করোনাকালে গণপরিবহন বন্ধ

মহাসড়কে দুই থানার সীমান্তে ডাকাতি ছিনতাই অবাধে

আপডেট : ০৩ মে ২০২০, ০৫:৩৯ এএম

করোনাভাইরাসজনিত কারণে গণপরিবহন বন্ধ থাকায় সুনসান সড়ক-মহাসড়কে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে অহরহ। বিশেষ করে মহাসড়কের দুই থানার সীমান্তবর্তী এলাকায় ছিনতাই ও ডাকাতি হচ্ছে বেশি। ডাকাতি রোধে হাইওয়ে পুলিশ ও বিভিন্ন থানা পুলিশের পক্ষ থেকে টহল বাড়ানো হয়েছে। তার পরও ডাকাতি ছিনতাই বন্ধ করা যাচ্ছে না। হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বারবার গাড়ির চালকদের সতর্ক করে বিভিন্ন ধরনের লিফটেল ও প্রচারপত্র বিলি করা হচ্ছে। তারপরও অনেক ক্ষেত্রে চালকদের অসতর্কতার কারণে ডাকাতির ঘটনা ঘটছেই।

গত ২৮ এপ্রিল ভোররাতে আইওএম (ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন) বাংলাদেশের জন্য ইসলাম প্রসেস নামে একটি সরবারাহ প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু পণ্য নিয়ে একটি ট্রাক (ঢাকা মেট্রো ন ১৮-৯২৯৯) ঢাকা থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। ট্রাকটি ভোররাত ৩টার দিকে পটিয়া থানার শেষ সীমান্ত পেরিয়ে কর্ণফুলী থানা এলাকায় প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই একটি নম্বরপ্লেটবিহীন সিএনজি অটোরিকশা সামনে এসে ট্রাকের গতিরোধের চেষ্টা করে। ট্রাকটির গতি কমানোর সঙ্গে সঙ্গেই পাশে একটি প্রোভোক্স প্রাইভেট কারের ভেতর থেকে তিনজন নেমে দুজন দৌড়ে ট্রাকের ওপর উঠে যায়। তারা চাকু দিয়ে ট্রাকের ত্রিপল কেটে পণ্য বের করে রাস্তায় ফেলতে থাকে আর একজন সেগুলো কুড়িয়ে প্রোভোক্স গাড়িটিতে তুলতে থাকে। এ সময় ট্রাকচালক ও ওই কোম্পানির কর্মকর্তা ফয়েজ মিয়ার সঙ্গে ওই ছিনতাইকারীদের ধাক্কাধাক্কি হয়। এক পর্যায়ে ট্রাকচালক সিএনজি অটোরিকশাটি ওভারটেক করে গাড়ি নিয়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে আহমেদ অ্যান্ড সন্স নামে একটি পেট্রলপাম্পে আশ্রয় নেন। ফয়েজ বলেন, ওই পাম্পের লোকজন একই রাতে সড়কের ওই এলাকায় আরও কয়েকটি ডাকাতির ঘটনার খবর জানান। আর ডাকাতির কাজে যে প্রোভোক্স গাড়িটি ব্যবহার করা হয় সেটির কোনো নম্বরপ্লেট ছিল না। ডাকাতি শেষে গাড়িটি চট্টগ্রামের দিকে চলে যায়।

ইসলাম প্রসেজের স্বত্বাধিকারী বাহারুল ইসলাম জানান, তারা পরদিন পটিয়া থানায় জিডি করতে যান। বর্ণনা শুনে থানা থেকে বলা হয়, যে এলাকায় ডাকাতি হয়েছে সেটা কর্ণফুলী থানায়। কর্ণফুলী থানায় গেলে বলা হয় পটিয়া থানায়। পরে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার সুপারিশের পর কর্ণফুলী থানায় জিডি নেওয়া হয়। ঘটনার চার দিনেও ডাকাতদের শনাক্ত বা ডাকাতি হওয়া পণ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ওই অংশে ডাকাতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কর্ণফুলী থানার ওসি ইসমাইল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সড়কের ওই অংশ নির্জন হওয়ায় সুযোগ পেলেই দুর্বৃত্তরা ডাকাতির চেষ্টা করে। আমরা ইতিপূর্বে ডাকাতির অভিযোগে একাধিক ডাকাত গ্রুপকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠিয়েছি। ডাকাতি রোধে আমাদের টহল ও তল্লাশি বাড়িয়েছি।

ট্রাকচালক হেলাল উদ্দিন জানান, ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের মিরসরাই ও জোরারগঞ্জ থানায় একায় ছিনতাই, ডাকাতি ও ডাকাতিচেষ্টার ঘটনা বেশি হচ্ছে। প্রতিনিয়ত থানায় মামলা হচ্ছে।

এ বিষয়ে মিরসরাই থানা পুলিশ জানায়, তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডাকাতি মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার ও ডাকাতির কাজে ব্যবহার করা গাড়ি, ডাকাতি হওয়া টাকা, স্বর্ণালংকার, মোবাইফোন, অস্ত্রসহ বেশ বিভিন্ন মামলামাল উদ্ধার করছে।

ঢাকার যাত্রাবাড়ীর পিকআপ ট্রাকচালক বশির উদ্দিন জানান, এছাড়া চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চুনতি, পটিয়া, লোহাগাড়া এলাকায় নির্জন সড়কে রাতে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। এসব ডাকাতি রোধে চালকরা কয়েকটি গাড়ি একসঙ্গে চালাচ্ছেন।

মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির এসআই সোহেল বলেন, গণপরিবহন বন্ধ থাকায় নির্জন মহাসড়কে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বাড়ায় আমরাও উদ্বিগ্ন। অনিরাপদ জায়গায় গাড়ি থামানো এবং সড়কে গাড়ি কম থাকার সুযোগ নেয় ডাকাত-ছিনতাইকারীরা। সড়কে টহল বাড়ানো হয়েছে। আগে থেকে আরও সতর্ক হয়ে দায়িত্ব পালন করছি।’

এদিকে আব্দুল হান্নান নামে একজন মাইক্রোবাসচালক জানান, তিনি গত বৃহস্পতিবার রাতে ময়মনসিংহ থেকে ঢাকায় ফিরছিলেন। রাজেন্দ্রপুর এলাকায় পৌঁছার পর দেখেন রাস্তায় গাড়ির নতুন একটি হাইড্রোলিক জগ পড়ে আছে। তিনি ভেবেছিলেন সামনের কোনো গাড়ি থেকে সেটা পড়েছে। তাই জগটি তোলার জন্য গাড়ি স্লো করেন। এ সময় পাশেই খেয়াল করে দেখেন জঙ্গলের মধ্যে লাঠি ও লোহার রড হাতে কয়েকজন লোক দাঁড়ানো। তিনি গাড়ি না থামিয়ে দ্রুত টেনে দূরে সরে যান। পেছন থেকে লোহার রড মেরে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করে ডাকাত দল। এভাবে মূল্যবান পণ্য রাস্তায় রেখে দিয়ে কৌশলে ডাকাতি করা হচ্ছে মহাসড়কে চলাচলকারী গাড়িতে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা জোনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে ডাকাতি ছাড়াও মূল্যবান দ্রব্য ফেলে কিংবা বিপদগ্রস্ত মানুষ সেজে ডাকাতির চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের ডাকাতি প্রতিরোধে তারা বেশকিছু প্রচার অব্যাহত রেখেছেন। হাইওয়ে পুলিশের সতর্কবার্তার মধ্যে রয়েছে রাস্তায় পড়ে থাকা দড়ি, অন্য কোনো পণ্য বা গাড়ির মূল্যবান কোনো যন্ত্র পড়ে থাকতে দেখলে তা নেওয়ার জন্য গাড়ি থামানো যাবে না। কারণ এতে ডাকাতির কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া যেখানে-সেখানে বা অনিরাপদ জায়গায় গাড়ি থামানো যাবে না। যাত্রীদের রাতের বেলায় ভ্রমণ করার সময় অপরিচিত ব্যক্তির মাইক্রোবাস বা অন্য যেকোনো ব্যক্তিগত গাড়িতে ওঠা যাবে না। রাস্তায় অপরিচিত লোকের দেওয়া কিছু খাওয়া যাবে না। পণ্যবাহী গাড়িতে কোনো অবস্থাতেই যাত্রী তোলা যাবে না। যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে কোনো কিছু খাওয়া যাবে না। গাড়ি থামাতে হলে পেট্রলপাম্প বা বাজার এলাকায় নিরাপদ জায়গায় থামানোর পরামর্শ দেন হাইওয়ে পুলিশের ওই কর্মকর্তা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত