হত্যা মামলার আসামিদের ৫৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ!

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০২০, ০৩:৫৩ এএম

পাবনায় একটি হত্যা মামলার তিন আসামিকে ঘটনাস্থল থেকে আটকের পরও তাদের ওই মামলায় গ্রেপ্তার না দেখিয়ে ৫৪ ধারায় সন্দেহভাজন হিসেবে আদালতে সোপর্দ করার অভিযোগ উঠেছে আমিনপুর থানা পুলিশের বিরুদ্ধে। এছাড়া পুলিশের সঙ্গে হত্যাকারীদের ‘যোগসাজশ ও প্রত্যক্ষ ইন্ধনে’ ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছে নিহতের পরিবার। এসব তথ্য জানিয়ে ন্যায়বিচার ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে গত বুধবার ভুক্তভোগী পরিবারটি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর লিখিত আবেদন করেছে। তবে আমিনপুর থানা পুলিশ সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই মামলাটির কার্যক্রম চলছে।

মামলার এজাহার থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আমিনপুর থানার আহম্মদপুর ইউনিয়নের দক্ষিণচর গ্রামের মাছেম মীরের সঙ্গে জমি নিয়ে একই গ্রামের তোফাজ্জল খানের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। এ নিয়ে গত ১৫ নভেম্বর বিকেলে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে তোফাজ্জল সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে মাছেম মীরকে পেটাতে শুরু করেন। এতে গুরুতর আহত মাছেম মীর (৫৫) বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর মারা যান। খবর পেয়ে এলাকাবাসী ঘটনাস্থল থেকে হামলাকারী তোফাজ্জল, গোলাপী ও তানিয়াকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরে রাতে এ ঘটনায় নিহতের বড় ভাই হাসেম মীর বাদী হয়ে আটক তিনজনসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে আরও অজ্ঞাতপরিচয় কয়েকজনকে আসামি করে আমিনপুর থানায় হত্যা মামলা করেন।

তবে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে আটকদের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার না দেখিয়ে পরদিন (১৬ নভেম্বর) ৫৪ ধারায় সন্দেহভাজন হিসেবে আদালতে সোপর্দ করে। মামলার নথি পর্যালোচনা করে পাবনা জজ কোর্টের আইনজীবী মো. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে পুলিশের প্রত্যক্ষ ইন্ধন ও অবহেলার কারণেই আসামিরা মাছেম মীরকে হত্যার সুযোগ পেয়েছে বলে অভিযোগ নিহতের পরিবারের। নিহতের ভাতিজা ফারুক মীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার চাচার হত্যাকারী তোফাজ্জল খানের করা মিথ্যা মামলায় ১৫ নভেম্বর সকালে আমার বাবা শুকুর মীর ও ভগ্নিপতি বাচ্চু শেখকে পুলিশ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর পুলিশের আরেকটি দল আমাদের বাড়িতে এলে ভয়ে আমরা পালানোর চেষ্টা করি। এ সুযোগে তোফাজ্জল দলবল নিয়ে আমাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে আমার চাচা মাছেম মীরকে পিটিয়ে হত্যা করে।’

অন্যদিকে মাছেম মীর হত্যা মামলার বাদী তার বড় ভাই হাসেম মীর বলেন, ‘ঘটনার দিন রাতেই থানায় এজাহার দায়ের করলেও পরদিন মামলাটি রুজু হয়। হত্যাকা-ের পর হাতেনাতে প্রতিবেশীরা তোফাজ্জল, গোলাপী ও তানিয়াকে আটক করে পুলিশে দিলেও অজ্ঞাত কারণে পুলিশ তাদের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার না দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে। এছাড়া আমার ভাইয়ের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সুরতহাল রিপোর্টে তা উল্লেখ করেনি।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আবদুল গাফফার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিহতের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। মাছেম মীর কীভাবে মারা গেছেন তা আমরা নিশ্চিত নই। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট না পাওয়ায় আসামিদের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি।’

মামলা তদন্তে গাফিলতি ও মাছেম মীর হত্যায় পুলিশের ইন্ধনের অভিযোগ অস্বীকার করে আমিনপুর থানার ওসি মো. মোজাম্মেল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই নিহতের ভাইসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তোফাজ্জল ও তার লোকজনের হামলার ঘটনার সঙ্গে ওই গ্রেপ্তারের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। পুলিশ নিরপেক্ষভাবে মামলাটি তদন্ত করছে।’

তবে অন্য মামলায় আটক থাকলেও হত্যা মামলার এজাহারনামীয় আসামিকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে মত দিয়েছেন একাধিক আইনজীবী। পাবনা জজ কোর্টের আইনজীবী মো. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিয়মিত হত্যা মামলা রুজু হলে এজাহারনামীয় আসামিদের সন্দেহভাজন হিসেবে আদালতে সোপর্দ করা প্রচলিত আইন পরিপন্থী। ময়নাতদন্তের রিপোর্টপ্রাপ্তির অপেক্ষায় মামলার আসামি গ্রেপ্তার ও তদন্ত কার্যক্রম থেমে থাকতে পারে না। এটি নজিরবিহীন এবং আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত