আমাদের অভিভাবক জামিলুর রেজা চৌধুরী

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২০, ১২:৩৬ এএম

জামিল স্যারের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটে চতুর্থ বর্ষে পড়াকালীন অবস্থায়। কারণ তিনি আমাদের চতুর্থ বর্ষে ক্লাস নিতেন। এর আগে তিনি আমাদের ক্লাস নিতেন না। তিনি যেহেতু সেই সময়েই পথিকৃৎ প্রকৌশলী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছেন, তাই তার ক্লাস করার জন্য আমরা উন্মুখ ছিলাম। তিনি খুব নিখুঁতভাবে ক্লাস নিতেন। আমি খুব দুষ্টপ্রকৃতির ছাত্র ছিলাম। প্রায়ই ক্লাসে কথা বলতাম। তাই তিনি প্রায়ই আমাকে পড়া ধরতেন। তিনি এজন্য আমাকে মৃদু ধমক দিলেও কখনো রেগে যেতেন না।

এরপর আমরা যখন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলাম, তখন সহকর্মী হিসেবে কাজ করার সুযোগ হলো। কিন্তু সহকর্মী হিসেবে বেশিদিন কাজ করার সুযোগ হয়নি। কারণ আমি দুই বছর পর পিএইচডি করতে বাইরে চলে গেলাম। এরপর আমি যখন ফেরত আসলাম, তার এক বছরের মাথায় তিনি আগাম অবসরে চলে গেলেন। পাঁচ বছর বাকি থাকলেও তিনি আগাম অবসর নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু তার সঙ্গে আমার কাজের সম্পর্ক এখানেই শেষ হয়নি। কারণ পেশাগত জীবনে আমরা একসঙ্গে অনেক কাজ করেছি। বাংলাদেশে অনেক প্রকৌশল বিষয় আছে, যেখানে তার অবদান আছে। আমি যখন পিএইচডি করে এলাম, তখন তিনি আমাকে বললেন, ‘এমন একটা কাজ করতে হবে, যেটা বাংলাদেশে নতুন।’ সেটা হলো টেনসাইল মেম্বার স্ট্রাকচার। এটার কথা বাংলাদেশে তখন অনেকেই শোনেননি।

তিনিই প্রথম বাংলাদেশে ভূমিকম্পের জন্য বিল্ডিং কোড তৈরি করেন। এটা খুব সম্ভবত ১৯৭০-এর দশকের শেষদিকে। তার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড তৈরি হয়। তিনি এ কোড তৈরিতেও যথেষ্ট ভূমিকা রাখেন। তিনি প্রথম সাইক্লোন সেন্টার তৈরির দলনেতা ছিলেন। এরপর বঙ্গবন্ধু সেতু, পদ্মা সেতু, ট্যানেল তৈরিতেও মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। বড় বড় প্রকল্প, যেমন স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান বা এসটিপিতে তিনি রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করেছেন। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা তৈরিতেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন। প্রতিটিতেই তিনি বিদেশিদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করেছেন। অনেক সময় কাজের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিদেশিরা তার সঙ্গে পারত না।

যখন আমরা তার সহকর্মী হই, তখন বঙ্গবন্ধু সেতু তৈরি হচ্ছে। তখন তিনি আমাদের সবাইকে এ সেতু পরিদর্শন করতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তখন সেতুর সব বৃত্তান্ত আমাদের বর্ণনা করছিলেন। আমি একটি পত্রিকা বের করতাম, নাম ‘বিয়ন্ড বিল্ডিং’। বাংলাদেশের প্রথম প্রকৌশলবিষয়ক পত্রিকা। তিনি আমাদের এ পত্রিকা প্রকাশে প্রচ- উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এটা যদি তোমরা অব্যাহত রাখো, তাহলে এটা খুব ভালো কাজ হবে।’ আমরা দুর্ভাগ্যক্রমে এটা অব্যাহত রাখতে পারিনি। তিনি জাতীয় অধ্যাপক হওয়ার পর আমরা বুয়েটের সিভিল বিভাগ থেকে একটা সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলাম। তিনি তখন আমাকে বললেন, ‘তোমরা পত্রিকাটা অব্যাহত রাখছ না কেন? এটা আবার বের করো এবং অব্যাহত রাখো।’

২০০১ সালে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলে যান। এরপর তার সঙ্গে আমার কাজ করার সৌভাগ্য হয় বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটিতে। তিনি এটার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। আমি এ সংগঠনের সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক, সাধারণ সম্পাদক এবং সর্বশেষ সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছি। এ সময়ে তার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে আমরা দুটি আর্থকোয়েক সেমিনার করতে সক্ষম হয়েছি। তার কাজের নিখুঁত ধরন আমাদের মুগ্ধ করেছে। আমি আজ যেভাবে কাজ করতে পারছি, তা স্যারের অবদান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কমিটিতে আমরা একসঙ্গে অনেক কাজ করেছি। তার সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। তার তীক্ষè মেধাশক্তি ছিল। তিনি প্রত্যেক সহকর্মী এবং ছাত্রের নাম মনে রাখতে পারতেন। দেখা হলেই সবার অবস্থা জানতে চাইতেন। তার এ গুণটি আমাদের মুগ্ধ করত। তিনি খুব সময়নিষ্ঠ ছিলেন। চারটার সভায় ঠিক চারটাতেই হাজির হতেন। তার জন্য কেউ কেউ বসে আছে এটা আমি কখনো দেখিনি। তিনি সবার আগে সভাতে হাজির হতেন। তিনি দেশে থাকলেই আমাদের বুয়েটের সিভিল বিভাগে প্রত্যেক বছরের ইফতার মাহফিলে উপস্থিত হতেন এবং আমাদের খোঁজ-খবর নিতেন। তিনি ছিলেন আমার একজন অন্যতম অভিভাবক। তিনি শুধু আমার নয়, ছিলেন দেশের প্রকৌশল সমাজের অভিভাবক।

তার সঙ্গে আমার কয়েক মাস আগে সর্বশেষ দেখা-সাক্ষাৎ হয়। আমাদের আর্থকোয়েক সোসাইটি কিছুদিন ধরে অকার্যকর রয়েছে। তিনি আমাকে ফোন করে বললেন, ‘মুনাজ, আমরা তো আর্থকোয়েক সোসাইটিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারি।’ আমি বললাম, ‘স্যার, আপনি যদি চান, তাহলে তা অবশ্যই করা যায়।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে এসো, আমরা আর্থকোয়েক সোসাইটিকে পুনরুজ্জীবিত করি।’ সেই পুনরুজ্জীবিত করা আর হলো না। এটা নিয়ে আমার মনে একটা দুঃখ চিরকাল থেকে যাবে।

তিনি যে জাতীয় অধ্যাপক হয়েছেন, এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। কারণ প্রকৌশলবিদদের মধ্যে খুব কম ব্যক্তিই জাতীয় অধ্যাপক হয়েছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তার অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করে। ১৯৯৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিনি যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন তখন কিন্তু তিনি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। ১৫ দিনে অন্তত এক দিন তিনি আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নিরপেক্ষভাবে জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করেছেন। ফলশ্রুতিতে, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসতে পেরেছেন।

তিনি অনেক করেছেন, অনেক কিছু দিয়েছেন বাঙালি জাতিকে। দেশের প্রকৌশল সমাজ তথা গোটা জাতি তার মৃত্যুর মাধ্যমে এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হলো। স্যার, আমরা কৃতজ্ঞ ও ধন্য আপনার মতো গুণী মানুষের সহায়তা পেয়ে, সাহচর্যে এসে।

লেখক : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত