ক্ষমতাসীন সরকারের টানা প্রায় এক যুগের শাসনামলে বেশকিছু মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় প্রকল্প সংখ্যা ও বরাদ্দে পরিমাণও হু হু করে বেড়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের বিপরীতে অস্বাভাবিক বরাদ্দের হার নেহায়েত কম নয়। অন্যদিকে উন্নয়নে মেগা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজের গুণগতমান নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে উন্নয়ন হলেও তা টেকসই হচ্ছে না। বিষয়গুলো নিয়ে এবার নড়েচড়ে বসেছে পরিকল্পনা কমিশন। আগামী বৃহস্পতিবার গুরুত্বপূর্ণ ২৩ সচিবের সঙ্গে বৈঠকে বসছে পরিকল্পনা কমিশন। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এতে সভাপতিত্ব করবেন। সভায় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি ও গুণগত মানসম্মত প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান দেশ রূপান্তরকে গতকাল সোমবার বলেন, করোনার কারণে গত অর্থবছরে এডিপি কাক্সিক্ষত হারে বাস্তবায়ন করা যায়নি। এখনো করোনা রয়ে গেছে। এর মধ্যেই কীভাবে এডিপি বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো যায়, সেটা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে। এছাড়া সম্প্রতি বিভিন্ন প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে প্রচুর সমালোচনা হচ্ছে। এটা সরকারের জন্য বিব্রতকর। এজন্য সচিবদের সাবধান করা হবে, যেন ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর আগে ঠিকঠাকভাবে দেখে পাঠানো হয়। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশন এখন থেকে কঠোর হবে। কোনো অসংগতি দেখলে প্রকল্প ফেরত পাঠানো হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, উন্নয়নে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, কিন্তু টেকসই হচ্ছে না এটা সত্য। আমরা এখন থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুণগতমান নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিচ্ছি। আগে যা হয়েছে হোক, ভবিষ্যতে যেন গুণগতমান নিশ্চিত করা যায় সেটি দেখা হচ্ছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ থেকে এ বৈঠকের একটি চিঠি সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপি পর্যালোচনা ও ২০২০-২১ অর্থবছরের এডিপি সুষ্ঠু ও গুণগতমান নিশ্চিত করে বাস্তবায়নে সভা হবে। এতে পরিকল্পনামন্ত্রী সভাপতিত্ব করবেন।
পরিকল্পনা কমিশনের সিনিয়র সহকারী প্রধান রুমি তনচংগ্যা স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ডিপিপির গুণগতমান বিষয়ে আলোচনা ও কিছু কেস স্টাডি সভায় উপস্থাপন করা হবে। সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব, সচিব ও ভারপ্রাপ্ত সচিবদের সশরীরে উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং বিদেশি উৎস থেকে ৭০ হাজার ৫০২ কোটি টাকার সংস্থান করা হবে। স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ৮৯ প্রকল্পসহ মোট ১ হাজার ৬৭৩টি প্রকল্পের আওতায় এ অর্থ ব্যয় করা হবে। তবে করোনার কারণে এ বরাদ্দের প্রকল্পকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে (নিম্ন, মধ্য ও সর্বোচ্চ) তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে নিম্ন অগ্রাধিকারভুক্ত প্রকল্পের আওতায় আপাতত অর্থ ছাড় স্থগিত করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এ ক্ষেত্রে মেগা বরাদ্দ পাওয়া মন্ত্রণালয়গুলোর প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের যুগ্ম প্রধান প্রকৌশলী মো. নজিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতি বছর এডিপির মোট বরাদ্দের বড় অংশ ১০টি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্রকল্পের বাস্তবায়নে গতি এলে এডিপি বাস্তবায়নের হার এমনিতেই বেড়ে যাবে। এজন্য বৈঠকে এ ১০ মন্ত্রণালয়ের এডিপি বাস্তবায়নের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, করোনার কারণে গত অর্থবছরে সংশোধিত এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৮০ দশমিক ১৮ শতাংশ, এটি দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন। ঈদুল আজহার পর থেকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও করোনার ঝুঁকি রয়েই গেছে। ফলে চীন ও জাপানসহ বিদেশি পরামর্শক ও টেকনেশিয়ান আসতে পারছে না। এ অবস্থার মধ্যেই এডিপি বাস্তবায়নের গতি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
