প্রচণ্ড গতিতে উড়তে থাকা বিমান এয়ার পকেটে ঢুকে হঠাৎ গোত্তা খেয়ে নিচে পড়ে যেতে থাকলে ভেতরের যাত্রীদের যেমন অসহায় দশা হয়, করোনার কবলে তেমন এক দুঃসহ পরিস্থিতিতে পড়েছে বিশ্ব। অসহনীয় বর্তমান আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় মানুষের যেন পাগলপারা দশা। কী হচ্ছে? জানি না। কী হবে? জানি না। সব প্রশ্নের যেন একটা উত্তর। মঙ্গল গ্রহে পাড়ি জমানোর প্রস্তুতি আছে আর চিকিৎসা দেওয়ার সামর্থ্য নেই। এ রকম বিষয় মানতে শুধু কষ্ট নয় ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে মানুষের মনে। ‘ঘরে থাকুন, নিরাপদ থাকুন, নিরাপদ রাখুন’ এই অতি প্রয়োজনীয় কথা শোনার ধৈর্য আর স্থিরতা যেন রক্ষা করতে পারছেন না অনেকেই। করোনার ভ্যাকসিন কবে আবিষ্কার হবে আর কবে তা প্রয়োগ করা যাবে, এ নিয়েও আগ্রহ আর অস্থিরতার সীমা নেই। কিন্তু এসব দূরের বাজনা কানে এলেও তাতে তো পেটের খিদে মিটবে না। পেটের খাদ্য কীভাবে জোগাড় হবে, তা ভেবে মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। বিশেষ করে যাদের হাত চললে ভাত জোটে, তাদের চিন্তার সীমা নেই। ঘরে থাকলে অনাহার আর বাইরে গেলে করোনা আক্রান্ত হওয়ার ভয়, এই দ্বিমুখী টানাপড়েনে অস্থির হয়ে পড়ছে তারা। আর সুযোগ বুঝে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়েছেন চালের। এর মধ্যে এসেছে রোজার মাস। সংযমের কথা যতই উচ্চারিত হোক না কেন, রোজার মাস আসলে ব্যবসায়ীদের মুনাফা লোটার মাস। করোনা আতঙ্ক, খাদ্য ব্যবসা আর ক্ষুধার যন্ত্রণার মধ্যে প্রধান আলোচনায় এখন দুর্দশাগ্রস্ত কৃষক আর অবহেলিত কৃষির কথা।
ছোটবেলায় পড়া ঠাকুর মায়ের ঝুলির গল্প আমাদের দেশের কৃষি ও কৃষকের ক্ষেত্রে একদম মিলে যায় যেন। রাজার তিন মেয়ে। রাজা এক দিন জানতে চাইলেন, কোন মেয়ে তাকে কেমন ভালোবাসে। চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য ও সাজগোজ করে আসা বড় ও মেজো রাজকন্যা ভালোবাসার প্রতিযোগিতায় রাজাকে ভাসিয়ে দিল। কেউ সোনা-জহরতের মতো আবার কেউ ফুলের মতো ভালোবাসে বলে জানিয়ে দিল। মানুষের আরাধ্য সোনা আর দেবতার অর্ঘ্য ফুলের উপমায় রাজা আপ্লুত। এবার ছোট মেয়েকে জিজ্ঞেস করা হলো, তুমি কেমন ভালোবাস? স্নিগ্ধ সাজের ছোট রাজকন্যা শান্ত কণ্ঠে জানাল, বাবা, আমি তোমায় নুনের মতো ভালোবাসি। রাজা এতক্ষণ মেয়েদের ভালোবাসার কথা শুনে যে আবেগে ভাসছিলেন, সেখান থেকে অকস্মাৎ যেন ছিটকে পড়লেন কাদামাটিতে। কী! নুনের মতো ভালোবাসা? নুনের মতো এই অতি সাধারণ জিনিসের সঙ্গে বাবা এবং রাজার প্রতি ভালোবাসা তুলনীয় হতে পারে? ক্ষুব্ধ রাজা তাড়িয়ে দিলেন তৃতীয় রাজকন্যাকে। এরপর নানা ঘাত-প্রতিঘাতে রাজ্য হারিয়ে রাজা পথে পথে ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত হয়ে আশ্রয় নিলেন এক বাড়িতে। রাজ্য হারালেও তো তিনি রাজা। তাকে সম্মানের সঙ্গে খেতে দেওয়া হলো সোনার থালায়, আর ফুলে ফুলে সাজানো টেবিলে। ক্ষুধার্ত রাজা দর্শনীয় খাবার দেখে সৌজন্য রক্ষা আর নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না। আহ! কত দিন এমন খাবার দেখেননি! প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে গোগ্রাসে গিলতে গেলেন। কিন্তু একি! খাবার এত বিস্বাদ কেন? এমন সময় অবগুণ্ঠন খুলে মেয়ে এগিয়ে এসে বলল, বাবা! মনে পড়ে? নুনের মতো ভালোবাসি বলায় তাড়িয়ে দিয়েছিলে আমায়? তুমি নুন পছন্দ করতে না বলে কোনো খাবারে নুন দিইনি। ভীষণ দুঃখের দিনে রাজার শিক্ষা হলো। চোখের জলে মিলন ঘটল রাজ্য হারানো বাবা আর তাড়িয়ে দেওয়া মেয়ের। মালিকদের শিল্প আর বণিকদের ব্যবসা-বাণিজ্যের পোশাকি নাম ‘সেবা খাতের’ ঝলমলে জৌলুশের আড়ালে ম্রিয়মাণ হয়ে থাকা ‘কৃষি খাত’ যেন সেই তিন নম্বর রাজকন্যা। এই করোনাকালের দুঃসময়ে তার প্রয়োজন যেন আবার অনুধাবন করা গেল। যদিও অতীতের শিক্ষা বলে, এই শিক্ষা ভুলে যেতে সময় লাগবে না।
১৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। ১২০ কোটি মানুষের দেশ ভারত আর ১৩০ কোটি মানুষের দেশ চীনের চেয়ে বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে মানুষের ঘনত্ব অনেক বেশি। ভারতের চেয়ে তিন গুণ ও চীনের চাইতে সাত গুণ বেশি মানুষ বাস করে এখানে। আয়তন কম অথচ মানুষ বেশি এই দেশে মানুষের প্রথম ও প্রধান প্রয়োজন খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কিন্তু কাজ গুরুত্বপূর্ণ হলেই যে তা গুরুত্ব পাবে তা বলা যায় না। বাংলাদেশে সবচেয়ে অবজ্ঞা, উপহাস আর করুনার পাত্র এ দেশের কৃষক। সেটা সংস্কৃতিতেও যেমন, অর্থনীতিতেও তেমনি। কাউকে তাচ্ছিল্য করতে গেলে বলা হয়, আরে, চাষা একটা! বা কারও শিক্ষাগত যোগ্যতাকে উপহাস করে বলা হয়, চাষার মতো কথা বলছো কেন? অর্থনীতিতেও কৃষির ও কৃষকের জন্য বরাদ্দ কম। যে খাত জাতীয় অর্থনীতিতে জিডিপির ১৪ শতাংশের বেশি অবদান রাখে, ৪৫ শতাংশের বেশি প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে, সেই খাতে বরাদ্দ বাজেটের ৩.৫ শতাংশের বেশি নয়। আর কৃষকের চেহারা দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না তারা কেমনভাবে বেঁচে আছেন। পুরো দেশের জন্য খাদ্য, সবজি, মাছ, মুরগি, ডিম, দুধ, মাংস উৎপাদন করে যারা তাদের গাল ভাঙা, বসে যাওয়া চোখ আর ফাটা পা দেখলে তাদের উন্নতিটা বোঝা যায়।
করোনা প্রধানত স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে, কিন্তু আঘাত করেছে অর্থনীতির সব খাতকে এবং জীবনের সব দিককেই। এই দুর্যোগে মানুষকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন খাদ্য আর চিকিৎসা। অসুস্থ হলে চিকিৎসা প্রয়োজন কিন্তু সুস্থ, অসুস্থ সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করা না গেলে করোনাসৃষ্ট এবং করোনা-পরবর্তী অনাহারে মৃত্যু রোধ করা যাবে না। খাদ্য উৎপাদনকারী কৃষকদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষিত হয়েছে ৫০০০ কোটি টাকার এবং তা ৪ শতাংশ সুদে। দেশে বছরে ৪ কোটি টন খাদ্যশস্য, ৭১ লাখ টন মাংস, ৪২ লাখ টন মাছ, ১ কোটি টন দুধ, ১৭০০ কোটি ডিম উৎপাদন করেন কৃষক। কমবেশি ১ কোটি ৯০ লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যে বোরো ধান কাটা শুরু হয়েছে। সরকার ঘোষণা করেছে ৮ লাখ টন ধান ও ১০ লাখ টন চাল কিনবেন এ মৌসুমে। কৃষক চাল উৎপাদন করেন না, তা করেন মিলমালিকরা। উৎপাদিত ধানের ৫ শতাংশ কিনবে সরকার ১০৪০ টাকা মণ দরে। গত দুই মৌসুমে কৃষক ধানের ন্যায্য মূল্য পাননি। ৬০০/৭০০ টাকা মণ দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন কৃষক। কৃষক ধান বিক্রি করতে গিয়ে লোকসান গুনেছেন আর ভোক্তারা বেশি দামে চাল কিনতে গিয়ে পকেটের টাকা খুইয়েছেন। মাঝখানে খাদ্যব্যবসা করে মুনাফা হয়েছে একদল ব্যবসায়ীর। উৎপাদিত ধানের মাত্র ৫ শতাংশ কৃষকের কাছ থেকে কেনার পরিকল্পনা থাকায় এবারও কৃষকের ধানের দাম না পাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
কৃষির অন্য খাতগুলোও করোনার আঘাতে বিপর্যস্ত। প্রতিদিন ১৫০ লাখ লিটার দুধ অবিক্রীত থাকছে, যার বাজার মূল্য ৫৭ কোটি টাকা। প্রতিদিন ৩ হাজার টন মুরগির মাংস উৎপাদন হয় কিন্তু এর ৫০ শতাংশের বেশি অবিক্রীত থাকছে, দৈনিক ৪ কোটি ৫০ লাখের বেশি ডিম উৎপাদন হয়, তা বিক্রিও অর্ধেকে নেমে এসেছে। একদিকে উৎপাদক দুধ, ডিম ও মাংস বিক্রি করতে পারছেন না, অন্যদিকে আয় না থাকায় সাধারণ মানুষ কিনে খেতে পারছেন না। এ এক উভয়সংকট। এসব খাতের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ শ্রমজীবীর কাজ হারানোর শঙ্কা আর মানুষের খাদ্যের পুষ্টিমান কমে যাওয়ার ঝুঁকি দুটোই বাড়ছে। পুষ্টিহীন মানুষ যেকোনো সংক্রমণের কারণে সহজেই মৃত্যুবরণ করেন, এটা আমরা সবাই বুঝি।
১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার সময় জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি, আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ১ কোটি হেক্টর। স্বাধীনতার ৫০ বছরে জনসংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৭ কোটি কিন্তু আবাদি জমির পরিমাণ কমতে কমতে ৮০ লাখ হেক্টরেরও নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে তখন খাদ্যশস্য উৎপাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ টন। এখন তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ কোটি টন। নীরবে দেশের বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্য জোগান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে যে কৃষি খাত, তার প্রতি অবহেলা করা না হলে অর্থনীতির শক্তিশালী ও স্থায়ী ভিত্তি তৈরি হতে পারত। প্রবাদ আছে, ‘লেংটির চেয়ে আর কম কাপড় হয় না, ভর্তার চেয়ে কমদামি তরকারি আর হয় না।’ আসলেই আবরু ঢাকার শেষ অবলম্বন লেংটি আর উপায়হীনের শেষ তরকারি কোনো কিছুর ভর্তা।
দেশের মানুষকে বাঁচানোর শেষ অবলম্বন খাদ্য উৎপাদন অর্থাৎ কৃষি এবং শেষ যোদ্ধা কৃষক। জৌলুশ আর চাকচিক্যের প্রদর্শনী দেখিয়ে কত প্রণোদনা আর সুবিধা পেয়েছে দেশের শিল্প ও সেবা খাত কিন্তু এই করোনাকালে তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এখন তারা আরও সুবিধা দাবি করছে। আর অতীতের মতো কৃষি ও কৃষক বুক বাড়িয়ে এগিয়ে এসেছে আবার। নুনের মতো প্রয়োজনীয় হলেও রাষ্ট্র যে কৃষি খাতের মূল্য দেয় না, এটা আবার প্রমাণিত হলো। মুনাফাভিত্তিক সমাজে কৃষক মুনাফা বাড়ানোর উপায় বটে কিন্তু তারা নিজেরা মূল্যবঞ্চিত। মুনাফার সমাজ দায় নেয় যতটা ব্যবসার পথ খুঁজে তার চেয়ে বেশি। করোনার পর এই শিক্ষা মনে রাখলে দেশ বাঁচবে আর সমাজটাও এগোবে।
লেখক
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
