সিরাজুম মুনিরার গ্রেপ্তার ও প্রহসনের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

আপডেট : ১৭ জুন ২০২০, ০৭:১৮ পিএম

এ লেখাটি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রেপ্তার তরুণ শিক্ষক সিরাজুম মুনিরা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গে। শুরুতে বলে রাখা প্রয়োজন, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো পরিসরে আমি মুনিরার সঙ্গে কোনো সম্পর্কে সম্পর্কিত নই। ব্যক্তিগতভাবে আমি স্বাধীন, যৌক্তিক ও মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী একজন মানুষ । শিক্ষকতার দায়বদ্ধতা থেকে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যদি কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা আক্রান্ত হয়ে থাকেন এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে যদি কেবলই কেউ কোনো রাজনৈতিক সংগঠন, প্রশাসন বা ব্যক্তির অতি উৎসাহ বা ক্ষোভের কারণে হেয় প্রতিপন্ন হয়ে থাকেন- তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার, কথা বলার, গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার দেশের একজন নাগরিক হিসেবে এখনো আমার আছে বলে আমি বিশ্বাস করি। সে সূত্রেই আমার এ লেখার প্রয়াস।

কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন থাকা সত্ত্বেও সিরাজুম মুনিরাকে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়, খোদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সে প্রশ্ন মাথায় রেখেই আমার লেখা।

১৪ জুন বিভিন্ন পত্রিকা মারফত জানতে পারি যে, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তরুণ শিক্ষক প্রয়াত সাবেক মন্ত্রী জনাব মোহাম্মদ নাসিমকে নিয়ে একটি এক লাইনের বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য পোস্ট করেন। অতঃপর তিনি তার ভুল বুঝতে পেরে স্বল্প সময়ের ব্যাবধানে সেটি ডিলিট করে দেন এবং পরবর্তীতে রাত ১০টার কিছুক্ষণ আগে তার স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি ভুল স্বীকার করে, ক্ষমা চেয়ে পর পর দুটি স্ট্যাটাস দেন। কিন্তু এ সব ঘটনার স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন মহল থেকে তার স্ট্যাটাটির স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগ সভাপতির অভিযোগের সূত্র ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথমে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয় এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কর্তৃক মামলা হয়। এরপর রাত ১২টায় তার বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো বিদ্রুপাত্মক বা অশ্রদ্ধামূলক বক্তব্যকে আমি ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করি না। এ ধরনের আচরণ আমার কাছে শিশুসুলভ বলেই মনে হয়। তাই বলে আমি মনে করি না যুক্তিনির্ভর ও কাঠামোগত সমালোচনায় কোনো সংকট রয়েছে। তাই নিশ্চিতভাবেই মনিরার প্রয়াত সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে করা বিদ্রুপাত্মক মন্তব্যের পক্ষে আমার অবস্থান নয়। আমি তার আচরণটিকে অপরিপক্কতা ও দেশের সমকালীন করোনা দুর্যোগময় পেক্ষাপটে স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত ভঙ্গুরতার প্রেক্ষিতে দেশের আর দশজন আমজনতার মাঝে যে মানসিক অসহিষ্ণুতার সৃষ্টি হয়েছে তার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই দেখতে আগ্রহী।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, তবে কি সিরাজুম মুনিরার 'অন্যায়'কে অন্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না? তিনি শিক্ষক বলে তাকে প্রচলিত আইনের শাস্তির আওতায় আনা যাবে না?

আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই যে, আমি মনে করি আইনের আওতায় শুধু শিক্ষক কেন, দেশের আর দশজন স্বাভাবিক সাধারণ নাগরিকের ন্যায় আমলা থেকে শুরু করে এমপি, মন্ত্রী মহোদয়গণও দেশের আইনের বাইরে নয়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশে দায়িত্বরত ব্যক্তি তাদের দায়িত্বে অবহেলার কারণে আইনি বা কোনো জবাবদিহিতামূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার নজির অলীক ভাবনামাত্র।

অন্য দিকে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেবল স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত মানুষকে হুটহাট গ্রেপ্তার করার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। যা শুধু ভাবনার নয় বরং নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে বৈকি।

মূল প্রসঙ্গে ফেরত আসি। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর মূলত বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৯ আইন দ্বারা পরিচালিত, যার ৪৭ এর ৪ ও ৫ ধারা অনুযায়ী, উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের কোনো রাজনৈতিক উঠোনের সদস্য হওয়ার বা সদস্য হিসেবে অথবা স্থানীয় সরকারের কোনো পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রার্থী হিসেবে স্বীয় পদে কর্মরত অবস্থায় অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। তবে তারা রাজনৈতিক মতামত পোষণ করতে পারবেন না, বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো মতামত দিতে পারবে না- এমন কোনো আইন উক্ত অ্যাক্টের কোথাও উল্লেখ নেই। তবে ৪৭ এর ৬ ধারা অনুসারে বলা হয়েছে, ' বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বেতনভোগী শিক্ষক বা কর্মকর্তাকে তাহার কর্তব্যে অবহেলা, অসদাচরণ, নৈতিক স্খলন, অদক্ষতার কারণে সংবিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে চাকরি হতে অপসারণ বা পদচ্যুত করা অথবা অন্য কোনো প্রকার শাস্তি প্রদান করা যায়: তবে শর্ত থাকে যে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পর্কে কোনো তদন্ত কমিটি কর্তৃক তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত এবং তাকে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিনিধির মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে করা যাইবে না'।

প্রশ্ন হলো, ঘণ্টাখানেকের ব্যবধানে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান এবং অভিযোগকারীকে কোনো আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে, উপরন্তু রেজিস্টারকর্তৃক ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করার বিষয়টি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর আইন ২০০৯ অনুযায়ী বৈধ কি? এ পর্যায়ে আবারো পুনরাবৃত্তি করতে বাধ্য হলাম, আইন সবার জন্য সমান হওয়া জরুরি, তাই নয় কি?

এবার আসি, বহুল আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রসঙ্গে। ইন্টারনেটের এই দুনিয়ায় সাইবার ক্রাইম, সাইবার বুলিং যেখানে আকাশছোঁয়া, সেখানে নিশ্চিত অর্থে যে কোনো দেশেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বিশেষভাবে প্রয়োজনীয় বলে আমি মনে করি।

বহুল বিতর্কিত, আলোচিত আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল হলেও ২০১৮ সালে সংশোধিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অপরাপর ধারা বলে ব্যক্তির বাকস্বাধীনতা অথবা ব্যক্তির বক্তব্য প্রদানের সুযোগ সীমিত করেই রেখেছে।

নতুন আইনের ১৭ থেকে ৩৮ ধারায় বিভিন্ন অপরাধ ও শাস্তির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, নতুন আইনের ২৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, ' যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে পেনাল কোড [ ActXLV of 1860) 499 এ বর্ণিত মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করেন, তিনি অনধিক তিন বছর কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন'।

উক্ত ধারাটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, মানহানিবিষয়ক সম্পূর্ণ পৃথক পরিসরে মামলা করার সুযোগ থাকার পরও সেখানে সেটি কেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এমনকি, কোন প্রেক্ষাপটে কোন বাস্তবতার আলোকে কোন পরিসর বিবেচনায় তা পৃথকভাবে 'মানহানিকর' বলে বিবেচনা করা হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। উপরন্ত পেনাল কোডের সংজ্ঞা অনুযায়ী, মানহানিকে সংজ্ঞায়িত করার নির্দেশনা দেওয়া আছে।

তাহলে প্রশ্ন হলো, তাহলে সেটিকে নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে যুক্ত করার অর্থবহতা কোথায়? এই প্রহসনের ধারা সমূহের অস্পষ্টতার দায়ভার কেবল রাষ্ট্রের নাগরিকের ওপর বর্তায় কি? নাকি কোনো দিক-নির্দেশনা ছাড়া এ আইনের ব্যবহারের ও প্রয়োগের মধ্য দিয়ে সুকৌশলে সরকারের বিভন্ন সেক্টরের অব্যবস্থাপনা, রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত ভঙ্গুরতার সমালোচনা বা নাগরিক অধিকার  আদায়ের পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার প্রচেষ্টাই উক্ত আইনের মূল উদ্দেশ্য?

পরিশেষে এটুকুই বলতে চাই, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নামে ব্যক্তির বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তির বিবেকের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার এই যে প্রহসন, তা নিশ্চিত অর্থেই সংবিধানবিরোধী। একই সঙ্গে একটি অপরিপক্ক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের আওতায় তাকে অন্তর্ভুক্ত না করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আশ্রয় গ্রহণ করার এই পুরো প্রক্রিয়াটি ধোঁয়াশা ও অস্পষ্ট।

মনে রাখা প্রয়োজন, আইন মানুষের উপকারের জন্য করা হয়। নিশ্চয়ই আইনকে পুঁজি করে সেটি নাগরিককে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কৌশল কোনোভাবে কাম্য নয়।

স্নিগ্ধা রেজওয়ানা: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক এবং পিএইচডি ফেলো, অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, নিউজিল্যান্ড।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত