জন্ম পোল্যান্ডে। বাবা-মা দুজনই পোলিশ। বাড়িতে স্ত্রীর সঙ্গে এখনো পোলিশ ভাষাতেই কথা বলেন মিরোসøাভ ক্লোসা। অল্পস্বল্প ফরাসিও জানেন। ক্লোসার জন্মের পরেই কমিউনিস্ট পোল্যান্ড ছেড়ে ফ্রান্সে চলে গিয়েছিল তার পরিবার। সেখানকার দল অক্সেরের হয়ে ফুটবল খেলতেন ক্লোসার বাবা জোসেফ। ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। ক্লোসাও ঝটপট ফ্রেঞ্চ শিখে নেন। এরপরই জার্মানিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তার পরিবার। ১৯৮৬ সালে মা-বাবার সঙ্গে ক্লোসাকে তাই কুসেলে আসতে হয়েছিল।
কিন্তু এত দেশ থাকতে জার্মানিতেই কেন? জোসেফ ছিলেন জন্মসূত্রে জার্মান। পোল্যান্ডের সিলিসিয়া অঞ্চলটা একসময় জার্মানির অংশ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যা পোল্যান্ডের অংশ হয়। তবে পশ্চিম জার্মানির প্রাক্তন চ্যান্সেলর উইলি ব্র্যান্ডটের ‘অস্তপলিটিক’ চুক্তির পর পরিস্থিতি বদলে যায়। নৃতাত্ত্বিকভাবে যারা ইউরোপের যে দেশের নাগরিক তারা সেই দেশে ফেরার সুযোগ পান। এই চুক্তির সুযোগ নিয়েছিলেন ক্লোসার পরিবার। ফ্রান্স ছেড়ে জার্মানিতে পাড়ি জমান জোসেফ। ফলে ১৯৮৬ সালে আট বছর বয়সী মিরোসøাভ ক্লোসা জার্মানির কুসেলে বড় হতে থাকেন। ছেলেবেলায় দেশান্তরের স্মৃতি নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ফ্রান্স ছেড়ে আসার সময় আমি মাত্র দুটি জার্মান শব্দ জানতাম।’
ভাষা না জানা থাকলেও দ্রুত ফুটবলের ভাষা শিখে নেন ক্লোসা। ১৯৭৮ সালে ৯ জুন পোল্যান্ডের সিলিসিয়ান অঞ্চলের অপলে তার জন্ম। রক্তে তার ফুটবল ছিল। সেখানকার নামকরা অ্যাথলেট ছিলেন ক্লোসার মা-বাবা। জোসেফ ক্লোসা খেলতেন পেশাদার ফুটবলে। মা বারবারা জেজ খেলতেন পোল্যান্ড জাতীয় নারী হ্যান্ডবল দলে।
কুসেলের গ্রামে ছোট্ট এক ক্লাবে ক্লোসা শুরু করলেন ফুটবল খেলা। ক্লাবটা তখন জার্মানির সপ্তম বিভাগে খেলত। তাই খেলার বিনিময়ে অর্থ পাওয়ার প্রশ্ন ছিল না। নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে ক্লোসা তাই কাঠমিস্ত্রির কাজ শিখতে শুরু করেন। কিন্তু অবিশ্বাস্য স্কোরিং দক্ষতা তাকে সেই কাজ করতে দেয়নি। প্রথমে এফসি হামবুর্গে। তারপর এফসি কাইজারসøাটার্নে খেলার সুযোগ পেয়ে বুঝিয়ে দিলেন ডি-বক্সে কত ভয়ংকর তিনি। ২০০০ সালে বুন্দেসলিগায় অভিষেক। পরের মৌসুমে ১৬ গোল করে জার্মান ফুটবল কর্র্তৃপক্ষের নজরে এলেন। সাফল্যের খবর পোল্যান্ডেও পৌঁছে গিয়েছিল। ক্লোসার কাছে জাতীয় দলে খেলার প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন পোল্যান্ডের কোচ জেরি অ্যাঙ্গেল। সবিনয়ে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে ক্লোসা বলেছিলেন, ‘আমি জার্মান পাসপোর্টধারী। থাকিও জার্মানিতেই। কোনোদিন জাতীয় দলের হয়ে খেললে জার্মান দলের হয়েই খেলা উচিত বলে আমার মনে হয়।’
রুডি ফোলার তখন জার্মান দলের কোচ। বুন্দেসলিগায় ক্লোসার খেলা দেখে দলে নিলেন। ২০০১ সালের ২৪ মার্চ আলবেনিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অভিষেক হলো ক্লোসার। ৭৩ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমেছিলেন। দুই মিনিট পর জার্মানির জার্সি গায়ে প্রথম গোল করেন। এরপর সেই বিখ্যাত ‘সমারসল্ট’ সেলিব্রেশন। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ পর্যন্ত যা দেখতে অভ্যস্ত ছিল ফুটবল দুনিয়া।
ক্লোসা গোল করলে জার্মানি হারত না। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো তিনি ফ্রি-কিকে দক্ষ ছিলেন না। লিওনেল মেসির মতো তার পায়ে ছিল না ড্রিবলের কারুকাজ। কিন্তু পেনাল্টি বক্সের আশপাশে বল পেলেই গোল করতেন। বড় ম্যাচে ঠিক সময় ঠিক জায়গায় থেকে গোল করে অনেকবার দলকে জিতিয়েছেন। কমপ্লিট স্ট্রাইকার বলতে যা বোঝায় ক্লোসা ছিলেন তাই। জার্মানির জার্সি পরলেই অনন্য হয়ে উঠতেন মিরোসøাভ ক্লোসা। পরিসংখ্যানও তাই বলে। ১৩৭ ম্যাচে ৭১ গোল। জার্মান ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
চারটি বিশ্বকাপ মিলে ক্লোসার মোট গোল ১৬। ২০১৪ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে স্বাগতিক ব্রাজিলকে ৭-১ গোলে হারানোর ম্যাচে রেকর্ড ব্রেকিং ১৬তম গোলটি করেছিলেন তিনি। ভেঙে দিয়েছিলেন ব্রাজিলের রোনালদোর ১৫ গোলের রেকর্ড। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে ৬ গোল করে সোনার বল জিতেছিলেন। ব্রাজিলে বিশ্বকাপ জিতে বুট তুলে রাখেন। অবসরের সময় বলেছিলেন, ‘আমি দেশের হয়ে খেলাটা প্রতি মুহূর্তে উপভোগ করেছি। দারুণ সময় কাটিয়েছি, যা কোনোদিন ভুলব না।’ জার্মানিও ভুলতে পারবে না ১১ নম্বর জার্সিগায়ে তার সেই বিখ্যাত ‘সমারসল্ট’ সেলিব্রেশন।
এই মুহূর্তে বায়ার্ন মিউনিখের সহকারী কোচ ক্লোসা মনে করেন, ফুটবলই বিশ্বকে বদলাতে পারবে, ‘সংহতি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে ফুটবল আমাদের সাহায্য করতে পারে। আমি অভিজ্ঞতা থেকে ফুটবলের আন্তর্জাতিকতা বুঝি। আপনি মুহূর্তকালও এর থেকে দূরে থাকতে পারবেন না।’
