করোনাভাইরাস মহামারী কেবল দেশের স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতাই সামনে আনেনি, স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলোও সামনে নিয়ে এসেছে। এ খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মচারী এবং কর্মকর্তার একের পর এক দুর্নীতির খবর প্রকাশ্যে আসছে। এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল করা হয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দুর্নীতির জাল এত বিস্তৃত যে তাকে সমূলে উৎপাটন করা কতটুকু সম্ভব, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে স্বল্প বেতনের একজন গাড়িচালক যেভাবে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করার অন্যতম কুশীলবে পরিণত হয়েছেন, সেই সংবাদ শুধু বিস্মিতই করে না, উদ্বেগও সৃষ্টি করে।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গত শনিবার গভীর রাতে কামারপাড়া বামনেরটেক ৪২ নম্বর হাজি কমপ্লেক্স ভবন থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আবদুল মালেককে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জানা যায়, অষ্টম শ্রেণি পাস মালেক ১৯৮২ সালে সাভারে একটি স্বাস্থ্য প্রকল্পে গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন। দুই বছর পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন পুলে তার চাকরি স্থায়ী হয়। এরপর তিনি প্রেষণে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অধিদপ্তরে গাড়িচালক হিসেবে বদলি হন। গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত কাগজে-কলমে সেখানেই তিনি গাড়িচালক ছিলেন। এর আগে মালেক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদের গাড়ির চালক ছিলেন। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আগামী ২২ অক্টোবর মালেককে তলব করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তবে দুদকে হাজিরা দেওয়ার আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, গাড়িচালক মালেক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে প্রভাব খাটিয়ে টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন পদে লোকজনকে চাকরি দিয়েছেন। তাকে অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তারা সহায়তা করেছেন। তিনি নিজের মেয়ে, জামাতা, ভাই, ভাতিজাসহ স্বজনদেরও নানা পদে নিয়োগ দিয়ে যেন পুরো অধিদপ্তরকেই পারিবারিক প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলেছেন। মালেকের ঢাকায় অন্তত ৪টি ফ্ল্যাট, ১০টি প্লট, কামারপাড়ায় এক বিঘা জমি, বামনেরটেক এলাকায় ১০ কাঠা জায়গার ওপর ৭ তলা বাড়ি (বাড়ি নং ৪২, হাজী কমপ্লেক্স), স্ত্রীর নামে একটি ৭ তলা বাড়ি, হাতিরপুল এলাকায় নির্মাণাধীন ১০ তলা বাণিজ্যিক ভবন রয়েছে। এখন পর্যন্ত ৪টি বেসরকারি ব্যাংকে মালেকের নামে-বেনামে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার সন্ধান পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র ও জাল নোটের ব্যবসায় সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
প্রশ্ন হলো, গাড়িচালক হয়েও তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়োগ-বাণিজ্য কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন? কীভাবে তিনি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালকের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন? কী করে অধিদপ্তরের আরও দুটি গাড়ি সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত হতো? এটা যে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া সম্ভব নয়, সেটা সহজেই বোধগম্য। প্রকৃত অর্থে, দীর্ঘদিন ধরেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে দুর্নীতির মচ্ছব চলছে। এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেনের দুর্নীতির খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি গত ২৬ আগস্ট আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। এ ছাড়া অধিদপ্তরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ঠিকাদার সিন্ডিকেটের অশুভ তৎপরতার সংবাদও দেশ রূপান্তরসহ অনেক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এদিকে করোনা-দুর্যোগের এই বিশেষ পরিস্থিতিতেই নয়, এর আগেও স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে তৎপর ছিল দুদক। গত বছরের শুরুর দিকে স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাসেবায় যন্ত্রপাতির ব্যবহার, ওষুধ সরবরাহসহ ১১টি খাতে দুর্নীতি বেশি হয় বলে দুদক চিহ্নিত করে। এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশও করেছিল সংস্থাটি। এমনকি এর আগে দুদক অনেক মামলাও করেছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এরপরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি দেখা যায়নি। করোনা পরিস্থিতিতেও স্বাস্থ্য খাতে যেসব দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে, তার প্রতিটিই চাঞ্চল্যকর। এসব ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগের সক্ষমতা, সমন্বয়হীনতা ও ব্যর্থতার বিষয়গুলো উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য বিভাগের অন্দরে দুর্নীতির একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে।
জানা যায়, গত বছর দেশজুড়ে ক্যাসিনোসহ দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে শুদ্ধি অপারেশন শুরু করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক মালেকের গ্রেপ্তারের বিষয়টি দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ। স্বাস্থ্য সচিব আশ্বাস দিয়েছেন যে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই আশ্বাস যেন কথার কথা না হয়ে বাস্তবে রূপায়িত হয়, সেটাই কাম্য। আমরা মনে করি, দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলে স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজাতেই হবে। সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনার মাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। পাশাপাশি মালেকের মতো দুর্নীতিবাজদের আইনগত প্রক্রিয়ায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হবেএটাই প্রত্যাশিত।
