বার্ধক্যজনিত কারণে ৯০ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা বাসু চ্যাটার্জি। বাংলাদেশে তিনি ব্যাপক পরিচিতি পান ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ সিনেমার মাধ্যমে। এ সিনেমা দিয়েই ১৯৯৮ সালে অভিষেক ঘটে চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদের। প্রিয় পরিচালককে স্মরণ করেছেন তিনি
‘বৃষ্টির সঙ্গে বাসু দার মনে হয় ঐশ^রিক সম্পর্ক। আজ সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টি আমার জন্য হৃদয়ের কান্না। সকালে বাসুদার চলে যাওয়ার খবর শোনার পর থেকে আমি কেঁদেছি। কিন্তু হৃদয়ের কান্না ওই আকাশের কান্না বৃষ্টি হয়ে ঝরার মতো ঝরছে। আমি আজ নিস্তব্ধ হয়ে গেছি। একই জায়গায় ঠায় বসে আছি। খালি স্মৃতির আয়নার তার হাসিমাখা মুখ ভেসে আসছে। কত কথা, কত স্মৃতি, সব ফ্ল্যাশব্যাকের মতো বারবার হৃদয়কে আঘাত করছে। সত্যি, আমি অনেক দিন এত বড় কষ্ট পাইনি। কিন্তু এমন দিনে তিনি চলে গেলেন যে একটু শেষ দেখা দেখতে যাব, তারও কোনো উপায় নেই।
তিনি বেশ কিছুদিনই ধরে বিছানাতেই ছিলেন। শেষের দিকে কথাও বলতে পারতেন না। আমার কিছুদিন আগে থেকেই তাকে খুব দেখতে মন চাচ্ছিল। সে কথা আমার স্ত্রীকেও বলেছি। ফোন করেছিলাম, তার মেয়ের সঙ্গে কথা হলো। আমি বললাম, বাসুদাকে আমার কথা জানিও। পরে আবার ফোন করেছিলাম। তখন জানতে পারি তিনি আমার কথা শুনে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। কিছুই বলতে পারেন নি।
আমি একেবারেই একটা আনকোরা ছেলে। টুকটাক মডেলিং করেছি। জানি না, তিনি আমার মধ্যে কি দেখেছিলেন, আমাকে ‘হঠাৎ বৃষ্টি’র মতো সিনেমার নায়ক করলেন। এরপর ‘চুপি চুপি’, ‘টক মিষ্টি ঝাল’ ও ‘হঠাৎ সেদিন’। আমার আজকের ফেরদৌস হওয়ার পেছনে তার অবদান সবচেয়ে বেশি। তার সিনেমাগুলো ছিল আমার জন্য অভিনেতা হয়ে ওঠার স্কুলিং। তিনি কখনো অভিনয় শিখিয়ে দিতেন না। বলতেন, ডায়লগটি পড়। পড়ার পর বলতেন অন্যভাবে পড়। এভাবে চার পাঁচভাবে পড়তে হতো। তখন বলতেন, প্রথম বারের থেকে এটুকু, দ্বিতীয়বারের থেকে এটুকু এভাবে ডায়লগটি দেবে। একবার বলেছিলাম, তুমি অভিনয়টা দেখিয়ে দিলেই তো পার। তিনি বলেছিলেন, আমি তো অভিনেতা না। অভিনয় আমি পারি না। তবে অভিনয় বুঝি। তুমি কয়েকভাবে বললে আমি ভালো যেটা সেটা ঠিকই বুঝতে পারব।
তাকে আমি বাবার মতো শ্রদ্ধা করতাম। কিন্তু তিনি ছিলেন আমার বন্ধুর মতো। কখনো কখনো শিক্ষক। ভারতে গেলে কখনো একা মনে হতো না। ভাবতাম, কেউ না থাকলেও বাসু দা আছেন। আমাকে বলতেন, লোকে মুম্বাইতে ঘরের অভাবে থাকতে পারে না। তোমার তো একটা ঘর আছে। এখানে থেকে বলিউডে চেষ্টা কর। যে হিন্দি সিনেমাটি করেছিলাম সেটিতে তিনিই যোগাযোগ করে দিয়েছিলেন। আমার প্রযোজিত ‘এক কাপ চা’-এর গল্পকার তিনি। তার লেখা ‘বিয়ের ফাঁদে’ গল্পটিও সিনেমায় রূপ দিতে চাই। এটা হবে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি। যতদিন বেঁচে থাকব, আমার মাধ্যমে বাসু দা দর্শকের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। কারণ, ফেরদৌস মানেই ‘হঠাৎ বৃষ্টি’, ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ মানেই বাসু চ্যাটার্জি।
অনুলিখন : মাসিদ রণ
