অদ্ভুত এক অভিযোগে কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ১৪ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা অধিদপ্তরের ৪৮ কর্মকর্তার এসিআরে ঘষামাজাসহ নানা অনিয়মের তথ্য গণমাধ্যমে সরবরাহ করেছেন। সেই অনিয়ম দূর করার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে তাদের প্রথমে হয়রানিমূলক বদলি পরে বিভাগীয় মামলায় জড়ানোর অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার শুরু হয়েছে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শকদের পদোন্নতি দিতে গিয়ে। ৪৮ জনকে সহকারী মহাপরিদর্শক পদে পদোন্নতির প্রস্তাব গত বছরের মে মাসে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখান থেকে একই বছরের ২৪ জুন যায় পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (পিএসসি)। এসিআরে ঘষামাজা থাকার কারণে প্রস্তাব ফেরত পাঠায় পিএসসি। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করে। কিন্তু কমিটি কে বা কারা এসিআর ঘষামাজা করেছেন তা খুঁজে বের করতে পারেনি। তিনি উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠনের সুপারিশ করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। সেই তদন্ত কমিটি এখনো তদন্ত শেষ করেনি। এসব প্রক্রিয়ার মধ্যেই রোষানলে পড়া কর্মকর্তাদের দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে বদলি করা হয়। দেশে করোনাভাইরাস দেখা দেওয়ার পরও সেই বদলি থামেনি। তাদের মধ্যে একজন বদলিকৃত স্থানে যোগ দিতে গিয়ে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন।
গত ৫ মার্চ শ্রম পরিদর্শক (সাধারণ) মীর মো. শামীমকে ঢাকা থেকে দিনাজপুর, নুরুল আমিনকে ঢাকা থেকে রংপুর, শাহ আলমকে নারায়ণগঞ্জ থেকে খুলনা, রাজু বড়ুয়াকে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া, তরিকুল ইসলামকে ঢাকা থেকে বরিশালে বদলি করা হয়। ৫ মার্চ অপরাহ্নে বদলি করে তাদের ৮ মার্চ বদলিকৃত জায়গায় যোগ দিতে বলা হয়। ১২ মার্চ অন্য এক আদেশে এসএম আরিফুজ্জামানকে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল, পিংকী মজুমদারকে ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জ, মো. ইউসুফ আলীকে চট্টগ্রাম থেকে দিনাজপুরে বদলি করা হয়। তাদের ১৫ মার্র্চের মধ্যে যোগ দিতে বলা হয়। ১৯ মার্চ মাহবুবুল আলমকে মুন্সীগঞ্জ থেকে সিলেট ও কামরুল আহসানকে মুন্সীগঞ্জ থেকে কিশোরগঞ্জে বদলি করে ২২ মার্চ যোগ দিতে বলা হয়। সিলেটে যোগ দিতে গিয়ে মাহবুবুল আলম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন।
এ ১০ কর্মকর্তাসহ মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে গত বুধবার বিভাগীয় মামলা করা হয়। তারা সবাই ৩৩তম বিসিএসের ননক্যাডারের মাধ্যমে শ্রম পরিদর্শক পদে যোগ দেন। অভিযোগনামা জারি করে তাদের ১০ কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়।
তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে চার দফা অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রথম দফা অভিযোগ পদোন্নতি আটকে দেওয়ার জন্য ৪৮ কর্মকর্তার এসিআর জালিয়াতি, তথাকথিত সিন্ডিকেট, সৎ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির খবর দেশ রূপান্তরসহ কয়েকটি খবরের কাগজে প্রকাশ হয়। এসব ঘটনার সঙ্গে তারা প্রকাশ্যভাবে জড়িত। দ্বিতীয় দফায় ‘হিউম্যানস অব ঢাকা’ ফেইসবুক পেজে যুক্ত হয়ে প্রতিমন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অশোভন পোস্ট করা, লাইক দেওয়া ও কমেন্ট করার অভিযোগ করা হয়েছে। পদোন্নতি আটকে দেওয়ার জন্য এসিআর ঘষামাজার সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া এবং এ কাজ সফল করার জন্য চাঁদা আদায় করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়বিরোধী সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে ৩৩তম বিসিএসের নিয়োগপ্রাপ্ত শ্রম পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ পাওয়ার কথা বলা হয়েছে অভিযোগনামায়।
এ বিভাগীয় মামলার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে কলকারখানা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রক্রিয়াগতভাবেই বিভাগীয় মামলা হয়েছে।’
করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে শ্রম পরিদর্শকদের হয়রানি করার জন্য দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে বদলি করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে ১৯৮৬ ব্যাচের এ অতিরিক্ত সচিব বলেন, ‘করোনার সময় বলে কি কোনো কিছু বন্ধ আছে? এছাড়া এটা সচিবের নির্দেশ। মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আবেদন করেছেন পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তারা। তিনি আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। তাদের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হয়েছে। সেখানে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে তাদের অভিযোগ সঠিক। কাজেই বিভাগীয় মামলা না হয়ে যাবে কোথায়?’
এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি কাজ করছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও পিএসসির কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত সেই তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার আগেই কেন বিভাগীয় মামলা করা হলো জানতে চাইলে মহাপরিদর্শক বলেন, ‘তদন্ত কমিটি হচ্ছে মন্ত্রণালয়ের। সেটা তো আর আমার বিষয় না। মন্ত্রণালয় আমাকে যে নির্দেশ দিয়েছে আমি সেটাই অনুসরণ করছি।’
এসব কর্মকর্তার বদলির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বদলি তো হচ্ছেই। অন্যান্য কর্মকর্তাকেও বদলি করা হয়েছে। শুধু তাদেরই বদলি করা হয়নি। বিভিন্ন খবরের কাগজে যে নিউজ হয়েছে সেগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। খবরের কাগজে যা লেখা হয়েছে ঘটেছে তার উল্টোটি।’
আপনি কি বলতে চাচ্ছেন এসিআরে ঘষামাজা হয়নি? দেশ রূপান্তরের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, ঘষামাজা হয়েছে। কিন্তু কারা করেছে? কারা করতে পারে? আমরা এসিআর পাঠালাম মন্ত্রণালয়ে। সেখান থেকে পাঠানো হলো পিএসসিতে। পিএসসিতে যে কপি গিয়েছে সেটাতে কাটাকুটি, ঘষামাজা রয়েছে। নম্বর বাড়ানো কমানো হয়েছে। আমরা ফ্রেশ কপি পাঠানোর পরও বলা হচ্ছে অধিদপ্তরের কতিপয় কর্মকর্তার যোগসাজশে এটা করা হয়েছে। কাজেই নিউজ হচ্ছে উল্টোটা। যে ব্যক্তি পদোন্নতি চায় সে কি তার এসিআর কাটাকাটি করবে? কাটকাটি থাকলে তো কোনোভাবেই পদোন্নতি হবে না। কারণ বিষয়টি অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের একক না। এখানে পিএসসিও আছে।’
মন্ত্রণালয়ের চলমান তদন্ত শেষ হওয়া কি জরুরি ছিল না? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের প্রথম তদন্ত করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ে এটা হয়েছে কি না। সিসি ক্যামেরার তথ্য পর্যালোচনা করে তা পাওয়া যাযনি।’
গণমাধ্যমে তথ্য দেওয়ার জন্য কি তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দেওয়া হয়েছে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, শুধু গণমাধ্যম নয়। এর সঙ্গে বিভিন্ন কুৎসা রটনাসহ আরও নানা বিষয় রয়েছে। এগুলোর প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে।’
পদোন্নতির দ্বন্দ্বটা কোথায় জানতে চাইলে শিবনাথ রায় বলেন, ‘এখনো পদোন্নতির প্রস্তাব যাদের করা হয়নি তারা পিএসসির মাধ্যমে এসেছে। যাদের পদোন্নতির প্রস্তাব করা হয়েছে তারা হচ্ছেন বিভাগীয় কর্মকর্তা। তারা ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে চাকরি করছেন। কিন্তু কোনো পদোন্নতি পায়নি। আর যারা পিএসসির মাধ্যমে এসেছেন তাদের ফিডার পদে ৫ বছরের শর্তই পূর্ণ হয়নি। এ অবস্থায় আমরা শুধু বিভাগীয় প্রার্থীদের পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু পিএসসি থেকে আসা কর্মকর্তারা চাচ্ছিলেন আমরা যেন পদোন্নতি প্রক্রিয়া এক বছর আটকে রাখি। তাদের ফিডার পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত।’
বিভাগীয় মামলার ফলাফল কী হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলা নিয়মানুযায়ী চলবে। তারা খালাসও হতে পারেন। এখানে লঘুদ-ও হতে পারে আবার গুরুদ-ও হতে পারে।’ সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী গুরুদ- হলে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাকরিচ্যুত হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিভাগীয় মামলায় অভিযুক্ত একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা সাজানো, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভিত্তিহীন। নিজেদের দোষ ঢাকার জন্য এ মামলা করা হয়েছে। অধিদপ্তরের নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের রক্ষা এবং ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য পদোন্নতি যোগ্য কিন্তু বঞ্চিত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এভাবে বিভাগীয় মামলা করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এছাড়া আদালতেও এ সংক্রান্ত একটি মামলা চলমান রয়েছে। যেকোনো পদোন্নতি দিতে হলে সিনিয়র জুনিয়রের গ্রেডেশন করা বাধ্যতামূলক। পিএসসি থেকে আসা কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করে অধিদপ্তর কোনো গ্রেডেশন তালিকা করেনি।
