১৯৮৪ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ১৮৯ রানের ইনিংসটি খেলেছিলেন স্যার ভিভ রিচার্ডস। ওয়ানডের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড হিসাবে ইনিংসটি ১৩ বছর স্থায়ী হয়েছিল। সাঈদ আনোয়ার রেকর্ডটি ভাঙেন ১৯৯৭ সালের ২১ মে। চেনড়বাইয়ে আজকের এই দিনেই ভারতের বিপক্ষে তিনি খেলেছিলেন ১৯৪ রানের ইনিংসটি। ওয়ানডে রেকর্ড হিসাবে যা ১৩ বছর টিকে ছিল। ২০১০ সালে ওয়ানডে μিকেটে প্রম ডাবল সেঞ্চুরি করে সাঈদ আনোয়ারের রেকর্ড ভেঙেছিলেন শচিন টেন্ডুলকার।
সাঈদ আনোয়ার ইনজুরি নিয়েই ভিভের রেকর্ড ভেঙেছিলেন। সেই ম্যাচে ১৯ ওভার থেকে শেষ পর্যন্ত রানার নিয়ে ব্যাট করেছিলেন তিনি। শহিদ আফ্রিদি রানারের ভূমিকা পালন করেন। ভারত ব্যাট করার সময় আর মাঠে নামেননি সাঈদ আনোয়ার। তার পরিবর্তে ফিল্ডিং করেছিলেন মোহাম্মদ ওয়াসিম। সেই ম্যাচে অনিল কুম্বলে নিজের ষষ্ঠ ওভারে ৭ বল করেছিলেন। উইন্ডিজের আম্পায়ার কেটি ফ্রান্সিস বুঝতে পারেননি। টেন্ডুলকার নিজের নবম ওভারে ৫ বল করেছিলেন। আম্পায়ার ফ্রান্সিস মেনে নেন। তাতে ৫০ ওভারে তিনশো বলের কোটা পূরণ হয়। সাঈদ আনোয়ারের মতো সেই ম্যাচে সেঞ্চুরি করেছিলেন রাহুল দ্রাবিড়ও। তিনিও রানার নিয়েছিলেন। ২৩ এবং ২৪তম ওভারে তার রানার ছিলেন টেন্ডুলকার। সেই সময় তিনি ভারতের অধিনায়ক।
ইন্ডিপেনডেন্স কাপে আগে ব্যাট করতে নেমে ১৪৬ বলে ১৯৪ রানের ইনিংস খেলেছিলেন সাঈদ আনোয়ার। পাকিস্তান জিতেছিল ৩৫ রানে। দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৯ রান এসেছিল ইনজামাম ও ইজাজ আহমেদের ব্যাট থেকে। রানার নেওয়ার পরেই খুচরো রান নেওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন সাঈদ আনোয়ার। ইনিংসে ২২টা বাউন্ডারি এবং ৫টা ওভার বাউন্ডারি মেরেছিলেন তিনি। অনিল কুম্বলের এক ওভারেই মেরেছিলেন তিনটি ছক্কা।
১৯৬৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর করাচিতে জন্ম হয়েছিল সাঈদ আনোয়ারের। তার বাবা ছিলেন ক্লাবস্তরের μিকেটার। যদিও μিকেটকে তিনি পেশা হিসেবে নেননি। ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। ছেলের ক্ষেত্রে উল্টো হয়েছিল। করাচির এনইডি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে কম্পিউটার সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ারিং-এ সড়বাতক হন আনোয়ার। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকা যাবেন বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু μিকেটের টান উপেক্ষা করতে পারেননি। তাই করাচির ঘরোয়া μিকেটে মন দেন। আমেরিকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল হয়। ফলে ১৯৮৮ সালের শেষে মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় দলে ডাক পান সাঈদ আনোয়ার। পার্থে উইন্ডিজের বিপক্ষে তার অভিষেক ১৯৮৯ সালের প্রম দিনে। ১৯৯০-এর নভেম্বরে তার টেস্ট অভিষেক। পাকিস্তানের হয়ে ৫৫ টেস্টে সাঈদ আনোয়ার রান করেছেন ৪০৫২। গড় ৪৫.৫২। ২৪৭টি ওয়ানডে ম্যাচে আনোয়ার ৮৮২৪ রান করেছেন। গড় ৩৯.২১। ওয়ানডেতে তার সেঞ্চুরি আছে ২০টি। এক সময় শচিন টেন্ডুলকারের বিপক্ষে ওয়ানডে সেঞ্চুরির লড়াইয়ে সেরা প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আনোয়ার। শারজাতে খেলতে নামলেই সেঞ্চুরি তার বাঁধা ছিল।
সাঈদ আনোয়ার ছিলেন ইনজুরিপ্রবণ। অসুস্থতার কারণে তার ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইনজুরির কারণে তিনি ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপজয়ী পাকিস্তান দলে থাকতে পারেননি। ১৯৯০-এর ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৩- এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি ওয়ানডে খেলেছিলেন। কোনোটাতেই দশের বেশি রান করতে পারেননি। ১৯৯৬ সালে বিয়ে করেন সাঈদ আনোয়ার। স্ত্রী লুবনা চিকিৎসক। বিয়ের পর বাইশ গজে ফিরে বড় রান পাচ্ছিলেন। পেপসি ইন্ডিপেনডেন্স কাপে ১৯৯৭ সালের ২১ মে ভারতের বিরুদ্ধে খেলেন ১৯৪ রানের ইনিংস। ভারত-বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে তুলনায় বেশি ভালো খেলেছেন। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তার গড় ৬৪.৩৩। ভারতের বিরুদ্ধে ৪৪.৯২। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৪৭.৯৫। টেস্ট এবং ওয়ানডেতে তিনি যে ৩১টি সেঞ্চুরি করেছেন তার ১৫টি এসেছে এই তিন দেশের বিরুদ্ধে খেলে। ১৯৯৭ সালে উইজডেন বর্ষসেরা μিকেটার হয়েছিলেন সাঈদ আনোয়ার।
এক পারিবারিক বিপর্যয়ে পাকিস্তান μিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ওপেনারের জীবন বদলে গিয়েছিল। ২০০১ সালে মুলতানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের টেস্ট জয়ের দিনে সাঈদ আনোয়ারের তিন বছরের শিশুকন্যা বিসমাহ মারা যায়। সেই শোক তার জীবনের অর্থ বদলে দিয়েছিল। μিকেট ছেড়ে সাঈদ আনোয়ার ধর্মের আশ্রয় নেন। তাবলিগের হয়ে ধর্মপ্রচারে মন দেন। সঙ্গী হয়েছিল ধর্মপুস্তক। পবিত্র গ্রন্থেই সন্তান শোকের সান্তনা খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। μিকেট ছাড়ার পর ২০০৩ সালে আবার ফিরেছিলেন। খেলেছিলেন বিশ্বকাপও। ভারতের বিপক্ষে সেঞ্চুরিয়ানে সেঞ্চুরিও করেন। সেই রান তিনি উৎসর্গ করেছিলেন হারিয়ে যাওয়া কন্যা বিসমাহর স্মৃতিতে। এরপর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপে নিজের শেষ ম্যাচে ৪০ রান করেছিলেন সাঈদ আনোয়ার। আর কখনো পাকিস্তানের জার্সি গায়ে মাঠে নামেননি।
