দেশে করোনা শনাক্তের সংখ্যা মঙ্গলবার ৩ হাজার ৩৮২ জনে পৌঁছে গেছে। মৃত্যু ঘটেছে অন্তত ১১০ জনের। অন্যদিকে করোনা সংক্রমণের পর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন মোট ৮৭ জন। কেবল রাজধানী ঢাকা মহানগরেই করোনা শনাক্তের সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। লক্ষ করবার মতো বিষয় হলো, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলাকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী গাজীপুর, নরসিংদী এবং কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গেছে করোনা সংক্রমণের ‘হটস্পট’। গত এক সপ্তাহ ধরেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের অনলাইনে প্রচারিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে প্রচার করে আসছে, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে যাওয়া ব্যক্তিরাই বাকি চার জেলায় সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। পরে সেখানে সামাজিকভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। জেলাগুলোর সিভিল সার্জন এবং জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, এভাবে করোনা বিস্তারের ক্ষেত্রে এককভাবে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে এসব জেলায় দফায় দফায় গার্মেন্টস খোলা ও বন্ধ করার ঘোষণা এবং তৈরিপোশাক শিল্পসহ অন্যান্য কলকারাখানার শ্রমিকদের যাতায়াত। তার ওপর এসব জায়গা করোনার হটস্পট ঘোষণা করা সত্ত্বেও পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতে না পারা এবং মানুষজনকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ঘরবন্দি রাখতে না পারাকেও কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ও চারপাশের জেলাগুলোতে করোনার অত্যধিক বিস্তার সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান বলেন, একবার গার্মেন্টস খোলার সিদ্ধান্তের পর গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার আশপাশে প্রচুর গার্মেন্টসকর্মী প্রবেশ করে। এদের বেশিরভাগই আসে কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও ময়মনসিংহ থেকে। এরা আসার সময় রাস্তায় রোগটি ছড়াতে ছড়াতে আসে। পরে যখন গার্মেন্টস বন্ধ ঘোষণা করা হয়, তখন এরা কিছুদিন অবস্থান করার সময় ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে রোগটি ছড়াতে থাকে। পরে লকডাউন ঘোষণা করা হলে এরা যে যেভাবে পারে নিজ নিজ এলাকায় চলে যায় এবং এখনো যাচ্ছে। ফলে অন্য জেলাগুলোতেও রোগটি সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে। গাজীপুরের সিভিল সার্জন বলেন, গাজীপুরের অনেক পোশাক কারখানা খোলা। অনেক কারখানা কর্র্তৃপক্ষ বেতন না দেওয়ায় শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে। তাদের মাধ্যমে করোনাভাইরাস জেলায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের ঘনবসতিপূর্ণ শহর গাজীপুরকে এসব কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শহর লকডাউন করা হলেও নানা কারণে মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও তাদের নিবৃত করতে পারছেন না।
সাধারণ ছুটি ঘোষণা এবং সারা দেশে সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ করার পরও তৈরিপোশাক ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে খোলা ও বন্ধের ঘোষণা দিয়ে হাজার হাজার শ্রমিককে রাজপথে টেনে নামানোর সময় জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, এখন ঢাকা ও চারপাশের জেলাগুলোতে তার নির্মম বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। পরিতাপের বিষয় হলো, এমন বাস্তবতার মধ্যেও তৈরিপোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে কারখানা মালিকদের দীর্ঘসূত্রতা আর অদক্ষতায় বিভিন্ন স্থানে বিপুল জনসমাগমে শ্রমিক বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। অথচ এখনো পত্রিকায় শিরোনাম হচ্ছে, ‘শ্রমিকদের বেতন দেয়নি ৩৭০ কারখানা’। এসব বাস্তবতায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি যে পুরো দেশে করোনা বিস্তারের অন্যতম কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, কর্র্তৃপক্ষ সে বিষয়ে এখনো উদাসীন। অথচ, এ বিষয়ে শুরু থেকেই বারবার সতর্ক করা হয়েছিল। এখন আসন্ন রমজান মাসে সীমিত আকারে তৈরিপোশাক কারখানাসহ রপ্তানিমুখী শিল্পের অন্যান্য কারখানা সীমিত আকারে চালু করার পরিকল্পনায় এই উদ্বেগ আবার নতুন করে সামনে আসছে। কিন্তু সন্দেহ নেই যে, যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত না করে সেটা করা হলে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসকদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স বৈঠকে সীমিত আকারে কল-কারখানা চালুর প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কারখানা খুললে সেখানে স্বাস্থ্য নির্দেশিকা মেনে কীভাবে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো যেতে পারে তার উপায় বের করতে হবে। লক্ষণীয় যে, শ্রমিকদের থাকার জায়গার সুরক্ষা প্রসঙ্গে জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, প্রয়োজনে কারখানাগুলো যদি কোনো ভবন বা খালি জায়গায় শ্রমিকদের আবাসনের বিশেষ ব্যবস্থা করতে পারে তাহলে সেটা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে এভাবে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রমিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারলে রোজার মাসের মধ্যে সীমিত আকারে কিছু গার্মেন্টস ও শিল্পকারখানা চালু করা যেতে পারে বলে মত দেন প্রধানমন্ত্রী। এটা সত্যি যে, দেশের অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে আজ হোক কাল হোক কল-কারখানা খুলতেই হবে। এক্ষেত্রে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকদের আনা-নেওয়ার জন্য যথাযথ পরিবহনের ব্যবস্থা, শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, কারখানাসহ শ্রমিকদের বসবাসের স্থানগুলোতে জীবাণুনাশক ব্যবহারসহ আনুষঙ্গিক সব নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই তা করতে হবে। নইলে কেবল ঢাকাসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলই নয়, সারা দেশই করোনার মহামারী বিস্তারের ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়তে বাধ্য।
