নারীসঙ্গের মন্ত্র বিয়ের প্রতিশ্রুতি!

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৫:০১ এএম

হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সাবেক সহকারী কমিশনার নাদির হোসেন শামীমের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেশ কয়েকজন নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী এমন দুজন নারীর কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর শামীমকে তলব করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। অভিযোগ তদন্তের জন্য আগামীকাল রবিবার বেলা ১১টায় সচিবালয়ের ১নং ভবনের ৩১৫ নম্বর কক্ষে নাদির হোসেন শামীম এবং অভিযোগকারী দুই নারীকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। তাদের কাছে গত ৭ সেপ্টেম্বর উপসচিব মো. জাহাঙ্গীর হোসেন স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয়।

শামীম বর্তমানে যশোর জেলা প্রশাসনে সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার পশ্চিম শালীহর গ্রামের আবদুল কুদ্দুসের ছেলে। তার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আনা দুই নারীরই বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। তাদের মধ্যে একজন বর্তমানে পেশায় শিক্ষিকা এবং আরেকজন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্রী।

অভিযোগকারী ওই শিক্ষিকা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সহকারী কমিশনার নাদির হোসেন শামীম হবিগঞ্জে চাকরি করার সময় ফেইসবুকের মাধ্যমে তার সঙ্গে পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ বছরের শুরুতে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সিলেটের একটি হোটেলে নিয়ে তার সঙ্গে রাত কাটান শামীম। পরে বিয়ের জন্য চাপ দিলে তাকে নানা ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়। তিনি আরও জানান, হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসকের কাছে শামীমের বিরুদ্ধে নালিশ নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও বিচারের বদলে পেয়েছেন ভয়ভীতি আর হুমকি।

ভুক্তভোগী এই নারী বলেন, ‘শুধু তাই নয়, শামীমকে হবিগঞ্জ থেকে ভোলায় বদলি করে আমার বিচার প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। তিনি কোথায় বদলি হয়েছেন সেই খবর জানতে সময় লেগেছে তিন মাস। এভাবেই দায় এড়িয়ে যান হবিগঞ্জ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। অপকর্মের কোনো বিচার না করে শামীমকে হবিগঞ্জ থেকে ভোলা জেলা প্রশাসনে বদলি করা হয়। হবিগঞ্জ ও গৌরীপুর থানায় মামলা করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া মামলা নেওয়া সম্ভব নয় বলে ওই দুই থানার ওসি জানিয়ে দেন।’

তিনি আরও জানান, গত ২৩ জুলাই ভোলার জেলা প্রশাসক বরাবর শামীমের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণার অভিযোগ করেন। এর আগে পারিবারিকভাবে বিয়ের বিষয়টি মেনে নেওয়ার জন্য গত ৪ জুলাই তিনি শামীমের ময়মনসিংহের গৌরীপুরের বাসায় যান। সেখানে শামীমের পরিবারের লোকজন তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেন। মোবাইলে থাকা শামীমের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক সংক্রান্ত প্রমাণগুলো জোর করে মুছে দেন। খবর পেয়ে স্থানীয় পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও এলাকাবাসী ঘটনাস্থলে যান। তখন শামীমের বাবা আবদুল কুদ্দুছ বলেন, ছেলের সঙ্গে তাদের পরিবারের কোনো সম্পর্ক নেই।

ভুক্তভোগী এই শিক্ষিকার দাবি, তিনি ছাড়াও আরও পাঁচজন নারীর সঙ্গে শামীম বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কথিত প্রেমে জড়িয়েছেন। বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে প্রতারণা করেছেন। প্রতারিতদের মধ্যে আনন্দমোহন কলেজ, বদরুন্নেছা কলেজ ও কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের চার ছাত্রী এবং চট্টগ্রামের এক নারী রয়েছেন।

শামীমের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগকারী আরেক নারীর বাড়ি ময়মনসিংহের গৌরীপুরে। তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের ছাত্রী। ভোলার জেলা প্রশাসকের কাছে করা লিখিত অভিযোগে তিনি বলেন, ২০০৭ সালে শামীম গৌরীপুর সরকারি কলেজ হোস্টেলে থেকে লেখাপড়া করাকালীন আমার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমি সে সময় গৌরীপুর পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী ছিলাম। ২০০৯ থেকে ’১৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়ে আমার সঙ্গে শারীরিকভাবে মিলিত হয়েছেন শামীম। বর্তমানে আমি আনন্দমোহন কলেজের মাস্টার্সের ছাত্রী। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ৩০ আগস্ট আমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে মিলিত হন শামীম। গত ২০ ফেব্রুয়ারি আমি এক বান্ধবীকে নিয়ে বিয়ের দাবিতে শামীমের বাবার বাসায় অবস্থান নিই। কিন্তু অযৌক্তিক দাবি নিয়ে তাদের পরিবারকে নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ এনে শামীমের বাবা উল্টো আমার বিরুদ্ধে গৌরীপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর শামীমের পরিবারকে অনুরোধের ঘটনাকে ‘ভয়ভীতি প্রদর্শন’ উল্লেখ করে তার ভাই কবীর হোসেন সুজন গত ২৩ ফেব্রুয়ারি আরেকটি সাধারণ ডায়রি করেন।

এদিকে শামীমের বিয়ের খবরে চট্টগ্রামের জান্নাত নামে আরেক নারী তার স্ত্রী বলে দাবি করেন। ওই নারীর দাবি, ধর্মীয় শরিয়া মোতাবেক বিয়ে করে শামীমের সঙ্গে আড়াই বছর ঘর-সংসারও করেছেন। তিনি এ অভিযোগটি মৌখিকভাবে গৌরীপুরের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও থানা পুলিশকে অবহিত করেছেন।

শামীমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ভোলার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলম সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শামীম গত ১০ মার্চ এখানে যোগদান করেন। দুই নারী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালে তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তদন্তের নিয়ম অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে বর্তমানে তিনি কোথায় কর্মরত আছেন তা আমার জানা নেই।’

তবে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, নাদির হোসেন শামীম বর্তমানে যশোর জেলা প্রশাসনে সহকারী কমিশনার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি একজন সহকারী জজকে দুই মাস আগে বিয়ে করেছেন।

প্রতারণার অভিযোগের বিষয়ে জানতে শামীমের দুটি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নাম্বারে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত