নোবিপ্রবির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি

আপডেট : ২২ জুন ২০২০, ০৪:২৮ পিএম

দেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে উচ্চশিক্ষা বিস্তারে লক্ষ্যে ২০০৬ সালে নোয়াখালীতে প্রতিষ্ঠা করা নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সেই সালের ২২ জুন ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষের ১৮০ জন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর মধ্যদিয়ে দেশের ২৭তম পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টি।

দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর দিনটিকেই বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালন করে। একই কারণে ২২ জুনকেই নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পালন করা হয়। 

২০০৮ সালের নির্বাচনের পর নোবিপ্রবির ২য় এবং ৩য় ভিসির মেয়াদকালেও ২২ জুনকে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালন করা হয় বলে জানায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি বছরের ২২ জুন এই বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন করে আসছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

কিন্তু গত ২০১৬ সাল থেকে ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন করা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় দিবস আসলে এ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপন সংক্রান্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, প্রাক্তন উপাচার্য এ কে এম সাঈদুল হক চৌধুরীর সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথমবার আড়ম্বর আয়োজনের মাধ্যমে নোয়াখালীজুড়ে এই দিবসটি পালিত হয়।

২০১৫ সালে নোবিপ্রবির ৪র্থ ভিসি অধ্যাপক ড. এম ওয়াহিদুজ্জামানের দায়িত্বে এলে তিনিও প্রথমবার ২২ জুনকে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালন করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের চক্রান্তের কারণে ১৫ জুলাইকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিবস ঘোষণা করা হয়। এবং বর্তমানেও সেটি বহাল রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন তথ্য হতে দেখা যায়, ১৯৯৮ সালে দেশের ১২টি জেলায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যার মধ্যে নোবিপ্রবি অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

পরবর্তীতে ২০০১ সালের ১৫ জুলাই ‘নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০১’ পাশ হয়, ২০০৩ সালের ২৫ আগস্ট প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সেই আইন কার্যকর হয় এবং ২০০৫ সালের ২৪ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। 

দেশের স্বনামধন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালনের ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কোনটিই আইন পাশের দিনকে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালন করে না। উপরন্তু সবক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের সূচনাকেই বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালন করা হয়েছে। 

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৬ সালে ২২ জুন শুরু হয়েছিল নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম। ২২ জুনকে নোবিপ্রবি দিবস হিসেবেই পালন করা হচ্ছিল।

কিন্তু হঠাৎ করে ২০১৬ সালে তৎকালীন ভিসি ড. অহিদুজ্জামান আইন পাশ করলেন, এখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ১৫ জুলাই।

কারণ বা যুক্তি হিসেবে জানালেন, ২০০১ সালের ১৫ জুলাই সংসদে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন পাশ হয়। অর্থাৎ, ২০০১ সালের ১৫ জুলাই যদি সংসদে এই আইন পাশ না হত তাহলে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হত না। তাই ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় দিবস। কিন্তু, প্রশ্ন এসেছিল তাহলে ২২জুন? তিনি বললেন, ২২ জুন বিশ্ববিদ্যালয় জন্মদিন।

এই ঘটনা নেপথ্যে কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, ড. অহিদুজ্জামান নোবিপ্রবিতে ভিসি হিসেবে যোগ দেন ২০১৫ সালে। ওই বছর ২২ জুন বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ও বিশ্ববিদ্যালয় জন্মদিন একই ছিল এবং পালিত হয়েছে। কিন্তু, ওই দিবসে অফিসার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি তারেক রাশেদ উদ্দিন বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমি অনুরোধ করব বর্তমান ভিসিকে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার কর্তৃক সংসদে আইন পাশের (২০০১সাল ১৫ জুলাই) দিনকে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস করা হোক।’

এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে ক্ষোভ বিরাজ করে।

এদিকে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর দিনকে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালন করার জন্য গণস্বাক্ষর কার্যক্রম শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

গণসাক্ষরের অন্যতম সমন্বয়ক বিশ্ববিদ্যালয় বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম সৌরভ বলেন, ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসকে আমরা অসম্মান করছি । ভুলে যাচ্ছি কবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়েছিল বা এর গুরুত্ব কতটুকু। 

নোবিপ্রবির একজন সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে যেই বিকৃত আকাঙ্ক্ষায় ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য এই হীন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল সেই পদক্ষেপের বিরোধিতা করি এবং ২২ জুনকে নোবিপ্রবি দিবস হিসেবে পুনর্বহালের দাবি জানাই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাই সদস্য এবং কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক সালাউদ্দিন পাঠান বলেন, ২০১১ সাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন প্রাণ হিসেবে এসে ২২ জুনকেই বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পেয়েছি। ইতিহাস থেকে জেনেছি এই দিনেই আমাদের প্রথম আবর্তনের অগ্রজরা তাদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করে। এই আবেগকে সবারই সম্মান জানানো উচিত। আশাকরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গুরুত্ব দিয়ে এই বিষয়টিকে পুনর্বিবেচনা করবে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠানকালীন শিক্ষক, বর্তমানে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর দিনকেই সকল বিশ্ববিদ্যালয় জন্মদিন হিসেবে পালন করে থাকে। তবে নোবিপ্রবিতে গতানুগতিক এই প্রথার ব্যত্যয় ঘটেছে। 

তিনি বলেন, যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা পা রেখে ক্যাম্পাসকে মুখরিত করেছে, সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে পালিত হওয়া উচিৎ।

এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ও নোবিপ্রবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুরকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

এই বিষয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. দিদার-উল-আলম বলেন, আগের বছরে পালিত তারিখে এবারও বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালিত হবে। তবে যেহেতু অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক কার্যক্রম শুরুর দিনে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন করা হয়। আমরাও নির্দিষ্ট সভায় এটা নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত