৩ কিশোরকে পিটিয়ে হত্যা

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ৫ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২০, ০৫:২৩ এএম

যশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন কিশোরকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় ওই কেন্দ্রের বরখাস্ত হওয়া সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদসহ পাঁচ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেন্দ্রটির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হেফাজতে নিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের পর ওই পাঁচ জনকে গত শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তার দেখানো হয় বলে জানিয়েছেন যশোরের পুলিশ সুপার মো. আশরাফ হোসেন। গ্রেপ্তার এই পাঁচজনকে গতকাল শনিবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

আবদুল্লাহ আল মাসুদ ছাড়াও গ্রেপ্তার অন্যরা হচ্ছেন কেন্দ্রের সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মাসুম বিল্লাহ, সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর (প্রবেশন অফিসার) মুশফিকুর রহমান, শরীরচর্চা প্রশিক্ষক ওমর ফারুক ও কারিগরি প্রশিক্ষক শাহানূর আলম। তাদের গতকাল বিকালে যশোরের মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক রোকিবুজ্জামান। বিচারক মাহাদী হাসান শুনানি শেষে আবদুল্লাহ আল মাসুদ, মাসুম বিল্লাহ ও মুশফিকুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অন্যদিকে ওমর ফারুক ও শাহানূর আলমকে তিন দিন হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়। এছাড়া আদালত শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাক্ষ্যগ্রহণ করে তা নথিভুক্ত করে।

পরিদর্শক রোকিবুজ্জামান জানান, তিনি গ্রেপ্তার প্রত্যেকের জন্য সাত দিন করে রিমান্ডের আবেদন জানিয়েছিলেন।

এর আগে নিহত কিশোর পারভেজ হাসানের বাবা রোকা মিয়া শুক্রবার রাতে যশোর কোতোয়াালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এতে তিনি তার ছেলেকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের অজ্ঞাত পরিচয় কর্মকর্তাদের আসামি করেন। এ মামলায় কেন্দ্রের ওই পাঁচ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয় বলে জানিয়েছেন মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা যশোরের চাঁচড়া পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা পরিদর্শক রোকিবুজ্জামান।

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে যশোর সদর উপজেলার পুলেরহাটে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে তিন কিশোরের মৃত্যু হয়, আহত হয় আরও অন্তত ১৫ জন। এ ঘটনায় কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদ ও এক কিশোরসহ ১২ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। ঘটনা তদন্তে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর।

গতকাল এক প্রেস ব্রিফিংয়ে যশোরের পুলিশ সুপার মো. আশরাফ হোসেন জানান, সন্দেহভাজনদের হেফাজতে নিয়ে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের পর কেন্দ্রের পাঁচ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

পুলিশ সুপার বলেন, ‘তারা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হওয়ায় খুবই সতর্কতার সঙ্গে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এমনও হয়েছে একাধিক জনকে মুখোমুখি এবং জিজ্ঞাসা-পুনঃজিজ্ঞাসা করা হয়েছে। এরপর নিশ্চিত হওয়া গেছে তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে।’

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ঘটনাকে অমানুষিক অ্যাখ্যা দিয়ে জেলার পুলিশ প্রধান বলেন, ‘পৈশাচিকভাবে পেটানো হয় ওই কিশোরদের। বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা থেকে তাদের পেটানো শুরু হয়। এক একজনকে পিটিয়ে আহত করে ডরমেটরির একটি কক্ষে ফেলে রাখা হয়।’

আশরাফ হোসেন আরও জানান, গত ৩ আগস্ট বন্দি কয়েকজন কিশোর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রধান নিরাপত্তাকর্মীর ওপর হামলা করে তার একটি হাত ভেঙে দেয়। এর আগে ওই নিরাপত্তাকর্মী নূর ইসলাম বন্দি কিশোর হৃদয়কে তার মাথার চুল কেটে দিতে বলেন। ওই কিশোর রাজি না হওয়ায় গালিগালাজ করেন নূর ইসলাম। এরপর তিনি অফিস কক্ষে কিশোর হৃদয় ও তার বন্ধু পাভেলের বিরুদ্ধে মাদকাসক্তি ও সমকামিতার অভিযোগ করেন। এ কথা সেখানে উপস্থিত পাভেল গিয়ে হৃদয়কে জানায়। তখন তারা হামলা করে নূর ইসলামের ওপর। তার ওপর হামলার ওই ঘটনায় দায়ী ১৮ জনকে সিসি ক্যামেরার ভিডিওচিত্র থেকে শনাক্ত করে কেন্দ্র কর্র্তৃপক্ষ। এরপর গত বৃহস্পতিবার বেলা ১২টার দিকে ওই ১৮ জনকে ডেকে নেওয়া হয় সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মাসুদের কক্ষে। সেখান থেকে এক একজন করে ডেকে অপর একটি কক্ষে নিয়ে নির্দয়ভাবে পেটানো হয়। কক্ষের জানালার গ্রিল দিয়ে হাত ও পা বের করিয়ে বাইরে থেকে টেনে ধরে লোহার রড ও লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। এক্ষেত্রে অভিযুক্তরা সহায়তা নেন কিশোর বন্দিদের কয়েকজনের। তারা চেয়েছিলেন পেটানোর পর আহতদের কেন্দ্রের ভেতরে চিকিৎসা দেবেন। ওষুধের দোকানের একজন কমপাউন্ডারকে ডেকে এনে চিকিৎসাও দেওয়া হয়। কিন্তু পরপর তিন কিশোরের মৃত্যু হলে ঘটনাটি আর চেপে রাখা সম্ভব হয়নি। এসময় তারা কিশোরদের দুপক্ষের সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রচার করে। পুলিশকেও তারা প্রথমে এ কথা জানায়। কিন্তু জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে বৃহস্পতিবার রাতভর সেখানে অবস্থান করে বুঝতে পারেন, মিথ্যা বলছেন শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা। ওই রাতেই ১০ জনকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

তদন্ত কমিটির কাজ শুরু : শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে হতাহতের ঘটনায় সমাজসেবা অধিদপ্তর গঠিত তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। গতকাল সকালে কমিটির সদস্যরা যশোর জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে আহতদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর ঘটনাস্থল কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে যান।

কমিটির প্রধান সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) যুগ্মসচিব সৈয়দ মো. নূরুল বাসির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সবে কাজ শুরু করেছি। বলার মতো কোনো কিছু এখনো হয়নি।’

গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ৩৮ মিনিট থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত যশোর জেনারেল হাসপাতালে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে তিনটি মরদেহ আসে। এরপর রাত সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ১৪ জন আহত কিশোরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন শুক্রবার সকালে হাসপাতালে নেওয়া হয় আহত আরও একজনকে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত