করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর সারা দেশে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মানবিক সহায়তা কর্মসূচিতে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু অসহায় মানুষের জন্য দেওয়া এই ত্রাণ কিছু অসাধু জনপ্রতিনিধি নানা কায়দায় হাতিয়ে নিচ্ছে। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নজরে আসার পর কঠোর অবস্থান নিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। মাঠে ভ্রাম্যমাণ আদালত সক্রিয় রাখার পাশাপাশি বিতরণের ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে পদ্ধতিগত পরিবর্তন। এরপরও থেমে নেই কতিপয় তৃণমূল জনপ্রতিনিধি। সাম্প্রতিক সময়ে নানা অনিয়মের অভিযোগে ৫২ জন তৃণমূল জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এদের মধ্যে ১৯ জন ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান, ৩১ জন ইউপি সদস্য, একজন জেলা পরিষদ সদস্য ও একজন পৌরসভার কাউন্সিলর। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ এর ধারা (২৫)১ মামলা দায়েরের পর তা তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়ার পর মন্ত্রণালয় থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে। এরপর এসব জায়গায় আইন অনুযায়ী নির্বাচন দেওয়া হবে বলে জানায় স্থানীয় সরকার বিভাগ। তবে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কঠোর আইনের প্রয়োগ নয়, অনিয়ম ঠেকাতে কিছু পদ্ধতিগত পরির্তনের ওপর জোর দেওয়া হলে অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম কম-বেশি সবসময় হয়ে থাকে। এখন সরকার করোনা ইস্যুতে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়িয়েছে। সেখানে বিতরণেও অনিয়ম বেড়েছে। এ বিষয়ে সরকার শক্ত অবস্থানে থেকে মামলাও করছে। মামলা একটি দীর্ঘ মেয়াদি প্রক্রিয়া। মামলা দিয়ে শুধু অনিয়ম রোধ করা সম্ভব হবে না।’
তিনি বলেন, ‘বিতরণ ও অসহায় মানুষের তালিকা তৈরিতে কিছু পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনতে হবে। দেশের প্রায় ৫৯ হাজারের মতো ওয়ার্ড রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে কমিটি করতে হবে। এ কমিটিতে অবশ্যই স্থানীয় সরকারি স্কুলের শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও গণ্যমান ব্যক্তি রাখতে হবে। আর তালিকা তৈরি ও বিতরণের জন্য স্মার্টকার্ড ব্যবহার করলে অনিময় করার সুযোগ খুব একটা থাকবে না।’
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘করোনাকালে সরকারের দেওয়া সহায়তা আমরা বিতরণে অত্যন্ত কঠোরভাবে নজরদারি করছি। এই মুহূর্তে ভিজিএফ-ভিজিডি, ওএমএস, হতদরিদ্র মানুষের জন্য ত্রাণ সহায়তা, জেলেদের জন্য খাদ্য কর্মসূচি নামে কয়েকটি ধাপে চাল ও অন্যান্য ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে মূলত ভিজিডি ও জেলেদের চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তবে সিটি করপোরেশন এলাকায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে কমিটি করে দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিতরণে আরও স্বচ্ছতা আসবে।’
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা যায়, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকে ত্রাণ বিতরণে এ পর্যন্ত ৫২ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তারা হলেন, পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার ঢালারচর ইউপি চেয়ারম্যান মো. কোরবান আলী, সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার পাঙ্গাসী ইউপি চেয়ারম্যান মো. আবদুস সালাম, বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. আলাউদ্দিন পল্টু, বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার ১নং আন্দারমানিক ইউপি চেয়ারম্যান কাজী শহিদুল ইসলাম, কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার সুবিল ইউপির ৭নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. আবদুল মান্নান মোল্লা, ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার নয়নশ্রী ইউপির ১নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. সেকান্দার মিয়া, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলার গজারিয়া ইউপির ৮নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. সোহেল মিয়া, ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার ১নং বদরপুর ইউপির ৬নং ওয়ার্ডের সদস্য মুহাম্মদ ওমর এবং একই ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. জুয়েল মিয়া, শরীয়তপুরের কুচাইপট্টি ইউপি চেয়ারম্যান বি এম নাসির উদ্দিন স্বপন, ৩নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. মোফাজ্জেল বেপারি এবং ৯নং ওয়ার্ডের সদস্য শামীম বেপারি, মাদারীপুর জেলার সদর উপজেলার শিরখাড়া ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার, বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউপির ১নং ওয়ার্ডের রুবেল ইজারাদার ওরফে বাবুল মেম্বার, নড়াইল জেলার সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউপির ৮নং ওয়ার্ডের মো. সোহরাব হোসেন বিশ্বাস, শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার বিলাসপুর ইউপির ৯নং ওয়ার্ডের মো. সেলিম মোল্লা, ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার সুবিদপুর ইউপির ৮নং ওয়ার্ডের রেজাউল করিম খান সোহাগ, মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার কালাপুর ইউপির ৩নং ওয়ার্ডের মুজিবুর রহমান এবং ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের সদস্য সাহিদা বেগম রূপা, রাজশাহী জেলার চারঘাট পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রাজু আহম্মেদ, ভোলা জেলার মনপুরা উপজেলার মনপুরা ইউপি চেয়ারম্যান মো. আমানত উল্লাহ আলমগীর এবং ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার মানকোন ইউপির ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নাজমিন আক্তার লাভলী, কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউপির জাহেদুল ইসলাম চৌধুরী, নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলার চর-আড়ালিয়া ইউপির ৮নং ওয়ার্ডের মো. বাচ্চু মিয়া, কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউপির ৭নং ওয়ার্ডের মো. শরিফুল ইসলাম এবং দৌলতপুর উপজেলার দৌলতপুর ইউপির ৯নং ওয়ার্ডের মো. হাবিবুর রহমান, বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউপির মো. নূরে আলম বেপারি, ভোলা জেলার সদর উপজেলার রাজাপুর ইউপির মো. মিজানুর রহমান খান, পটুয়াখালী জেলার সদর উপজেলার কমলাপুর ইউপির মো. মনির রহমান মৃধা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর ইউপির শাহ আল শফি আনসারী, রাজবাডী জেলার পাংশা উপজেলার যশাই ইউপির মো. সিদ্দিকুর রহমান ম-ল, নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার পেড়লী ইউপির জারজিদ মোল্লা এবং কালিয়া উপজেলার জয়নগর ইউপি চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন চৌধুরী, নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার গাঁওকান্দিয়া ইউপির ৮নং ওয়ার্ডের মো. রফিকুল ইসলাম, পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার গলাচিপা ইউপির ২নং ওয়ার্ডের সদস্য মহিউদ্দিন সোহেল এবং একই উপজেলার কেশবপুর ইউপির সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মোছা. লিপি বেগম, কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের ৭নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. কামরুজ্জামান।
গত ১১ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রশাসন শাখার উপসচিব মো. এরশাদুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুসারে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ জনপ্রতিনিধি এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তৃণমূল পর্যায়ে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ কাজে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়েছেন। কিন্তু বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানা গেছে, কোথাও কোথাও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তা কর্মচারীরা ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন। এরূপ অনিয়ম দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া জনপ্রতিনিধি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাময়িক বরখাস্তকরণ এবং তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রুজুসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
ত্রাণ নিয়ে অনিয়মে জড়িত জনপ্রতিনিধিদের ছাড় দেওয়া হবে না জানিয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই বৈশ্বিক মহামারীতে যেসব জনপ্রতিনিধি গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য দেওয়া ত্রাণসামগ্রী নিয়ে অনিয়ম বা আত্মসাৎ করবে, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। যেখানেই ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম পাচ্ছি, সেখানেই আমরা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করছি। অনিয়ম বা ত্রাণ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত বেশকিছু জনপ্রতিনিধিকে ইতিমধ্যে আমরা বহিষ্কার করেছি, তবে শুধু বহিষ্কার নয় নিয়ম অনুযায়ী তাদের ফৌজদারি আইনে মামলার মুখোমুখিও করা হচ্ছে। তবে বর্তমানে অনিয়ম ঠেকাতে আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি।’
স্থানীয় সরকার বিভাগ জানায়, ত্রাণে অনিয়ম ঠেকাতে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যববস্থার পাশাপাশি তারা বিতরণ ও তালিকা তৈরিতে নিয়েছে কিছু পদ্ধতিগত পরিবর্তন। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনে এলাকায় সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের সহায়তা সুষ্ঠুভাবে বিলি-বণ্টন করতে ওয়ার্ড পর্যায়ে গঠন করা হয়েছে কমিটি। স্থানীয় কাউন্সিলরের নেতৃত্বে এ কমিটিতে আছে এনজিও প্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম, বিশিষ্ট তিন ব্যক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের প্রতিনিধি, নারী সমাজকর্মী ও শিক্ষক প্রতিনিধি। ঢাকার দুই সিটিসহ দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র এ কাজের নেতৃত্ব দেবেন। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে গত ২৬ এপ্রিল জারি করা এক আদেশের এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া জেলা পর্যায়ের অফিস প্রধান ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। এতে আছে উপজেলা পর্যায়ে সমবায় কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, সাব-রেজিস্ট্রার, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকল্প উন্নয়ন কর্মকর্তাসহ ৩০ কর্মকর্তাকে যুক্ত করা হয়েছে।
জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যরা অন্যায় করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি সময়ে ত্রাণ বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে ৫২ জন তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। চেয়ারম্যান ও সদস্যদের কর্র্তৃক সংঘটিত অপরাধমূলক কার্যক্রম জনস্বার্থের পরিপন্থি বিবেচনায় স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯-এর ৩৪(১) ধারা অনুযায়ী তাদের স্বীয় পদ হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ত্রাণে অনিয়মের বিষয়ে মূলত বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ সালের ধারা (২৫)১ অনুযায়ী মামলার তদন্ত করছে দুদক। দুদকের তদন্তের পর যাদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে তাদের সরকার স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করবে। বরখাস্ত হওয়া চেয়ারম্যানের জায়গায় আইন অনুযায়ী প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর সেখানে নির্বাচন দিয়ে নতুন চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়া হবে।’
