চট্টগ্রামে আইসোলেশনে কিশোর ও নারীর মৃত্যু

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২০, ০১:০৬ এএম

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন ইউনিটে জ্বর-কাশি নিয়ে চিকিৎসাধীন এক কিশোর গতকাল বুধবার সকালে মারা গেছে। আনুমানিক ১৪ বছর বয়সী ওই মাদ্রাসাশিক্ষার্থী কক্সবাজারের বাসিন্দা বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি। এছাড়া ফৌজদারহাটের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিসে (বিআইটিআইডি) আইসোলেশনে থাকা এক নারী মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে মারা গেছেন। বিআইটিআইডি পরিচালক অধ্যাপক এম এ হাসান চৌধুরী জানিয়েছেন, পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে ৫০-৫৫ বছরের ওই নারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন না।  এদিকে শ্বাসকষ্ট নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে মঙ্গলবার রাতে বুলবুল আহমেদ (২৩) নামে এক

তরুণ মারা গেছেন। ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলায় মঙ্গলবার রাতে জ্বর ও ডায়রিয়ায় আলভী (৩) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। এরপর তার পরিবারের সদস্যদের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।

অন্যদিকে নড়াইল সদর হাসপাতালে গত মঙ্গলবার রাতে মৃত্যুর পর শওকত আলী (২৫) নামে এক তরুণকে জানাজা ও গোসল ছাড়াই দাফন করেছেন স্বজনরা। গতকাল সকালে তার বাড়ি ‘লকডাউন’ করে দিয়েছে প্রশাসন। এছাড়া শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে আইসোলেশনে থাকা এক তরুণ গত মঙ্গলবার রাতে মারা গেছেন। পরে ওই ব্যক্তিরসহ আশপাশের পাঁচটি বাড়ি ‘লকডাউন’ করা হয়েছে। তাছাড়া গতকাল ফেনী সদরে শ্বাসকষ্টে তরুণ (৩০) এবং সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে জ্বর ও শ্বাসকষ্টে নারীর মৃত্যুর পর এলাকায় আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম : সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে জেনারেল হাসপাতালে এক কিশোর মারা যায়। সে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিল কি না, তা পরীক্ষার জন্য বিআইটিআইডির একটি টিম এসে নমুনা সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি ছেলেটির বাবারও নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার নাথ বলেন, ‘ওই কিশোর বেশ কয়েক দিন আগে জ্বর-কাশি নিয়ে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। সেখানে পরীক্ষায় নিউমোনিয়া ধরা পড়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য মঙ্গলবার তাকে চমেক হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে তাকে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’

এদিকে বিআইটিআইডির পরিচালক অধ্যাপক এম এ হাসান চৌধুরী বলেন, গত মঙ্গলবার রাতে সেখানে আইসোলেশন ইউনিটে মারা যাওয়া আনুমানিক ৫০-৫৫ বছরের ওই নারী করোনাভাইরাসমুক্ত ছিলেন। তার পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাসিন্দা ওই নারী শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে ভুগছিলেন।

বিআইটিআইডির ল্যাব ইনচার্জ ডা. শাকিল আহমেদ বলেন, বুধবার আরও আটজনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। তাদের রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে গতকাল পর্যন্ত ৪২ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়েছে। কারও শরীরেই করোনার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

রাজশাহী : রামেক হাসপাতালে করোনা চিকিৎসা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. আজিজুল হক আজাদ বলেন, শ্বাসকষ্ট নিয়ে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে হাসপাতালে ভর্তির পর বুলবুলকে ৩৯নং ওয়ার্ডে নেওয়া হয়। সেখানে অক্সিজেন দেওয়ার সময়ই তিনি মারা যান। তার অ্যাজমা ছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি।

বুলবুলের বাড়ি নাটোরের লালপুর উপজেলায়। তার চাচাতো ভাই ইসরাইল হোসেন জানান, বুলবুল দীর্ঘদিন ধরেই শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। মঙ্গলবার বিকেলের পর তার সমস্যা বেড়ে যায়। প্রথমে তাকে বাড়িতেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ঝালকাঠি : কাঁঠালিয়া উপজেলার আমুয়া স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা তাপস কুমার তালুকদার বলেন, বাড়িতেই আলভীর মৃত্যু হয়েছে। তারপর ওর পরিবার ওকে হাসপাতালে এনেছিল। পরে রাতে আধা ঘণ্টার মধ্যেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার ওসি, স্থানীয় চেয়ারম্যানসহ আমি নিজে সরদারপাড়ায় ওদের বাড়িতে যাই। খোঁজ নিয়ে জানলাম, ওই বাড়ির পরিবারগুলোর মধ্যে কারও কারও জ্বর ও সর্দি রয়েছে। তাই বাড়ির ছয়টি পরিবারের ৩০ জনকে ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার নির্দেশ দিয়েছি।

নড়াইল : নড়াইল সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার মশিউর রহমান বাবু বলেন, মিনি স্ট্রোকে শওকত আলীর (২৫) মৃত্যু হয়েছে। তার স্বজন বাবু মোল্যা জানান, নড়াইল পৌরসভার দক্ষিণ নড়াইলের ওমর আলীর ছেলে সুপারি ব্যবসায়ী শওকতের এক সপ্তাহ আগে জ্বর, কাশি, সর্দি, শ্বাসকষ্ট, শরীর ব্যথা ও বমি হয়। পরে পরিবারের পক্ষ থেকে করোনাসংক্রান্ত হটলাইনে ফোন করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এরপর তাকে একটি প্রাইভেট চেম্বারে দেখানো হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় মঙ্গলবার রাত পৌনে ৯টার দিকে তাকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ওয়ার্ডে নেওয়ার মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, রাত ১টার দিকে জানাজা ও গোসল ছাড়াই পৌরসভার দক্ষিণ নড়াইল কবরস্থানে শওকতকে দাফন করা হয়। এ সময় তার দুলাভাই, বড় ভাইসহ ৩-৪ জন এবং পুলিশ উপস্থিত ছিল। তবে মৃতদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি।

এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. আবদুল মোমেন বলেন, ‘আইইডিসিআরের প্রতিনিধির সঙ্গে বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে কথা হলে তারা জানিয়েছেন, শওকত স্ট্রোকে মারা গেছেন। সেজন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি।’

সদর থানার ওসি মো. ইলিয়াছ হোসেন জানান, গতকাল সকাল ৯টার দিকে জেলা প্রশাসন এবং থানা পুলিশ ওই বাড়িতে গিয়ে লালপতাকা টানিয়ে বাড়ি লকডাউন করেছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে বাড়ির বাইরে না আসতে মাইকিং করা হয়েছে।

শরীয়তপুর : শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, শ্বাসকষ্ট, জ্বর ও কাশি থাকা এক তরুণ মঙ্গলবার মারা গেছে। তাকে হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। রাত ৯টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এর আগে ১৯ মার্চ কাশি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। পরীক্ষায় তার যক্ষ্মা রোগ ধরা পড়ায় চিকিৎসা শেষে ২৩ মার্চ তিনি বাড়িতে চলে যান।

সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মুনীর আহমেদ খান বলেন, তিনি নড়িয়া এলাকার বাসিন্দা। সে শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আসে। শারীরিক অবস্থা খারাপ ছিল তার। শ্বাসকষ্ট থাকায় তাকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছিল। ওই ব্যক্তির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।

সিভিল সার্জনের বরাত দিয়ে জেলা প্রশাসক কাজী আবু তাহের জানান, ওই ব্যক্তি কোনো প্রবাসীর সংস্পর্শে এসেছিল কি না, তার খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তার বাড়িসহ আশপাশের পাঁচটি বাড়ি লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও তার সংস্পর্শে আসা ২৩ ব্যক্তিকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। মৃতদেহ আইইডিসিআর ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী দাফন করা হবে।

ফেনী : সিভিল সার্জন ডা. সাজ্জাদ হোসেন জানান, গতকাল দুপুরে সদর উপজেলার পশ্চিম ছনুয়া গ্রামের বাড়িতে মারা যাওয়া তরুণের মৃতদেহ ফেনী জেনারেল হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। তার মৃত্যুর কারণ জানতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইইডিসিআরকে অবহিত করা হয়েছে।

পুলিশ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয়রা জানায়, গত ৪-৫ দিন আগে ওই তরুণের জ্বর ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। সোমবার তার স্বজনরা ফেনী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে এলে চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে বাড়িতে অবস্থানের পরামর্শ দেন। মঙ্গলবার রাত থেকে শ্বাসকষ্ট বাড়ার পর গতকাল দুপুরে তার মৃত্যু হয়। তিনি ফেনী সেন্ট্রাল হাইস্কুল সংলগ্ন একটি ওয়ার্কশপে কাজ করতেন।

সাতক্ষীরা : কালীগঞ্জ উপজেলার বিষ্ণুপর ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. মনিরুজ্জামান বলেন, বন্দকাটি গ্রামের আবদুস সালামের মেয়ে রাশিদা খাতুন শিল্পী (২৫) গত শুক্রবার পাশের ফতেপুর গ্রামের স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে আসেন। দুই সন্তানের জননী শিল্পীর কয়েক দিন ধরে জ্বর ছিল। সঙ্গে ছিল শ্বাসকষ্ট ও কাশি। এ অবস্থায় ভোরে তার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে এলাকাজুড়ে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।

স্বজনরা জানিয়েছেন, দুদিন ধরে শিল্পীকে গ্রাম্য চিকিৎসক রুহুল আমিনকে দেখানো হচ্ছিল। ওই চিকিৎসক বলেন, শিল্পীর শরীরে ১০৩ ডিগ্রি জ্বর ছিল। সঙ্গে ছিল শ্বাসকষ্ট ও কাশি। তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক রাসেল বলেন, বিষ্ণুপুর ইউনিয়নে জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্টে একজনের মৃত্যুর খবর শুনেছি। আমরা খোঁজ নিচ্ছি। (প্রতিবেদনটি চট্টগ্রাম ব্যুরো; নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী; ঝালকাঠি, নড়াইল, শরীয়তপুর, ফেনী ও সাতক্ষীরার প্রতিনিধির সহায়তায় তৈরি)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত