যে স্বপ্নটা বুকে লালন করে সবুজ ঘাস দাপিয়ে বেড়িয়েছেন এতদিন, সেটা হয়তো সত্যি হতে চলেছে। এখন সামনে বড় চ্যালেঞ্জ কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছানোর। লক্ষ্য ছুঁতে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার পণ করেছেন তিন তরুণ। বলা হচ্ছে একদিন আগে প্রাথমিক জাতীয় দলে ডাক পাওয়া নাজমুল ইসলাম রাসেল, ম্যাথিউজ বাবলু আর সুমন রেজার কথা। ইংলিশ হেড কোচ জেমি ডে’র চোখে এরা দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ তারকা। প্রথমবারের মতো ডাক পাওয়াদের তালিকায় আছেন ফিনল্যান্ড বংশোদ্ভূত তারিক কাজীও। তবে ইউরোপিয়ান ফুটবল সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা তারিকের সঙ্গে রাসেল, বাবলু, সুমনকে মেলানো যাবে না। ছোট দলে খেলে, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেও এরা এখন দেখছেন বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন।
দিনাজপুরের সাঁওতাল পরিবারের ছেলে ম্যাথিউস বাবলুর বয়স ২১। ১৪ বছর বয়সে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই মা আর তিন ভাই-বোনের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আসে তার কাঁধে। একটা সময় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নটাই ফিকে হয়ে গিয়েছিল সিলেট বিকেএসপি’র জন্য অনূর্ধ্ব-১৮ বছর বিভাগের বাছাইয়ে টিকে যাওয়া বাবলুর। ২০১৭ সালে খেলার চিন্তা বাদ দিয়ে কনস্টেবল পদে পুলিশে চাকরি নেন। কিন্তু সেই চাকরিটাই ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নটাকে আরও বড় করে তোলে বাবলুর, ‘ঢাকায় প্রথম এসেছিলাম ২০১২ সালে সিলেটে বিকেএসপিতে ফুটবল অ্যাকাডেমিতে সুযোগ পেয়ে। কিন্তু সেটা আর চালুই হয়নি। পরে দু’বছর শেখ জামাল অ্যাকাডেমিতে খেলি। বিজেএমসি দলে সুযোগ পাই ২০১৪-২০১৫ মৌসুমে। দু’মৌসুম সেখানে খেলার পর ২০১৭ সালে পরিবারের দুর্দশা ঘোঁচাতে পুলিশে চাকরি নিই কনস্টেবল পদে। তাই সে বছর আর ফুটবল খেলা হয়নি। পরের বছর পুলিশ এফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের জন্য দল গড়লে ফের ফুটবল খেলার সুযোগ পাই। করোনার জন্য বাতিল হওয়া লিগে দু’টি গোল করেছিলাম ব্রাদার্স আর বসুন্ধরা কিংসের বিপক্ষে। দু’টি ম্যাচেই ড্র করে দল। আর ফেডারেশন কাপে একটি গোল ছিল। তাই হয়তো কোচ আমাকে ডেকেছেন। এখন নিজের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করব মূল দলে সুযোগ পাওয়ার।’
উত্তর বারিধারার মতো নিচের সারির দলে খেলেই জেমি ডে’র নজর কাড়েন ফরোয়ার্ড সুমন রেজা। শক্তিতে পিছিয়ে বলেই এই দলটি ফেডারেশন কাপ ও লিগের ৫ ম্যাচে খেলেছে রক্ষণাত্মক কৌশলে। এই কৌশলে স্ট্রাইকার হিসেবে প্রমাণ দেওয়া মোটেই সহজ নয়। তারপরও সুমন গতি, ড্রিবলিং, দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে উঠে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ভয় ধরানোর মতো কিছু মুভে মন জয় করেছেন কোচের। বারিধারার ঘরের ছেলেতে পরিণত হওয়া সুমনের উঠে আসা বিমানবাহিনী দলে খেলে। ২০১৬-তে আন্তঃবাহিনী ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলার পর সে সময়ের কোচ রাসেদ আহমেদ পাপ্পুর মাধ্যমে বারিধারায় সুযোগ পান। বারিধারার হয়ে দু’মৌসুম চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ ও দু’মৌসুম প্রিমিয়ার লিগে খেলেছেন। অসম্পূর্ণ লিগে খেলা কয়েক ম্যাচ দিয়ে জাতীয় দলে ডাক পাওয়াটা যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না সুমনের, ‘ভাবিনি এত দ্রুত সুযোগ পাব। আসলে বারিধারাকে বাধ্য হয়েই রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলতে হয়েছে বড় দলের বিপক্ষে। ফলে এই ফরমেশনে নিজের সহজাত গোল করার দক্ষতা দেখানো কঠিন। তারপরও কাউন্টার অ্যাটাকে দ্রুত উঠে গিয়ে আক্রমণ রচনা করেছি দেখেই হয়তো কোচ আমাকে ডেকেছেন। এখন লক্ষ্য নিজেকে প্রমাণ করে মূল দলে সুযোগ করে নেওয়া।’ বলছিলেন ২৫ বছর বয়সী সুমন।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্সের ছাত্র রাসেলের বেড়ে ওঠা গাজীপুরে একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। বাবা পুলিশে ছোট পদে চাকরি করলেও অসম্পূর্ণ লিগে পুলিশ দলের নেতৃত্বের ভার ছিল রাসেলের কাঁধে। ২০১১ সালে চ্যাম্পিয়নশিপ দিয়ে শুরুর পর ২০১৪ সালে ফরাশগঞ্জের হয়ে প্রথম খেলেন প্রিমিয়ার লিগে। জাতীয় দলে খেলার স্বপ্নটা অনেকদিনের। কিন্তু বয়স হয়ে গেছে ২৫। তাই দেরিতে হলেও একটা সুযোগ পাওয়ায় উচ্ছ্বসিত রাসেল বলেন, ‘আমার নেতৃত্বে পুলিশ এফসি ফেডারেশন কাপের সেমিফাইনাল খেলে। লিগেও ভালোই খেলছিলাম। কিন্তু করোনার কারণে বাতিল হয়ে গেল। তবে এত কম খেলা দেখেই জাতীয় দলের কোচ আমাকে পছন্দ করায় সত্যিই খুব খুশি। তবে জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন অনেক দিনের। দেরিতে হলেও সেটা বাস্তব হতে চলেছে। এখন মূল দলে জায়গা পাওয়ার চ্যালেঞ্জটা জিততে চাই।’
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের মূল দলে সুযোগ মিলবে কিনা এখনই বলার সময় আসেনি। তবে ছোট দলে খেলেও বড় স্বপ্ন দেখার পুঁজিটা ঠিকই পেয়ে গেছেন তিন তরুণ।