প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘মুজিববর্ষে ২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আমরা সব ঘরে আলো জ্বালাব। সব জায়গায় যাতে বিদ্যুৎ পৌঁছায়, সে জন্য সৌরবিদ্যুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের ১৮ জেলার ৩১টি উপজেলার শতভাগ বিদ্যুতায়নের উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
এ সময় সরকারপ্রধান দুটি পাওয়ার প্ল্যান্ট, ১১টি গ্রিড সাব-স্টেশন, ছয়টি নতুন সঞ্চালন লাইনও উদ্বোধন করেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে গণভবন থেকে ভার্চুয়াল কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
এ সময় শেখ হাসিনা বলেন, ‘ক্ষমতায় আসার পর আমাদের প্রধান চেষ্টা ছিল রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা। শুধু বাতি জ্বেলে বসে থাকা নয়। বিদ্যুৎ থাকলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর থেকে আমরা এ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পেরেছি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রাহক বাড়িয়েছি।’
২০৪১ সালের মধ্যে দেশে ৬০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। শহরের পাশাপাশি গ্রামের মানুষও যাতে বিদ্যুৎ পায়, সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ যা হয় তার চেয়ে কম দামে সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। তাই গ্রাহকদের বলব, অপচয় করবেন না। বিলটাও কম আসবে। এটি আমার বিশেষ অনুরোধ।’ মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য সরকার ভর্তুকিসহ সব ধরনের সহযোগিতা করছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি যখন ক্ষমতায়, গোপালগঞ্জে বিদ্যুৎ পেতাম না। জেনারেটর চালিয়ে বাতি জ্বালাতে হতো। আমরা এমন কোনো বৈষম্য করিনি। যে কারণে বগুড়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্র।’
এই উদ্বোধনের মাধ্যমে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর, সরাইল ও আশুগঞ্জ; চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ ও কচুয়া; কুমিল্লার বরুড়া ও মুরাদনগর; ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও বোয়ালমারী; গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর; ঝিনাইদহের ঝিনাইদহ সদর; মানিকগঞ্জের মানিকগঞ্জ সদর, দৌলতপুর, সিঙ্গাইর ও শিবালয়; মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর; নওগাঁর মান্দা, ধামইরহাট, সাপাহার; নীলফামারী জেলার ডোমার; নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ; পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ, রাজবাড়ীর রাজবাড়ী সদর, পাংশা ও বালিয়াকান্দী; রাজশাহীর বাগমারা; সাতক্ষীরার সাতক্ষীরা সদর; সিলেট জেলার জকিগঞ্জ ও ওসমানী নগর; নরসিংদীর রায়পুরা এবং মাদারীপুরের কালকিনী।
এ ছাড়া কনফিডেন্স পাওয়ার বগুড়া-১ লিমিটেডের ১১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং নোয়াখালীর এইচএফ পাওয়ার লিমিটেডের ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি উদ্বোধন করেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মহাস্থানগড় ১৩২/৩৩ কেভি, রাজশাহী (উত্তর) ১৩২/৩৩ কেভি, চৌদ্দগ্রাম ১৩২/৩৩ কেভি, ভালুকা ১৩২/৩৩ কেভি, বেনাপোল ১৩২/৩৩ কেভি ও শরীয়তপুর ১৩২/৩৩ কেভি সাব-স্টেশন উদ্বোধন করেন। ৪০০/২৩০/১৩ কেভি গ্রিড নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় শ্যামপুর ২৩০/১৩২ কেভি সাব-স্টেশন, পল্লী বিদ্যুতায়ন প্রকল্পের আওতায় গ্রিড সাব-স্টেশন এবং সঞ্চালন জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায় শেরপুর ১৩২/৩ কেভি ও কুড়িগ্রাম ১৩২/৩৩ কেভি, পল্লী বিদ্যুতায়ন প্রকল্পের আওতায় নড়াইল ১৩২/৩৩ কেভি এবং রাজেন্দ্রপুর ১৩২/৩৩ কেভি জিআইএস (গ্যাস ইনসুলেইটেড সুইসগিয়ার) প্রকল্পের আওতায় রাজেন্দ্রপুর ১৩২/৩৩ সাব-স্টেশন নির্মাণ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী যে ছয়টি সঞ্চালন লাইনের উদ্বোধন করেন সেগুলো হলো পটুয়াখালী (পায়রা)-গোপালগঞ্জ ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইন, যশোর-বেনাপোল ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন, শরীয়তপুর-মাদারীপুর ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন, তিস্তা-কুড়িগ্রাম ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন, মাগুরা-নড়াইল ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন ও পটুয়াখালী-পায়রা ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইন।
অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ তার মন্ত্রণালয়ের কার্যালয় থেকে এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন। এ সময় বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ড. সুলতান আহমেদ বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় থেকে ‘বাংলাদেশে বিদ্যুৎ খাত : বঙ্গবন্ধু থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা’ শীর্ষক একটি তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন। অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্রও প্রদর্শিত হয়।
আমাদের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, এই উপকেন্দ্রের বাস্তবায়নকারী সংস্থা পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, শ্যামপুর ২৩০/১৩২ কেভি গ্রেড উপকেন্দ্রের সক্ষমতা ৬০০ এমভিএ এবং উপকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় ১৩২ দশমিক ০১ কোটি টাকা। শ্যামপুরে ২৩০/১৩২ কেভি গ্রেড উপকেন্দ্র নির্মাণের উদ্দেশ্য নারায়ণগঞ্জ ও তৎসংলগ্ন এলাকার ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ ও গুণগত মানসম্পন্ন এবং নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি উপকেন্দ্র নির্মাণের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় লোডশেডিং ও লো-ভোল্টেজ সমস্যার সমাধান হয়েছে। পাশাপাশি গুণগত মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা তৈরি হওয়ায় আর্থিক কর্মকান্ডের সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
উদ্বোধনের সময় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিনের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম, নারায়ণগঞ্জ স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক শাকিল আহাম্মেদসহ অনেকেই।
আমাদের নড়াইল জেলা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বিশ^ব্যাংকের সহযোগিতায় বিদ্যুৎ বিভাগের অর্থায়নে নড়াইল সদরের আউড়িয়া ইউনিয়নের মুলদাইড় এলাকায় ৩ একর জমির ওপর ৪৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্র এবং ৪২ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৯ দশমিক ৪৬৮ কিলোমিটার মাগুরা-নড়াইল ১৩২ কেভি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। এই কেন্দ্র ও লাইন উদ্বোধনের ফলে নড়াইলের বিদ্যুৎ গ্রাহকরা লোডেশেডিং ও লো-ভোল্টেজের সমস্যার নিরসন হওয়াসহ এখন থেকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ পাবেন।
নড়াইল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভিডিও কনফারেন্সে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন বিশ্বাসসহ অনেকে।
আমাদের পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, মির্জাগঞ্জ উপজেলার ছয় ইউনিয়নের ৭১টি গ্রামে ৯১১ কিলোমিটার বিদ্যুৎ লাইন স্থাপন করা হয়েছে। নবনির্মিত একটি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে ৩২ হাজার ৪৯৫টি সংযোগ প্রদান করা হয়েছে। এতে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৮৩ কোটি টাকা। এ সময় ভিডিও কনফারেন্সে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক মো. মতিউল ইসলাম চৌধুরীসহ উপস্থিত ছিলেন মির্জাগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান খান মো. আবু বকর সিদ্দিকী, মির্জাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরোয়ার হোসেনসহ অনেকে।
আমাদের কুমিল্লা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড উপকেন্দ্রসহ ৬টি নতুন সঞ্চালন লাইন এবং কুমিল্লা, বরুড়া ও মুরাদনগর উপজলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের কার্যক্রমের ভার্চুয়াল উদ্বোধন করা হয়। এ সময় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে কুমিল্লা থেকে সংযুক্ত হন কুমিল্লা-৬ সদর আসনের সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার, কুমিল্লা ১১ চৌদ্দগ্রাম থেকে সাংসদ মো. মুজিবুল হক ও বরুড়া ৮ আসনের সাংসদ নাছিমুল আলম চৌধুরী নজরুল, জেলা প্রশাসক আবুল ফজল মীরসহ অনেকে।
