ভাইরাসের বিরুদ্ধে শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের লড়াই

আপডেট : ১১ জুন ২০২০, ০৫:০০ এএম

কভিড-১৯-এর প্রকোপ শুরু হলে যুক্তরাজ্যের শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে সবচেয়ে নাজুক জায়গা বলে চিহ্নিত করা হয়। জনসংখ্যা অনুসারে সেখানে আক্রান্তের হার ছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু গত ছয় সপ্তাহ ধরে সেই এলাকায় কোনো নতুন রোগী শনাক্ত হয়নি। কীভাবে দ্বীপপুঞ্জটি ভাইরাসের প্রকোপ কমিয়ে দিল? বিবিসি অবলম্বনে লিখেছেন আরফাতুন নাবিলা

শেটল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ

ভাইরাস নিয়ে শুরুর দিকে এখানকার মানুষ খুব বেশি চিন্তিত ছিল না তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে উত্তরের এই দীপপুঞ্জের ৫৬৭ স্কয়ার মাইল জুড়ে জমি এবং ১৬৭৯ মাইল জুড়ে সমুদ্রতীর। ১০০ দ্বীপের মধ্যে ১৬টি বেশ জনবহুল। এখানে মাত্র ২৩ হাজার মানুষ বাস করে। গরমের সময় শেটল্যান্ডে দিন হয় ১৯ ঘণ্টার। ১৪৬৮ সালে এই দ্বীপপুঞ্জগুলো স্কটল্যান্ডের কাছে প্রত্যার্পণ করে নরওয়ে। সে সময় দ্বীপের ভাষা ছিল ‘নর্ন’। ঊনিশ শতকের মাঝের দিকে এই ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে জায়গার নামগুলোতে এখনো স্ক্যান্ডিনেভিয়ান প্রভাব আছে। যেমন বুরাভয়ে, গ্রুটনেস, ম্যাভিস গ্রিন্ড। দ্বীপের বাড়িগুলো বেশ উজ্জ্বল রঙে রাঙানো। অনেক দূর থেকেও সৌন্দর্য চোখে পড়ে।

আক্রান্ত প্রথম পরিবার

৩ মার্চ, মঙ্গলবার। বেশ ঝকঝকে একটি সকাল। এমনই সুন্দর এক আবহাওয়ায় আর্কিটেক্ট লেইন ম্যালকমসন স্ত্রী সুজানকে নিয়ে চার বন্ধুসহ ইতালির নেপলসে বেশ লম্বা একটি ছুটি কাটিয়ে বিমান চালিয়ে ফিরছিলেন। লেইন একটু পরপর জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলেন কতটুকু উত্তর দিকের এলাকা পার করে এসেছেন। যদিও ২৮ ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত তারা ফিরবেন কি না সেটি নিয়ে বেশ দ্বিধায় ছিলেন। কারণ তারা যেখানে থাকেন তার থেকে ৫০০ মাইল দূরে উত্তর দিকের লমবারডিতে কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে গেছে বলে বিভিন্ন খবরে জানা যাচ্ছিল। তবে সরকারি ভ্রমণ পরামর্শকরা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছিলেন, দেশের দক্ষিণ দিকে কোনো সমস্যা নেই। লেইন আগে থেকেই সাবধান ছিলেন। ভ্রমণে গিয়েও রেস্টুরেন্টের টেবিল বারবার মুছিয়েছেন, নিজেও হাত ধুয়েছেন নিয়মিত।

এডিনবার্গে এক রাত থাকার পর, দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী লারউইক থেকে ১২ মাইল উত্তরে নিজ বাড়িতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন লেইন। প্রচণ্ড বাতাস বইছিল। সামবার্গ এয়ারপোর্টের পাশে বিমান নামাতে বাধ্য হলেন তিনি। সাধারণত, এবারডিন থেকে যাত্রা শুরু করলে মাঝে ১৪ ঘণ্টার বিরতি নেন লেইন। যদিও এবারের পরিস্থিতি অন্যবারের চেয়ে আলাদা। ২০১৯ সালের শেষের দিকে চীনের উহানে প্রথম প্রাদুর্ভাব ছড়ানো করোনাভাইরাস ২০২০ সালের মার্চ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ল। লেইন বিমান নিয়ে যেখানে অবতরণ করতে চাচ্ছিলেন, সেই জায়গাটি স্কটল্যান্ডের মূল ভূমি থেকে ১১০ মাইল দক্ষিণে আর নরওয়ে এখান থেকে ১৯০ মাইল পূর্বদিকে অবস্থিত। ধরেই নেওয়া হয়েছিল শেটল্যান্ড এসব জায়গা থেকে নিরাপদেই আছে। বলা যায়, জায়গাটি এক রকম আলাদা। এখানে যারা আছেন তারা কেউই এই মহামারীতে আক্রান্ত হতে পারেন, এমন ভাবেননি। তারা ধরেই নিয়েছিলেন এত দূরত্বে থেকে এখানকার কেউ করোনায় আক্রান্ত হবেন না। কিন্তু ভাগ্য বোধ হয় এমন চাচ্ছিল না। শেটল্যান্ডে আসার দুদিন পর, ৫ মার্চ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লেইন অনুভব করলেন তার মাথাব্যথা হচ্ছে।

৬ মার্চ, শুক্রবার। সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীর খারাপ লাগছিল লেইনের। গত দুদিন তিনি কাজে গেলেও সেদিন একদমই পেরে উঠছিলেন না। যে বন্ধুদের সঙ্গে তিনি নেপলসে বেড়াতে গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে একজন ছিলেন গ্লাসগোর অধিবাসী। খবর এলো, তিনিও সেখানে ভালো নেই। তাকে দ্রুত টেস্ট করতে বলা হয়েছে। তার কথা শুনে লেইন ও সুজানও টেস্ট করানোর কথা ভাবলেন। নার্স এলো তাদের বাড়িতে টেস্টের জন্য। তারা বাড়িতে এসে ভেতরে ঢোকার আগে সম্পূর্ণ পিপিই পরে নিলেন। এরপর শুরু হলো নানা জিনিসপত্র দিয়ে টেস্ট করা। পুরো ঘটনাটি এত দ্রুত ঘটছিল যে, দুজনেই কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। নার্স আশ্বস্ত করলেন তাদের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা একদম নেই বললেই চলে। তবু বাড়তি সতর্কতার জন্য সপ্তাহখানেক বাড়ি থেকে বের না হওয়াই ভালো। টেস্ট করাতে কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছিল যদিও। লেইনকে বলা হলো এবারডিন যেতে এবং সেখান থেকে গ্লাসগোতে। রবিবার রাতে রেজাল্ট এলো। শেটল্যান্ডে প্রথম কভিড-১৯-এ আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে। খবর ছড়াতে বেশি সময় লাগল না। সবাই ভীষণ ভড়কে গেলেও এদের মধ্যে একজন ব্যক্তি ছিলেন যিনি এই ভাইরাসকে ভয় পেলেন না। তিনি হলেন মাইকেল ডিকসন।

শেটল্যান্ডের চিকিৎসাব্যবস্থা

খুব বেশি দিন হয়নি, মাইকেল ডিকসন ব্রিটিশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে প্রধান কার্যনির্বাহী হিসেবে মহামারী সম্পর্কে শেটল্যান্ডের মানুষকে জানাতে এসেছেন। মাইকেল বলেন, ‘সত্যি বলতে সরকারের পক্ষ থেকে আমি যখন এখানে কথা বলতে আসি, সেই দিনটি ছিল আমার ক্যারিয়ারের জন্য সবচেয়ে বাজে দিন। শেটল্যান্ডের মানুষের সঙ্গে কথা বলা এক রকম দুর্বোধ্যই বলা যায়।’ তিনি জানতেন শেটল্যান্ডের অবস্থানের কারণে অনেকেই এটিকে এক রকম বিচ্ছিন্ন ভাবে। আর এ কারণে ভাইরাসের চিকিৎসা করা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জের। এদিকে লারউইকসের গিলবার্ট বেইন হাসপাতাল এই রোগের জন্য একদম প্রস্তুত ছিল না। দ্বীপের কোথাও কোনো আইসিইউ পর্যন্ত নেই। এমন পরিস্থিতিতে কেউ যদি গুরুতর অসুস্থ হয়েও যায়, তবে তাকে নিতে হবে এডিনবার্গে, নয়তো রয়্যাল এয়ারফোর্স মিলিটারি ট্রান্সপোর্ট এয়ারক্রাফটে করে মূল ভূখণ্ডে। তবে শেটল্যান্ডের একটি সুবিধাও আছে। বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে সামনের দিকে তাকালে কোনো মানুষই চোখে পড়ে না। সেখানে বাড়ি আছে কিন্তু কাউকেই রাস্তায় তেমন একটা দেখা যায় না। পাঁচ মাইল হেঁটে গেলে হয়তো দু-চারজন মানুষের দেখা পাওয়া যায়। এই জায়গাটি বাস্তবিক অর্থেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখে। অন্যদিকে এবারডিনের ফেরি টার্মিনালে করোনা প্রাদুর্ভাব ছড়ানোর অল্প সময়ের মধ্যেই দ্রুত শেটল্যান্ডেও এমন ঘটনা ঘটল। এমনটি হওয়ায় শেটল্যান্ডের জনগণের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এলো।

শুরু হলো শেটল্যান্ডের সবার টেস্ট করার পালা। পাবলিক হেলথ টিম থেকে যখন টেস্ট করানোর কথা বলা হলো, তখন সেটি নিয়ে কেউ আর উচ্চবাচ্য করেনি। প্রতি রবিবার সবাই নিয়মিত এলো টেস্ট করাতে। লেইনের পরিবারকে দেখতে যেই নার্সরা বাড়িতে গিয়েছিলেন তারাই সবার টেস্ট করালেন এবং নাম, পরিচয় লিখে রাখলেন। ন্যাশনাল হেলথ সেক্টরের শেটল্যান্ডের দায়িত্বে থাকা ডক্টর সুজান লেইডল সবার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখতেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের পুরো সপ্তাহে একটা দীর্ঘ সময় চলে যেত, যারা টেস্ট করিয়ে গেছেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে। এরপর ছিল নতুন কেসের খবর, আবার তাদের টেস্ট করা, তাদের আইসোলেডেট করা। কাজটি কঠিন হলেও এর মাধ্যমেই প্রাদুর্ভাব ছড়ান ঠেকানো গেছে এখানে।’

লেইন বলেন, ‘আমাদের কর্মস্থলের সবাই এই রোগে আক্রান্ত হয়। এমনকি তাদের পরিবারের সবাইও। কারও ডায়রিয়া দেখা দেয়, কেউ হয়তো খাবারে কোনো গন্ধ বা স্বাদ পাচ্ছিল না। অনেকের অবস্থা বেশ জটিল হয়ে ওঠে। এর মধ্যে একজন ছিলেন তার কর্মচারীর বাবা। তাকে এয়ারলিফটে করে এবারডিনে নেওয়া হয়। যদিও তিনি পরে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। যত দিনে এই কন্ট্যাক্ট ট্রেসার ভাইরাস কত দূর ছড়িয়েছে তা জানার চেষ্টা করছিল, তত দিনে লেইনের শারীরিক অবস্থা বেশ খারাপ হতে থাকে। সুজানেরও ঠা-া-কাশির কিছু সমস্যা ছিল। কিন্তু লেইনের প্রচণ্ড জ্বর এলো, শরীরে বারবার কাঁপুনি হচ্ছিল। লেইনকে এবারডিনে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এতে তিনি বেশ ভয় পেয়ে যান। তিনি এই দ্বীপ ছেড়ে কোথাও যেতে চাননি। কিছুদিন পর লেইন কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে নিজের চেয়ে তিনি বেশি ভয়ে ছিলেন ৮০ বছর বয়সী বাবা-মাকে নিয়ে। বয়স তাদের চেয়ে কম হওয়ায় তিনি হয়তো সুস্থ হয়ে গেছেন কিন্তু বাবা-মায়ের হলে তারা সেটি কুলিয়ে নাও উঠতে পারেন। অসুস্থ থাকাকালীন লেইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও খুব বেশি আসেননি। তিনি চাননি তাকে নিয়ে কোনো ধরনের গুজব ছড়ানো হোক।

দ্রুত ছড়াচ্ছিল ভাইরাস

শেটল্যান্ডে ভাইরাসটি খুব দ্রুত ছড়াচ্ছিল। লেইন ও সুজানের টেস্ট রেজাল্ট আসার চার দিন পর অর্থাৎ ১২ মার্চ সেখানে ছয়জনের আক্রান্ত হওয়ার নিশ্চিত খবর এলো। পাঁচ দিন পর এ সংখ্যা দাঁড়াল ১৫-তে, ১৯ মার্চ নাগাদ ২৪ জন আক্রান্ত হয়ে পড়ল। সংখ্যায় খুব বেশি মনে না হলেও দ্বীপের জনসংখ্যার হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ছিল যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি কভিড-১৯-এ আক্রান্তের সংখ্যা। মাইকেল বলেন, ‘আমার তখন মনে হচ্ছিল আমরা সম্ভবত বিশ্বে সর্বোচ্চ আক্রান্ত সংখ্যার শীর্ষে রয়েছি!’ ট্রেসিং টিমের সবাই যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছিল। হাসপাতালের একটি অংশে কভিড ওয়ার্ড স্থাপন করা হয়েছিল। শেটল্যান্ডের সবাই তত দিনে বেশ ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। একটি বিষয় ভালো ছিল যে, দ্বীপবাসীর কোনো ধরনের কঠোর নির্দেশনা দেওয়ার আগেই তারা নিজেদের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা শুরু করেছিল।

আইসোলেশন

শেটল্যান্ডের ক্যালেন্ডারে ১১ ও ১২ মার্চ দুটি আগুন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসব তাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য বোর্ডের নিষেধাজ্ঞায় এই উৎসবের সব আয়োজন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৬ মার্চ থেকে শেটল্যান্ডের সব স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়। ক্যাফে, বার, রেস্টুরেন্ট, অবকাশযাপন কেন্দ্র সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, যখন স্কটিশরা লকডাউনের মধ্যে চলে যায় তখনই। সাধারণত দ্বীপবাসী প্রতিবেশী এলাকাগুলোকে দেখে সিদ্ধান্ত নেয় নিজেদের বেলায়। ঠিক এই বিষয়টিই হয়েছিল শেটল্যান্ডের অধিবাসীর মধ্যে। স্কটিশদের দেখে তারা নিজেরাও বিপদ আন্দাজ করতে পেরে সব লকডাউন করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এরপরও অনেকের সঙ্গেই যোগাযোগ থাকায় দ্বীপবাসীর মধ্যে অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো তারা এমন কারও সঙ্গে দেখা করেছেন, যার সঙ্গে সাক্ষাতের পর আক্রান্ত হয়েছেন। তখন থেকেই তারা নিজেরা আইসোলেটেড হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

স্কুল আগে বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অনেক উপকারী ছিল। কারণ স্কুলের অনেক শিক্ষকই এই কন্ট্যাক্ট ট্রেসিং টিমের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাদেরও বলা হয়েছিল তারা যদি আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি দেখা করে থাকে, তবে যেন অবশ্যই বাড়িতে থাকে। অনেক বাবা-মা যদিও বেশ আগে থেকেই সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ফেরি অপারেটররাও পর্যটক এবং অস্থায়ী বাসিন্দাদের যাতায়াতে কিছু নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। কারণ যানবাহনের অপারেটররা জরুরি কোনো কারণ ছাড়া মানুষদের বাহনে ওঠাচ্ছিলেন না।

ফেইসবুকে শেটল্যান্ড

মাইকেল কভিড-১৯-এর সাপ্তাহিক অবস্থা নিয়ে ফেইসবুকে লাইভে আসতেন। মুহূর্তেই তাতে ৬০০ দর্শক যোগ দিত। হাসপাতালের লন্ড্রি স্টাফ যখন জানালেন তাদের স্ক্রাবের (হাইজেনিক পোশাক) জোগান শেষ হয়ে আসছে, তখন ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। কীভাবে স্ক্রাব বানানো হয়, তার একটি ছবি দিয়ে লেখা হয়, কেউ যদি বাড়িতে থাকা বাড়তি চাদর দিয়ে মেডিকেলের এই পোশাকটি বানিয়ে দিতে চান, তাহলে খুব ভালো হয়। কয়েক দিনের মধ্যে ব্যাগের পর ব্যাগ ভর্তি নানা রঙের স্ক্রাব দিয়ে ভরে ওঠে হাসপাতাল। ফেইসবুকের এই শক্তিকে অনেক বড় করে দেখছেন, সেখানে কর্মরত স্ক্রাব প্রজেক্টের সদস্য ৩৮ বছর বয়সী লিসা গ্রে।

এত সাবধানতার পরও দ্বীপে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। দ্রুত খবর ছড়িয়ে যায়, লেইনই দ্বীপে এই ভাইরাস নিয়ে এসেছেন কারণ তিনিই প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি। এ খবর শুনে লেইন এক ধরনের বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। সবাই এই কথা মানতেও শুরু করে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের নিয়ে লেখালেখি হচ্ছিল। যদিও তাদের নাম সরাসরি বলা হয়নি। তিনি ফেইসবুকে থাকায় এমন খবর আরও ডালপালা মেলতে লাগল। আত্মীয়, বন্ধু সবাই তাকে বিভিন্ন সময় এসব জানাতে লাগলেন। যে সপ্তাহে তাদের টেস্ট করা হয়, তখন থেকে লেইন বা সুজান কেউ বাইরে যাননি। অথচ অনেকেই বলেছে তাদের দুজনকে বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে। ফেইসবুকে এসব খবর বেশ রসিয়ে লেখা হচ্ছিল। ট্যাবলয়েড সাংবাদিকরা বাড়িতে ফোন করছিলেন। লেইনের বন্ধু এবং পরিবার এক রকম চাপের ভেতর পড়ে গিয়েছিল। তারা লেইনকে চাপ দিতে থাকেন যে, তিনি যেন ফেইসবুকে এসে এসব কথার যথাযথ উত্তর দেন। এরপরও লেইন তা করেননি। তিনি বড় কোনো ব্যক্তি নন। যাকে নিয়ে এত আলোচনা হবে! তবু কিছু কথা বলা খুব দরকার মনে করে এক সন্ধ্যায় নিজের কম্পিউটারে বসে লিখতে শুরু করেন লেইন। তিনি লেখেন, ‘কয়েক দিন ধরে আমরা বেশ কিছু কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছি। দিনে দিনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। শেটল্যান্ড, সুজান ও আমাকে ঘিরে বেশ কিছু ভ্রান্ত খবর ছড়ানো হয়েছে ফেইসবুকে। অথচ আমাদের দুজনের টেস্ট করানোর পর আমরা কোনো ধরনের পার্টিতে যাইনি, এমনকি সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানেও না।’ লেখাটি পোস্ট করার পর প্রচুর ইতিবাচক সাড়া পেলেন লেইন। ১০০০-এরও বেশিবার লেখাটি শেয়ার করা হলো। লেইন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না সত্যিই এমন হয়। মুহূর্তেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভালো এবং খারাপের মধ্যে পার্থক্য করতে শিখে গেলেন।

বর্তমান অবস্থা

স্কটল্যান্ডের হিসাব মতে, শেটল্যান্ডে কভিড-১৯-এ ৩০ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিলের মধ্যে প্রথম ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে খবর আসে পাঁচজনের মৃত্যুর। ৬ মে, শেষ মৃত্যুর খবর আসে। এই সাতজনের মধ্যে পাঁচজনই বাড়িতে থেকে সেবা নিচ্ছিলেন। শেটল্যান্ড নিয়ে আশার বাণী হচ্ছে এখন পর্যন্ত সেখান থেকে আর কোনো মৃত্যুর খবর আসেনি। শেষ যে ব্যক্তির কভিড-১৯ পজিটিভ আসে, সেটি ছিল ২০ এপ্রিল। সর্বমোট আক্রান্ত ছিলেন ৫৪ জন। ইউনিভার্সিটি অব এবারডিনের ব্যাকটেরিওলজির অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর হাগ পেনিংটন বলেন, ‘দ্রুত লকডাউন শেটল্যান্ডে ভাইরাস দমনে সবচেয়ে বেশি সহায়ক হয়েছে। তারা প্রচণ্ড কষ্ট করেছে। তাদের এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নম্বর দেওয়া যায়।’

সাবধানতা মেনে এখনো শেটল্যান্ডে লকডাউন জারি রয়েছে। ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হচ্ছে কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের সংখ্যা। শেটল্যান্ড করোনা রুখতে সফল হলেও এখনো জানা যায়নি কীভাবে এই ভাইরাস এখানে এসেছিল। লেইন আর সুজান হয়তো সেখানে আক্রান্ত প্রথম ব্যক্তি কিন্তু তার মানে এই নয় যে তারা সঙ্গে করে এই ভাইরাস এনেছিলেন। লেইন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। অসুস্থতার সময়কেও লেইন ধন্যবাদ দেন। কারণ সে সময়টা তাকে আরও বেশি নিয়ম মেনে চলতে শিখিয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত