জাতিসংঘের ভার্চুয়াল বিশেষ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী

বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:৩৬ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও সুস্পষ্টভাবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবার কাছে একটি ‘বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ’ তৈরির জন্য জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘকে শতবর্ষ ও এর বেশি সময়ে সঠিক লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে, ইউএনজিএ-৭৫-কে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও সুস্পষ্টভাবে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবার কাছে একটি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ তৈরি করা উচিত।’

গত সোমবার (বাংলাদেশ সময় গতকাল মঙ্গলবার সকালে) জাতিসংঘের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে শুরু হওয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে ভার্চুয়াল বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা জাতিসংঘকে দুর্বল করে এমন ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুমোদন না দেওয়ারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই জাতিসংঘকে দুর্বল করে এমন কোনো ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অনুমোদন দেওয়া উচিত নয়। আমরা এটা পূর্ববর্তীদের কাছ থেকে পেয়েছি। এজন্য তাদের কাছে আমরা ঋণী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমাদেরও জাতিসংঘকে একটি সত্যিকার অর্থে সার্বিকভাবে আন্তর্জাতিক কার্যকরী সংস্থায় পরিণত করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি বলতে চাই যে, আমরা এমন অনেক মুহূর্ত প্রত্যক্ষ করেছি, যা আমাদের মানব সভ্যতার নতুন ইতিহাস গড়ে তুলেছে। ইউএনজিএ-৭৫ এ ধরনের আরেকটি মুহূর্ত আমাদের সামনে এনে দিয়েছে।’

চলমান বৈশ্বিক প্রাণঘাতী মহামারী কভিড-১৯ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই মহামারী আমাদের ২০৩০ এজেন্ডার লক্ষ্য অর্জনকে আরও কঠিন করে দিয়েছে।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘চলমান মহামারীসহ বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ ধরনের সংকট মোকাবিলার অক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে। এই মহামারী দেখিয়ে দিয়েছে যে উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশকেই পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে জাতিসংঘকে এখন বেশি প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘের নেতৃত্বে পরিচালিত বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রমে অনেক উপকৃত হয়েছে। তাই বাংলাদেশ জাতিসংঘের কাছে ঋণী।

শান্তিরক্ষী সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী শান্তি বজায় রাখতে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে এখন আমাদের দেশের সবচেয়ে বেশি সৈন্য ও পুলিশ সদস্য রয়েছে।

তিনি উল্লেখ করেন যে, বিশ্বের সংঘাতপ্রবণ দেশগুলোর শান্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের ১৫০ শান্তিরক্ষী সদস্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।

জাতিসংঘের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর সঙ্গে একই সময়ে হওয়ায় বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন যে, জাতিসংঘ ভবিষ্যতে মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে। এটা জাতিসংঘ ও বহুপাক্ষিকতার ওপর বাংলাদেশের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রমাণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার জন্য আমি জাতিসংঘের সব কর্মকর্তা ও সংস্থাগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন গত সোমবার ভার্চুয়াল প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান, ‘২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অন্যান্য বিশ্ব নেতার মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও পূর্বে ধারণকৃত ভাষণ দেবেন। প্রতি বছরের মতো এবারও তিনি বাংলায় বক্তৃতা দেবেন।’

কভিড-১৯ মহামারীর কারণে জাতিসংঘের ৭৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম বিশ্ব নেতারা সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভার্চুয়ালি যোগ দিচ্ছেন। এবারের ৭৫তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য হলো ‘আমরা ভবিষ্যৎ চাই, আমাদের জাতিসংঘের প্রয়োজন : বহুপাক্ষিকতার প্রতি আমাদের সম্মিলিত প্রতিশ্রুতি পুনর্নিশ্চিত করতে।’ (বাসস)

অপ্রয়োজনীয় সড়ক নির্মাণ করা যাবে না : প্রভাব খাটিয়ে নিজের বাড়ির পাশ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় রাস্তা নির্মাণ না করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তিনি বলেন, ‘কারও বাড়ির পাশ দিয়ে রাস্তা নিয়ে যাওয়ার জন্য বাড়তি সড়ক নির্মাণ করা যাবে না। এই ধরনের মানসিকতার বাইরে আসতে হবে। জমি সুরক্ষা করতে হবে। বেশি রাস্তা নির্মাণ করলে পানি চলাচলও বাধাগ্রস্ত হয়।’ সভা শেষে এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।

গতকালের একনেক সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ‘জামালপুর জেলার দিগপাইত-সরিষাবাড়ি-তারাকান্দি সড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ’ প্রকল্প পাস হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ২৭৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। এ প্রকল্প অনুমোদনকালে প্রধানমন্ত্রী সড়ক নির্মাণ বিষয়ে অনুশাসন দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘উনার (প্রধানমন্ত্রী) প্রথম মন্তব্য ছিল জামালপুরের সড়ক নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সড়ক নির্মাণ ভালো। মেইনটেন্যান্স আরও ভালো। কিন্তু একটা ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। শুধু নির্মাণ করলে হবে না। আমাদের আর্থিক সক্ষমতা, টেকনিক্যাল সক্ষমতারও মাপজোক রাখতে হবে।’

এম এ মান্নান বলেন, ‘তার (প্রধানমন্ত্রীর) বার্তা হলো, সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে খুব সচেতন হতে হবে। সড়ক চিন্তা করে বানাবেন। যাতে এটা আমাদের যথাযথভাবে কাজে লাগে, যাতে এটা মেইনটেন্যান্স করা যায়। আমরা আর্থিকভাবে এটা মেইনটেইন করতে পারব এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ যেমন আমার বাড়ির পাশ দিয়ে যাবে, এই ধরনের মানসিকতার বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। জমি সুরক্ষা করতে হবে, বেশি সড়ক নির্মাণ করলে জলাভূমির দেশে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, এটা জ্ঞানীরা আগেই বলেছেন। এই সম্পর্কে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) সড়ক নির্মাণ যারা করেন তাদের সাবধান হতে বলেছেন।’

পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, ‘যাদের অল্প জমি রয়েছে এবং সেই জমিতে বাড়িঘর করে থাকছে, সেসব জমি অধিগ্রহণ থেকে যতটা সম্ভব বিরত থাকতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।’

গতকালের একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী আরও কয়েকটি অনুশাসন দিয়েছেন বলেও জানান পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে প্রত্যেক উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল করা। সেজন্য ৪০টি উপজেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।’ এম এ মান্নান আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যারা বিদেশ থেকে ফেরত আসছেন তাদেরও প্রশিক্ষণ এবং অর্থ প্রণোদনা দেওয়া হবে। যাতে তারা আবারও বিদেশ গিয়ে বেশি আয় করতে পারেন।’

ইলিশের উন্নয়ন নিয়ে একটি প্রকল্প গতকালের একনেক সভায় পাস হয়। এই প্রকল্প অনুমোদনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইলিশ আমাদের নিজস্ব সম্পদ। এটির বিষয়ে স্বীকৃতি পেয়েছি। আমরা অবশ্যই ইলিশ উন্নয়নে পদক্ষেপ নেব। তবে খাচায় আবদ্ধ করে মাছচাষের বিষয়টিও নজরে রাখতে হবে। এই পদ্ধতির চাষকে এগিয়ে নিতে উৎসাহিত করা হবে।’

ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পামন্ত্রী বলেন, ‘প্রকল্প পাস হওয়া মানে টাকা খরচ নয়। আমরা প্রকল্প চলমান সময়েও নজরদারি করছি। আইএমইডি আছে তারা কাজ করছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত