ঢাকার সুরক্ষায় সর্বাত্মক কঠোর পদক্ষেপ নিন

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২০, ১২:৩৯ এএম

সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকাগুলো। গত কয়েক দিনে দেশে যত ব্যক্তির করোনা শনাক্ত হয়েছে, তাদের মধ্যে বেশিরভাগই ঢাকার। একই সঙ্গে দেখা গেছে, সারা দেশে মোট করোনা শনাক্তদেরও প্রায় ৭৫ ভাগই ঢাকা বিভাগের। ঢাকা বিভাগে মোট ১৩ জেলার সবগুলোতেই এখন করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান-আইইডিসিআরের তথ্যানুসারে ঢাকা মহানগরের ১০৪টি এলাকায় করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এদিন রাজধানী ঢাকায় করোনা শনাক্ত মোট রোগীর সংখ্যা ৬০৮ জনে পৌঁছে গেছে। ঢাকার পর সর্বোচ্চ রোগী নারায়ণগঞ্জে। এরপরই ঢাকার চারপাশের গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ ও মানিকগঞ্জ জেলায় করোনা রোগীর সংখ্যা বেশি। অথচ এক সপ্তাহ আগেও এসব জেলায় রোগী ছিল না। দেখা যাচ্ছে চারপাশ থেকে রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে ফেলছে করোনা। এছাড়া ঢাকার চারপাশের জেলাগুলোর মধ্যে মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও ফরিদপুরেও এখন করোনা শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। বিশেষত, ঢাকা মহানগর নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ারও যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এ অবস্থায় করোনার গণ-সংক্রমণ ঠেকাতে বিপুল জনঘনত্বের ঢাকা মহানগরের জন্য সর্বাত্মক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।

দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বৃহস্পতিবার এক দিনেই ১০ জন মারা গেছেন। একই সময় দেশে করোনায় নতুন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন ৩৪১ জন। দেশে করোনায় এক দিনে মৃত্যু ও শনাক্তের এই সংখ্যা সর্বোচ্চ। এ নিয়ে দেশে করোনায় মোট মারা গেছেন ৬০ জন। আর মোট শনাক্তের সংখ্যা ১ হাজার ৫৭২ জন। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, করোনার এমন দ্রুত বিস্তারের পরিস্থিতিতেও দেশে করোনা পরীক্ষার হার এখনো অতি নগণ্য। বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে গড়ে ৮০ জনের কভিড-১৯ শনাক্তকরণের পরীক্ষা হচ্ছে বলে এক পরিসংখ্যানে জানিয়েছে করোনার হালনাগাদ তথ্য জানানো ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটার। দেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে যা একেবারেই কম। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায়ও করোনা পরীক্ষায় বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে। প্রতি ১০ লাখ মানুষে পাকিস্তানে ৩৩২, শ্রীলঙ্কায় ২২৩, নেপালে ২১৬ এবং ভারতে ১৭৭ জনের পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে শুরু করে দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও বলে আসছেন, করোনার গণবিস্তার রোধ করতে হলে লকডাউন, হোম কোয়ারেন্টাইন ও আইসোলেশনের পাশাপাশি ব্যাপক হারে করোনা পরীক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো, ঢাকাসহ সারা দেশের মোট ১৭টি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা সুবিধা বিস্তার করা হলেও করোনা পরীক্ষার হার আশানুরূপভাবে বাড়ছে না।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ দেশের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার গণবিস্তার শুরু হয়ে গেলে সেটা সামলানোর মতো সক্ষমতা আমাদের চিকিৎসা খাত বা স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর নেই। পশ্চিমা দেশগুলোর উন্নততর স্বাস্থ্যসেবা খাতও করোনার গণবিস্তার সামাল দিতে পারেনি। সে কারণেই লকডাউনসহ অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর আমাদের আরও বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিগত দিনগুলোর মতোই এখনো এসব ক্ষেত্রে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা দেখা যাচ্ছে। একদিকে, গরিব-হতদরিদ্র শ্রেণির মানুষ ও শ্রমিক-দিনমজুররা অভাবের তাড়নায় পথে নামছেন। আরেকদিকে, নাগরিকদের এক বিরাট অংশের মধ্যেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় সামাজিক দূরত্ব ও নিয়মকানুন মেনে চলায় অনীহা দেখা গেছে। কিন্তু সাধারণ ছুটি দীর্ঘায়িত করা, গণপরিবহন বন্ধ রাখা এবং মানুষজনের চলাচল নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে তৎপর রাখার পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংকট সমাধানে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাস্তবে সেগুলো কার্যকর হতে দেখা যাচ্ছে না। সরকারকে তাই এ বিষয়ে আরও সৃজনশীল ও আন্তরিক এবং প্রয়োজনে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। কেননা, এই অবস্থা কাটাতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

এ অবস্থায় দেশের সবচেয়ে বেশি সংক্রামিত অঞ্চল হিসেবে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী ঢাকার সুরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অনিবার্য। এজন্য সংক্রমণ কেন্দ্র বা ক্লাস্টার এলাকাগুলোকে সম্পূর্ণ লকডাউন করে সেসব এলাকায় ব্যাপক হারে করোনা পরীক্ষা বাড়াতে থাকতে হবে। পাশাপাশি ঢাকা এবং আশপাশের জেলাগুলোতেও পরীক্ষার হার দ্রুত হারে বাড়াতে হবে। ক্লাস্টার বা সংক্রমণ কেন্দ্রগুলোকে কঠোরভাবে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা, পরীক্ষার হার বাড়িয়ে শনাক্তদের চিকিৎসা দেওয়া এবং প্রয়োজনে ঢাকাকে সত্যিকার অর্থে লকডাউন করে সর্বসাধারণকে শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। খেয়াল করা দরকার, বৃহস্পতিবারই করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরিস্থিতিতে সারা বাংলাদেশকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এখন সংক্রমণের মূল কেন্দ্রগুলোকে পুরো নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে পুরো দেশে এই মহাদুর্যোগ মোকাবিলা করা অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত