বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ন বিষয়। আর এই জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মূলত দায়ী কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, বনভূমি উজার সহ মানুষের বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ড ও অপরিকল্পিত নগরায়ন।
উন্নত বিশ্ব তাদের নিজেদের স্বার্থে ও উন্নয়নের জন্য কার্বন নিঃসরণ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের তথা পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে কার্বনের অবদান সবচেয়ে বেশি। বিশ্বে সব থেকে বেশি কার্বন নিঃসরনকারী দেশগুলো হচ্ছে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত, রাশিয়া, জাপান, কানাডার মত উন্নত দেশগুলো। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রে ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং এই দেশগুলো ২০১৭ সালে ৫৮ শতাংশ কার্বনডাই-অক্সাইড গ্যাস নির্গমন করে।
করোনার কারণে জানুয়ারি থেকে পৃথিবী কার্যত লকডাউনে চলে যায়। এর মূল কারণ ছিল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করা। করোনা মানুষের জীবনযাত্রা ও আর্থসামাজিক অবস্থার সাথে সাথে পরিবেশে উপরেও অভাবনীয় প্রভাব ফেলেছে।
বর্তমানে করোনার কারনে সারা বিশ্বে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বড় বড় কলকারখানা, যাতায়াত ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় সারা বিশ্বে কার্বন নির্গমনের পরিমান কমে গেছে। এছাড়া আমরা আমাদের দৈন্যন্দিন নানান কর্মকান্ডে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করি যা কার্বন নিঃসরনের পরিমান অনেকাংশে বাড়িয় দেয়। অন্যান্য বছরের তুলনায় লকডাউনের কারনেও জীবাষ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমে গেছে বহু গুন ফলে সব মিলিয়ে কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরন হ্রাস পেয়েছে অনেক।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনির একদল গবেষক জানিয়েছেন বিভিন্ন দেশে লকডউনে শিল্পকারখানা বন্ধ রয়েছে ফলে বৈশ্বিক কার্বন নির্গমনের ৪ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে। যা জলবায়ু তথা তাপমাত্রার উপর প্রভাব ফেলছে। কারন তাপমাত্রা বৃদ্ধির অন্যতম কারন হচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বৃক্ষ নিধন।
কিন্তু বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরনের পরিমান কমলেও এর তেমন কোন প্রভাব ঢাকার তাপমাত্রা পড়েনি কেন?
ঢাকা অত্যন্ত জনবহুল ও অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে ওঠা একটি শহর্। ঢাকার তাপমাত্রার বৃদ্ধি জন্য বৈশ্বক উষ্ণতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো নির্মানে অপরিকল্পনা, বনাঞ্চলের পরিমান হ্রাস, জলা ভূমি দখল ও ভরাট, নগরায়ন বৃদ্ধিতে অপরিকল্পনা ইত্যাদি দায়ী। লকডাউনের কারনে ঢাকার শিল্প কারখানা, যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও আবার সিমিত পরিসরে চালু হয়েছে সবকিছু। ফলে তাপমাত্রা উপর প্রভাব পড়া শুরু হয়েছে। বিস, অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক যৌথ গবেষণার তথ্য মতে, ঢাকা শহরে গ্রীষ্ম ও বর্ষায় গ্রামের থেকে সাড়ে তিন ডিগ্রী সে, তাপমাত্রা বেশি থাকে। ঢাকা শহরের বিল্ডিং গুলো এমন ভাবে তৈরী যাতে বায়ু নির্গমনের ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। নগর বৃদ্ধি যানবাহন চলাচল এবং গাছপালা এবং জলাশয় হ্রাসের দ্রুত গতির ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নির্মাণ উপকরণ তাপ ফাঁদ এবং শীতল প্রযুক্তির উচ্চ ব্যবহারের ফলে অপরিকল্পিত অঞ্চলের তুলনায় পরিকল্পিত অঞ্চলে (গুলশান ও উত্তরা এর মতো ) তাপমাত্রা বৃদ্ধি হার বেশি।
লকডাউন মধ্যে ঢাকার অভিজাত আবাসিক এলাকায় এসির ব্যবহার হ্রাস না পাওয়ার ফলে কার্বন নির্গমনের পরিমাণ বেড়েছে। ঢাকার প্রতি বর্গকিলোমিটার ৫৫ হাজার মানুষ বাসকরে এছাড়া সবুজ চত্বরের অভাব জলাশয় ভরাট ইত্যাদি নিঃসন্দেহে তাপমাত্রা বাড়িয়েছে।গাছ তাপ শোষণ করে ঠান্ডা রাখে পরিবেশকে, এছাড়া জলাভূমি ও তাপ শোষনে সহায়তা করে । একটি আদর্শ নগরীতে ২৫ ভাগ উন্মুক্ত এলাকা থাকা প্রয়োজন কিন্তু ঢাকাতে উন্মুক্ক্ত স্থানের বড়ই অভাব। একটি দেশের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশ আছে ১৭ শতাংশ। ঢাকাতে সবুজ অঞ্চলের পরিমান আরো কম যেটা ৭% এর বেশি না। ফলে ঢাকার তাপমাত্রা উপর তেমন কোন প্রভাব পড়েনি।
নিম্নে ২ টি চিত্রের মাধ্যমে ২০১৯ এবং ২০২০ এর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা দেখানো হল-

উপরের দুইট চিত্রে ২০১৯ এবং ২০২০ এর জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা দেখানো হয়েছে। দুইটি বছরের প্রথম ছয় মাসের তাপমাত্রার তারতম্য তেমন নেই। লকডাউনের ফলেও তাপমাত্রা হ্রাস পায়নি। বরং এপ্রিল মাসের তাপমাত্রা গত বছরের থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে।
শহুরে তাপমাত্রা প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষত দিনের বেলাতে। নদী হ্রদ পার্ক উপকূল গাছ এবং পানির ফোয়ারা উল্লেখযোগ্য ভাবে তাপীয় আরাম সরবারহে সাহায্য করে থাকে। কিন্তু লকডউনের মধ্যেও গুলশান বনানী উত্তরার মত এলাকাগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের অতিরিক্ত ব্যবহারের তাপমাত্রা কমার পরিবর্তে কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে রাজধানীর নাগরিকরা যে হুমকির মুখোমুখি হচ্ছেন সেগুলির মধ্যে জীবাণু এবং ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকার হার বৃদ্ধি মানবদেহে এবং মনোবিজ্ঞানের উপর বিরূপ প্রভাব এবং কাজের ক্ষমতা হ্রাস রয়েছে।
কিছু কিছু পদক্ষেপ হয়ত ঢাকার তাপমাত্রার কমাতে সহায়তা করতে পারে।
১।রাজধানীর বাড়ীর ছাদ, বানিজ্যক ভবন ও কলকারখানা অঞ্চলে বৃক্ষ রোপণের পরিমান বাড়াতে হবে।
২। ছাদ বাগান তাপমাত্রা ২ থেকে ৩ ডিগ্রী পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে। বিল্ডিংগুলিতে ছোট গ্রিন স্পেসগুলি তাপ আরামও দেয়্ এবং উৎপাদনশীলতার উপর ইতিবাচক প্রভাব তৈরি করে ।তািই ছাদ কৃষির ব্যাপারে নাগরিকদের সরকারি ভাবেই উৎসাহী করতে হবে।
৩। অপরিকল্পিত শহরকে পরিকল্পনার মধ্যে আনতেহবে। দিনে দিনে শহরের ব্যাপ্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে ফলে দীর্ঘ মেয়াদী মাস্টার প্লান নিয়ে এগোতে হবে। উন্মুক্ত স্থান, 25 শতাংশ বনভূমি জলাশয় ও খেলার মাঠ ইত্যাদি পরিকল্পনায় রাখতে হবে।
৪। যানবাহন ও কলকারখানা পরিবেশ বান্ধব হিসাবে গড়ে তুলতে হবে।
৫। ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধি হ্রাস ও অবকাঠামো নির্মানে নিতে হবে বাস্তব সম্মত পরিকল্পনা।
৬। কার্বন নিৎসরণ হার হ্রাস, সঠিক বিল্ডিং কোড বজায় রাখা এবং ঘন জনবহুল অঞ্চলে জলাশয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি হলে তাপমাত্রা কমানো যেতে পারে।
৭। বাসা বাড়ী অফিস ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও যানবাহনে এসির ব্যবহার কমাতে হবে।
৮। প্লাস্টিকের বিলবোর্ড এবং চিহ্নগুলি অপসারণ করতে হবে।
৯।ভূগর্ভস্থ পানি মাটি শীতল রাখতে সহায়তা করে। এই মাটি পরিবেশের তাপ শোষণ করে তাই ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমানোর জন্য বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহারে নাগরিকদের উৎসাহী করতে হবে। সরকারীভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে করে প্রতিটি বাড়িতেই বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা থাকে।
প্রাথমিকভাবে, এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হলে ঢাকাতে তাপমাত্রা কমানো যেতে পারে। ঢাকাতে কিছু এলাকা হিট আইসল্যান্ড বা তাপ-দ্বীপ রয়েছে সেই এলাকাগুলোতে বেশি করে গাছ লাগাতে হবে।
লেখক: মো. শাহিন রেজা, শিক্ষক, মুসফেরা জাহান শর্মি, নগর পরিকল্পনাবিদ।
