শিশুশিক্ষা হোক পরীক্ষামুক্ত ও সৃজনশীল

আপডেট : ২৭ আগস্ট ২০২০, ১২:২৯ এএম

চলমান করোনা মহামারীতে দেশের শিক্ষার্থী-শিক্ষক-অভিভাবকরা অভূতপূর্ব এক সংকটে পড়েছেন। দেশে করোনা শনাক্তের পর গত ১৮ মার্চ থেকে সব স্কুল-কলেজ বন্ধ রয়েছে। ইতিমধ্যেই এই ছুটির মেয়াদ ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ানো হলেও সেপ্টেম্বর থেকে স্কুল-কলেজ খুলবে কি না সেটা এখনো অনিশ্চিত। এই অবস্থায় সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। একদিকে স্কুল বন্ধ আরেকদিকে মহামারীতে স্বাস্থ্যবিধি ও শারীরিক দূরত্ব মেনে চলতে গিয়ে এই শিশুরা প্রায় ঘরবন্দি জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। এদিকে চলতি শিক্ষাবর্ষ শেষ হতে আর মাত্র চার মাস বাকি। এমতাবস্থায় চলতি বছরের ‘পিইসি’ বা প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এখন করোনার কারণে এ ঘোষণা দেওয়া হলেও দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর এই পরীক্ষা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত অবশ্যই ইতিবাচক।

প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা না নেওয়ার প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনের পর মঙ্গলবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন এবং জ্যেষ্ঠ সচিব আকরাম আল হোসেন সাংবাদিকদের এই সিদ্ধান্ত জানান। তবে, প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয়ভাবে পরীক্ষা না হলেও বিদ্যালয় খোলা সম্ভব হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। বার্ষিক পরীক্ষায় মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ষষ্ঠ শ্রেণিতে উন্নীত করা হবে। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা অ্যাকাডেমির করা পাঠ পরিকল্পনা অনুযায়ী পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা নিতে হলে আরও প্রায় ৫০ কার্যদিবস পাঠদান প্রয়োজন। কিন্তু সেপ্টেম্বরে বিদ্যালয় না খোলা গেলে যে কার্যদিবস থাকবে, এতে পঞ্চম শ্রেণির বাকি পাঠদান শেষ করা সম্ভব নয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী পরীক্ষাটি না নেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

বিতর্কিত এই ‘পিইসি’ বা প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষাটিই জাতীয় শিক্ষানীতিতে নেই। তারপরও এ পরীক্ষাটি শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সহশিক্ষা কার্যক্রম ও সৃজনশীল পাঠদানের চর্চায় জোর না দিয়ে মুখস্থবিদ্যা নির্ভর পাঠদান ও পরীক্ষার পদ্ধতি চাপিয়ে দিয়ে শিশুদের এ পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলা সত্ত্বেও এ বিষয়ে জাতীয় শিক্ষানীতির পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন যেমন আটকে আছে, তেমনি শিশুশিক্ষাকে চাপমুক্ত করার বিষয়েও কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী বা ‘পিইসি পরীক্ষা’ তো বাতিল হয়ইনি বরং এই পরীক্ষা নিতে গিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে শিশুদের বহিষ্কার করার ঘটনায় গত বছর দেশজুড়ে আলোড়ন ওঠে। গত বছরের ১৯ নভেম্বর দেশ রূপান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘পিইসি পরীক্ষায় শিশু বহিষ্কার কেন’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি আদালতে গড়ায়। উচ্চ আদালত শিশু শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের আদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা হবে না সে বিষয়ে রুল জারি করে।

গত বছর শিশু শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার বোঝা নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ এবং আদালতের নির্দেশনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শিশুশিক্ষাকে চাপমুক্ত করার বিষয়ে নির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন বাচ্চাদের পরীক্ষা নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে, শুধু পরীক্ষা আর পরীক্ষা। বর্তমানে যে পিইসি পরীক্ষা নেওয়া হয়, এটা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। পিইসি নিয়ে নতুন কিছু ভাবতে হবে। উল্লেখ্য, ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। এই শিক্ষানীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ছিল প্রাথমিক শিক্ষার স্তর পঞ্চম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণিতে উন্নীত করার সুপারিশ। কিন্তু ১০ বছর পরও শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করলে পঞ্চম শ্রেণিতে এখন ‘পিইসি’ নামে যে পাবলিক পরীক্ষা আছে, সেটি আর থাকবে না।

ভুলে গেলে চলবে না প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার উদ্দেশ্য শিশুর মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো। এজন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের ভাষা, গণিত ও বিজ্ঞানের মতো মৌলিক জ্ঞানের বিষয়গুলোতে হাতেখড়ি দেওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ- প্রকৃতি-সমাজ-সংস্কৃতির প্রাথমিক পাঠ দেওয়া হয়। কেবল শ্রেণিকক্ষ আর পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ নয় এই পাঠদানের প্রক্রিয়া। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এজন্য নানা সহশিক্ষা কার্যক্রম থাকে। এভাবে চারপাশের জীবন ও জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে শিশুদের জানার কৌতূহলকে আরও উসকে দেবেন শিক্ষকরা। কিন্তু আমাদের শিক্ষা কাঠামোর একটা বড় দুর্বলতা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যথাযথ যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক না থাকা। এ কারণে সৃজনশীলতা নির্ভর শিশুশিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। তাই প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ ও বেতন-ভাতার বিষয়ে সরকারকে জোর দিতে হবে। তবে, সবার আগে শিশুশিক্ষার্থীদের ওপর থেকে ‘পিইসি’সহ এ ধরনের সব পরীক্ষার বোঝা স্থায়ীভাবে দূর করতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত