বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে নিরস্ত্র নাগরিকদের হত্যা, আহত কিংবা মারধরের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (সিবিএমপি) কার্যকরের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর পিলখানায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্সের (বিএসএফ) মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের ৫০তম সীমান্ত সম্মেলন শেষে যৌথ বিবৃতিতে এসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সম্মেলনে বিজিবি ডিজি সম্প্রতি ভারতের মানসিক ভারসাম্যহীনদের (পাগল) অনুপ্রবেশ বা জোরপূর্বক পুশইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ ও প্রতিবাদ জানান। পরে যৌথ ঘোষণাপত্রে তিনি এদের জাতীয়তা যাচাই এবং পরস্পরের সহযোগিতায় হস্তান্তর ও গ্রহণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বলেন।’
সম্মেলনে বিজিবি ডিজি মেজর জেনারেল মো. সাফিনুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিসহ ১৩ সদস্য অংশ নেন। অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানার নেতৃত্বে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের প্রতিনিধিসহ ৬ সদস্য অংশ নেন।
স্বাগত বক্তব্যে বিজিবি ডিজি উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সহযোগিতায় সন্তোষ প্রকাশ করে ভবিষ্যতে তা আরও বৃদ্ধির কথা বলেন। এ সময় বিএসএফ ডিজি সীমান্তে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিজিবি-বিএসএফের যৌথ কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (সিবিএমপি) কার্যকরের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সীমান্ত সম্মেলনে বরাবর ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের হত্যা বা গুলি করা হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। বিকল্প হিসেবে নন-লিথাল (প্রাণঘাতী নয়) অস্ত্র ব্যবহারেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখনো সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা অব্যাহত রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিজিবি-বিএসএফের গতকালের যৌথ ঘোষণাপত্রে বলা হয়, সীমান্তে উভয় দেশের নিরস্ত্র নাগরিকদের হত্যা, আহত বা মারধরের ঘটনা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার লক্ষ্যে ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তবর্তী এলাকায় যৌথ টহল বাড়ানো হবে। জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি বেগবান, প্রয়োজনে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের মাঝে আন্তর্জাতিক সীমানা আইনের বিধিবিধান সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, আন্তঃসীমান্ত বিভিন্ন অপরাধ দমনে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সিবিএমপি বাস্তবায়নে সম্মতি জানানো হয়। উভয় বাহিনী উপকৃত হবে এমন তাৎক্ষণিক ও দরকারি তথ্য বিশেষ করে অধিকতর তদন্তের জন্য আগ্নেয়াস্ত্র চোরাকারবারিদের ডিজিটাল ফটোগ্রাফ বিনিময়ে সম্মত হয়েছে।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, মানবপাচার ও অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম করা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ, উভয় দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী মানবপাচারে ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত উদ্ধার ও পুনর্বাসনে সহায়তা, সীমানার কাঁটাতারের বেড়া কেটে অপসারণ বা ক্ষয়ক্ষতি রোধে যৌথ প্রচেষ্টা, অবৈধভাবে সীমানা অতিক্রম করা থেকে জনসাধারণকে বিরত রাখা, উভয় বাহিনী সীমান্তের অলঙ্ঘনীয়তা বজায় রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, উভয়পক্ষ অনুমোদন ছাড়া ১৫০ গজের মধ্যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করবে না, বন্ধ থাকা অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ দ্রুত সমাধান, যৌথ নদী কমিশনের অনুমোদন অনুযায়ী সীমান্ত নদীর তীর সংরক্ষণে সহায়তা, অননুমোদিত অভিন্ন সীমান্ত নদীর তীর সংরক্ষণে কাজ না করা এবং বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করে বাংলাবান্ধা-ফুলবাড়ী ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট ও রিট্রিট সেরিমনি উপলক্ষে দর্শক গ্যালারি নির্মাণে সহযোগিতার বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
সম্মেলনে বিএসএফ ডিজি রাকেশ আস্থানা সন্দেহভাজন ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিজিবি ও বাংলাদেশের অন্যান্য বাহিনীর পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সম্ভাব্য অবস্থান ধ্বংস করতে বিজিবির সহযোগিতা চান। এ সময় বিজিবি ডিজি তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, ‘বাংলাদেশে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর কোনো ক্যাম্প বা আস্তানা নেই। বাংলাদেশ কখনো তার ভূমি কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা অন্য কোনো রাষ্ট্রের বিশেষ করে ভারতের কোনো শত্রুপক্ষকে ব্যবহারের সুযোগ দেয়নি, ভবিষ্যতেও দেবে না।’
সম্মেলনে বিএসএফ ডিজি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে নতুন ডিজাইনের একসারি বিশিষ্ট কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বিষয় উত্থাপন করেন। এ বিষয়ে বিজিবি ডিজি মেজর জেনারেল সাফিনুল বলেন, ‘নতুন ডিজাইনের কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ না করার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
এ ছাড়া যৌথ ঘোষণাপত্রে উভয়পক্ষ সীমান্তে অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক দ্রব্য, মাদক, স্বর্ণ এবং জালমুদ্রা পাচার প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ, সীমান্তে চোরাচালানি দ্রব্যসহ আটক ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাৎক্ষণিক তথ্য এবং উভয় বাহিনীর প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের প্রতিবেদন বিনিময়ে সম্মতি দিয়েছে।
বিজিবি ডিজি বিএসএফ ডিজিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিজিবি এয়ার উইংয়ের দুটি হেলিকপ্টারের অধিকতর ট্রেনিং ও অপারেশনাল ফ্লাইট বিষয়ে অবহিত করেন। তিনি যেকোনো ধরনের বিভ্রান্তি ও ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে তাকে তার বাহিনীর প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত অবহিত করার অনুরোধ জানান। বিজিবি ডিজি বলেন, ‘বিষয়টি বিজিবি-বিএসএফের মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কমান্ডারদের আগেই অবহিত করা হবে।’ বিএসএফ ডিজি বিজিবি থেকে এ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার পর স্থানীয় বিএসএফ ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়ার আশ্বাস দেন।
এদিকে সম্মেলন শেষে বিএসএফ মহাপরিচালক রাকেশ আস্থানা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট দিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিজ দেশে ফিরে যান। গত বুধবার তিনি একই পথে বাংলাদেশে এসেছিলেন।
আখাউড়া চেকপোস্টে বিজিবির একটি চৌকস দল রাকেশ আস্থানাকে গার্ড অব অনার দেয়। পরে তিনি বিজিবি সদস্যদের মিষ্টি ও উপহার সামগ্রী দেন। এ সময় আখাউড়া বিজিবি রিজিওন কমান্ডার (সরাইল) ব্রিগেডিয়ার জাকির হোসেন বিএসএফ ডিজিকে একটি সম্মাননা ক্রেস্ট উপহার দেন।
