সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারি চাঁদ (এমসি) কলেজে এক তরুণীকে স্বামীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ছাত্রাবাসের একটি কক্ষে দলবেঁধে ধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। এই ঘটনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের দৌরাত্ম্য আর যৌননিপীড়ন-ধর্ষণের মতো গুরুতর অভিযোগগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচনায় নতুন করে স্থান করে নিয়েছে। বিক্ষুব্ধরা প্রশ্ন করছেন সমাজ কি এতটাই অনিরাপদ হয়ে উঠছে যে, সন্ধ্যাবেলায় স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে বের হয়ে কলেজ ক্যাম্পাসেই দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হতে হচ্ছে সদ্যবিবাহিত এক তরুণীকে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় টিলায় ঘেরা এমসি কলেজ ক্যাম্পাস এলাকায় ঘুরতে গেলে পাঁচ-ছয়জন যুবক ওই তরুণীকে ঘিরে ধরে। ওই তরুণ-তরুণী স্বামী-স্ত্রী কি না এমন প্রশ্ন তুলে ওই যুবকরা প্রথমে তাদের কাছে চাঁদা দাবি করে। তারপর বলপ্রয়োগ করে তুলে নিয়ে ছাত্রাবাসের একটি কক্ষের সামনে ওই তরুণীকে দলবেঁধে ধর্ষণ করা হয়। কলেজের অধ্যক্ষসহ সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানিয়েছেন। এদিকে, এমসি কলেজের ঘটনার দুদিন আগে গত বুধবার খাগড়াছড়িতে এক বাড়িতে ঢুকে প্রতিবন্ধী পাহাড়ি তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও ডাকাতির ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ওই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সোচ্চার হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, শুক্রবার রাতে ছাত্রাবাসের যে কক্ষটির সামনে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল, সেটি ‘ছাত্রলীগের দখল করা কক্ষ’ হিসেবে পরিচিত। করোনাকালে কলেজ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ছাত্রাবাসটিতে অবস্থান করছিলেন ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিরা। এই ঘটনায় অজ্ঞাত তিনজনসহ ছয় জনের নামোল্লেখ করে মোট নয় জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ধর্ষণের শিকার তরুণীর স্বামী। মামলায় যে ছয় জনের নামোল্লেখ করা হয়েছে তারা সবাই ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে পরিচিত। কক্ষটিতে ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি ছাত্রলীগের কর্মী সাইফুর থাকতেন। পরদিন ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমান (২৮) ও অর্জুন লস্করকে (২৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এদিকে, স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্তরা এমসি কলেজ ও টিলাগড়কেন্দ্রিক ছাত্রলীগের একটি গ্রুপের সক্রিয় কর্মী এবং তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও সন্ত্রাস এমনকি সরকারি কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগও রয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী মুরারি চাঁদ কলেজে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় কেবল সিলেটের স্থানীয় রাজনীতিকরাই নন, জাতীয় নেতারাও মুখ খুলেছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন এমসি কলেজের ঘটনায় সরকারের অবস্থান কঠোর, অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হবে, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত থাকা ছাত্রলীগের জন্য নতুন কিছু নয়। আসলে ধর্ষকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এমন প্রথাগত বক্তব্য দিয়ে কখনোই সমস্যার সমাধান হবে না। যে সরকারের আমলেই হোক ক্ষমতাসীনদের সমর্থক ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা যখনই খুন-ধর্ষণ বা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হন তখনই নেতারা এমন বক্তব্য দেন; কিন্তু বিচারের বেলায় দেশবাসীর সামনে নতুন কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন হয় না। অথচ মানবাধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন বিচারহীনতাই সমাজে নারীর প্রতি এ ধরনের সহিংসতা না কমার অন্যতম প্রধান কারণ। উদাহরণ হিসেবে তারা জানাচ্ছেন দেশে ধর্ষণের ঘটনায় যেসব মামলা হয় সেখানে শতকরা মাত্র তিন ভাগ ঘটনায় শেষ পর্যন্ত অপরাধী শাস্তি পায়, আর ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় শাস্তি হয় মাত্র শূন্য দশমিক তিন ভাগ।
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে ১ হাজার ৪১৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আগের বছর ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭৩২ জন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে দেশে ধর্ষণের ঘটনা দ্বিগুণ বেড়েছে। এই পরিসংখ্যান সমাজে যৌননিপীড়ন ও ধর্ষণসহ নারীর প্রতি নানারকম সহিংসতার ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরছে। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে সারা দেশের স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ^বিদ্যালয়গুলো বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই যৌননিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনাও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে ২০০৯ সালে একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছিল উচ্চ আদালত। আদালতের ওই রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হলে হয়তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌননিপীড়নের ঘটনা কমে আসত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণ বা যৌননিপীড়নের ঘটনায় প্রায়শই কেবল প্রতিষ্ঠান বা ছাত্র সংগঠন থেকে বহিষ্কারের কথা শোনা যায়। কিন্তু এসব সহিংসতা ফৌজদারি অপরাধ হওয়ায় প্রশাসনিক ব্যবস্থাগ্রহণের পাশাপাশি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই বাদী হয়ে মামলা করা উচিত। একইসঙ্গে সমতলে কি পাহাড়ে সব ধর্ষণের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।
