গত কয়েক বছর ধরে রাজস্ব আদায়ে গড়ে ১৪ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হলেও এবার উল্টো পরিস্থিতি দেখা গেছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে রাজস্ব আদায় কমে গেছে পূর্বের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের চেয়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। রাজস্ব আদায়ে কমিয়ে আনা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ঘাটতি প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। আর গত অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা হিসাব করলে ঘাটতি দাঁড়ায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। দেশ স্বাধীনের পর এ নিয়ে দ্বিতীয়বার রাজস্ব আয়ে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হলো।
এনবিআর সূত্র জানায়, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একবার ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। ওই সময় দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রাজস্ব আয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। এরপর প্রায় ৪৫ বছর পর করোনাভাইরাসের প্রভাবে রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
দেশে বিগত বছরগুলোর রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখা গেছে, অতীতে বিভিন্ন সময়েই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ছিল। কিন্তু এ বছর তা রেকর্ড করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে এবারই প্রথম রাজস্ব আদায়ে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ পূর্বের অর্থবছরের চেয়েও আদায় কমে গেছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে এনবিআর রাজস্ব আদায় হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। আর এর আগের অর্থবছরে (২০১৮-১৯) আদায়ের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ আদায় কমেছে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা বা ৪ শতাংশের মতো।
মূলত বিশ^ব্যাপী করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে দেশের অর্থনীতি ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছে। ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে টানা ৬৬ দিনের সাধারণ ছুটিতে দেশের শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য একপ্রকার বন্ধ হয়ে যায়। যার প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতির কারণেই রাজস্ব আদায়ে এই টালমাটাল অবস্থা তৈরি হয়েছে। গত অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি ছিল না। তবে করোনার কারণে গত মার্চ থেকে রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক বাজে অবস্থা তৈরি হয়। এর মধ্যে দুই মাস দেশের অর্থনীতি কার্যত অচল ছিল। অর্থনীতি ধীরে ধীরে চালু হলেও সহসা করোনা থেকে উত্তরণ এবং অর্থনীতিতে গতি আসার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে আগামী মাসগুলোতেও রাজস্ব আদায়ে গতি আসার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি বাজেটে বিশাল রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। চলতি অর্থবছর রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে আদায়কৃত রাজস্বের ওপর প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়ায় ৫৩ শতাংশের ওপরে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাস্তবে অসম্ভব। ফলে নতুন করে শুরু হওয়া অর্থবছর শেষে বিশাল রাজস্ব ঘাটতি দেখতে হতে পারে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, বর্তমানে তো করোনার কারণে পরিস্থিতি খারাপ। যেকোনো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও এত বেশি হারে রাজস্ব আদায় করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, এই অর্থবছরেও বিশাল রাজস্বের ঘাটতি তৈরি হবে।
জানা গেছে, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি হারে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২০০৮-০৯ অর্থবছরে, ২৩ শতাংশ। এনবিআরের অতীত রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ।
