হিজড়া, বৃহন্নলা বা কিন্নরী যে নামেই ডাকা হোক না কেন পরিবার ও সমাজে তারা নানাভাবে অবহেলিত ও অবাঞ্ছিত। তৃতীয় লিঙ্গের এ সম্প্রদায়ের মানুষেরা কোথাও নতুন শিশু জন্ম নিলে বকশিশ তুলে অথবা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে নেচে-গেয়ে জীবিকা চালিয়ে থাকেন। অবহেলিত এসব মানুষের জন্য গতকাল শুক্রবার রাজধানী ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে চালু হয়েছে একটি মাদ্রাসা। বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির নাম ‘দাওয়াতুল কুরআন তৃতীয় লিঙ্গের মাদ্রাসা’। শুধুমাত্র তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য দেশে এটিই প্রথম কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।
কামরাঙ্গীরচরের লোহার ব্রিজের ঢাল এলাকায় তিনতলা একটি ভাড়া বাড়িতে এই মাদ্রাসার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাড়িটির ওপর তলায় ১২০০ বর্গফুট জায়গা নিয়ে করা প্রতিষ্ঠানটিতে শতাধিক শিক্ষার্থী পাঠ নিতে পারবেন। অনাবাসিক এই মাদ্রাসায় যেকোনো বয়সী হিজড়া ভর্তি হতে পারবেন। গতকাল মাদ্রাসাটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ৪০ জন তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থী অংশ নেন।
মাদ্রাসাটির কার্যক্রম উদ্বোধন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাজী মো. সাইদুল মাদবর। দুই পর্বের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সকালে বাংলাদেশ হিজড়া কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সভাপতি আবিদা সুলতানা মিতু প্রধান অতিথি ছিলেন। বিকেলের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কামরাঙ্গীরচরের বাইতুল উলুম ঢালকানগর মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মুফতি জাফর আহমাদ।
২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকে হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে এ সংক্রান্ত নীতিমালা অনুমোদন করা হয়। পরের বছর ভোটার নিবন্ধন বিধিমালা প্রণয়নের সময়ই নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন ফরমে লিঙ্গ পরিচয় হিসেবে হিজড়া যুক্ত করে। এর পর থেকে তারা বিভিন্ন নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছেন।
কামরাঙ্গীরচরে তৃতীয় লিঙ্গের মাদ্রাসাটির অর্থায়ন করছে মরহুম আহমেদ ফেরদৌস বারী ফাউন্ডেশন। এর অধ্যক্ষ পরিচালক মুফতি আবদুর রহমান আজাদ নিজেও অন্যতম একজন উদ্যোক্তা।
অনুষ্ঠানে আবদুর রহমান আজাদ বলেন, ‘আমাদের এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা। দ্বিতীয় দিক হচ্ছে মানবিক দিক। কারণ তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরাও মানুষ, তারাও কোনো না কোনো মায়ের সন্তান। তাদের কোনো দোষ নাই। সব দোষ আমাদের। আমরা তাদের স্কুল, কলেজ, মসজিদে যেতে দেই না। এজন্য আমার সমাজ, আমি, আমার রাষ্ট্র দায়ী।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করব তাদের কুরআন শিক্ষা দিয়ে তাদের মধ্য থেকেই শিক্ষক তৈরি করার পাশাপাশি তাদের কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলার।’
উদ্বোধনী বক্তব্যে কাউন্সিলর হাজী মো. সাইদুল মাদবর বলেন, ‘আজকে যারা এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে প্রথমেই আমি তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষরা আমাদের সমাজের একটি অংশ। আমি সব সময় এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার চেষ্টা করি, যা সমাজের জন্য কল্যাণকর।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি অতি শীঘ্রই মেয়র মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলে এই মাদ্রাসাটির জন্য একটি স্থায়ী জায়গার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব। পাশাপাশি আমি তাদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে মেয়র মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলব।’
