রমণের তাড়নায় ও আতঙ্কে ক্রমশ নিশ্চল, নীরব ও গৃহবন্দি হচ্ছে পৃথিবীর মানুষ। অদূর ভবিষ্যতে, কিংবা অচিরেই সেই নীরব নিশ্চল বন্দিত্ব আরও বহু দেশ, বহু শহর এবং বহু মানুষের অস্তিত্বকে দখল করবে না, কভিড-১৯ নামের অতিসংক্রামক ঘাতক ব্যাধি আক্ষরিক অর্থে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠবে না, এমন কোনো নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না। এখন কেবল ঈশ্বর, ধর্মগুরু বা গোচোনা কিংবা লতাপাতার ওপর আস্থা রাখার সময় নয়, ইয়ার্কি, অবজ্ঞা আঁতলামিরও সময় নয়, এখন যুদ্ধের সময়। এই যুদ্ধটা করোনাভাইরাস থেকে মানুষের আত্মরক্ষার যুদ্ধ। সেই যুদ্ধ মানুষকেই লড়তে হবে। লড়তে হবে বুদ্ধি, বিবেচনা এবং প্রত্যয়ের সঙ্গে। একযোগে।
বাংলাদেশের জন্য এ মুহূর্তে এই সামাজিক দূরত্ব লালন করার প্রয়োজন অস্বাভাবিক ধরনের বেশি, কারণ আগামী দুই থেকে চার সপ্তাহ সংক্রমণের গতি রোধ করে রাখতে পারলে বড় বিপদ এড়ানোর সম্ভাবনা অনেকটা বাড়তে পারে। নিশ্চয়তা নয়, সম্ভাবনা। কিন্তু নিশ্চয়তা আপাতত অলীক স্বপ্ন, সম্ভাবনা যথাশক্তি বাড়ানোর চেষ্টাই একমাত্র করণীয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য চাই আরও সতর্কতা ও নিরলস প্রচেষ্টা। রাষ্ট্র ও সমাজ সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিক কাণ্ডজ্ঞানের নির্দেশ মেনে চললে এই যুদ্ধে জয়ী না হওয়ার কোনো কারণ নেই।
লেখক
লেখক ও কলামনিস্ট
