২৭ নভেম্বর শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলন দিবস। বিএমএর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. শামসুল আলম খান মিলন ১৯৯০ সালের এই দিনে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অগ্নিঝরা উত্তাল সময়ে বিএমএ মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের সঙ্গে রিকশায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে (তৎকালীন আইপিজিএম আর) পূর্বনির্ধারিত বিক্ষোভ সমাবেশে যাচ্ছিলেন। পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন টিএসসি এলাকায় তৎকালীন স্বৈরশাসক এরশাদের পেটোয়া বাহিনীর বুলেটে নির্মমভাবে নিহত হন তিনি। ডা. মিলন তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ এবং কলেজের বায়োকেমিস্ট বিভাগের প্রভাষক ছিলেন এবং ছাত্রজীবনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের (ঢামেকসু) ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এরশাদের সামরিক শাসন জারির শুরু থেকেই মেডিকেল কলেজগুলো স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল।’ ৯০ সালের মাঝামাঝি সামরিক শাসক এরশাদ প্রণীত গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতির প্রতিবাদে বিএমএর সঙ্গে যুগপৎভাবে ছাত্র সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে প্রতিটি মেডিকেল কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি ও জিএস এবং ডেন্টাল কলেজ থেকে দুজনকে নিয়ে আমরা সর্বদলীয় মেডিকেল ও ডেন্টাল ছাত্র ঐক্য পরিষদ গঠন করি। আমাকে উক্ত সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আহ্বায়ক ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস সারোয়ার রোমেলকে সদস্যসচিব মনোনীত করা হয়। এ ছাড়া সব মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ছাত্র সংগঠন ও ছাত্র সংসদের সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছিল সর্বদলীয় মেডিকেল ও ডেন্টাল ছাত্র ঐক্য পরিষদের শাখা কমিটি। একপর্যায়ে ডা. মিলন হত্যার প্রতিবাদে সর্বদলীয় মেডিকেল ও ডেন্টাল ঐক্য পরিষদ এবং বিএমএর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মেডিকেল ছাত্র সমাজ ও চিকিৎসক সমাজ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ডা. মিলন হত্যার প্রতিবাদে ও এরশাদের পতনের দাবিতে সর্বদলীয় মেডিকেল ও ডেন্টাল ছাত্র ঐক্য পরিষদ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাধারণ ছাত্রছাত্রী সব শিক্ষকের তাৎক্ষণিক পদত্যাগ ঘোষণার দাবিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মেডিকেল শিক্ষক সমিতি ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ একাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি সভা ঘেরাও করে রাখে। ঘেরাওয়ের একপর্যায়ে বাংলাদেশের সব মেডিকেল শিক্ষক পদত্যাগের সিদ্ধান্ত হয়।
এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র-শিক্ষকদের এক বিরাট বিক্ষোভ মিছিল প্রেসক্লাব অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। মিছিলে যোগ দেয় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতা। প্রেসক্লাবের সামনে আমার সভাপতিত্বে সর্বদলীয় মেডিকেল ও ডেন্টাল ছাত্র ঐক্যের সভায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ও মেডিকেল শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক কবির উদ্দিন আহমেদ দেশের সব মেডিকেল শিক্ষকের পদত্যাগের ঘোষণা দেন। বিএমএর নেতৃবৃন্দ, তৎকালীন কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য ও পেশাজীবী ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও প্রেসক্লাবের বিক্ষোভ-সমাবেশে যোগদান করেন। বাংলাদেশের আটটি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডাকা হয়। বিএমএ বাংলাদেশের সব চিকিৎসকের পদত্যাগ এবং বাংলাদেশের সব হাসপাতালে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘটের ঘোষণা দেয়। সবগুলো মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য এবং ছাত্রসংসদ লাগাতার বিক্ষোভ, ঘেরাও ও সমাবেশ আয়োজন করে।
আমাদের দাবির পাশাপাশি, বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের ব্যানারে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। ডা. মিলনের মৃত্যু সংবাদের খবরে সারা বাংলাদেশে বিস্ফোরণ ঘটে, বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। গণদাবি গণ-অভ্যুত্থানের দিকে পরিচালিত হয়। ভীত-সন্ত্রস্ত এরশাদ কারফিউ জারি ও জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। জনগণ ঘৃণাভরে সেই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে। রাতেই কারফিউ ও জরুরি আইন অমান্য করে মানুষের ঢল নামে ঢাকাসহ সারা বাংলার রাজপথে। ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস পরিণত হয় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে।
এ ক্যাম্পাসে চিরনিদ্রায় শায়িত ডা. মিলনের সমাধিস্থলে প্রতিদিন মানুষের ঢল নামতে থাকে। প্রতিদিন ছাত্র, চিকিৎসক, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ সব পেশার মানুষের বিক্ষোভ-সমাবেশে হতে থাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ মিনার চত্বরে। অন্যদিকে সব হাসপাতালে ধর্মঘট বাস্তবায়নে ছাত্র-চিকিৎসকের সমন্বয়ে দল বেঁধে পাহারা দেওয়া হয়, যাতে সরকারের সন্ত্রাসী বাহিনী অবস্থান নিতে না পারে।
ইতিমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব ক্যাম্পাস থেকে এরশাদের পেটোয়া বাহিনীকে বিতাড়িত করা হয় এবং বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে আন্দোলনকারী ছাত্র-শিক্ষকদের ওপর সরকারি বাহিনীর হামলা প্রতিহত করা হয়। দেশের সব রাজনৈতিক জোট ও পেশাজীবী সংগঠন চলমান আন্দোলনে শরিক হয়ে এরশাদের পতন না হওয়া পর্যন্ত লাগাতার হরতাল ডাক দেয়। ১৫ দলীয় ঐক্যজোট, ৫ দলীয় জোট ও ৭ দলীয় জোটের ঐক্যবদ্ধ নির্দেশে লাগাতার আন্দোলনের কর্মসূচি পালিত হতে থাকে। একপর্যায়ে সরকারি কর্মচারীরাও আন্দোলনে শরিক হয়। বিএমএ মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের তত্ত্বাবধানে এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন জোট ও সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে মেডিকেল ডেন্টাল ছাত্র ঐক্য পরিষদের আন্দোলন অব্যাহত থাকে। ৩রা ডিসেম্বর রাতে সামরিক সরকার নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে শেষ চেষ্টা চালায়।
সব সংগঠন ও জোট এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে রাস্তায় নেমে আসে। উপায়ন্তর না দেখে স্বৈরাচারী এরশাদ ৪ঠা ডিসেম্বর রাতে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়। ওই দিন রাতে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কন্ট্রোল রুমে ছিলাম। এরশাদের পদত্যাগের সংবাদে আমরা শত শত মেডিকেল ছাত্র-শিক্ষক বিজয় মিছিল নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে প্রেস ক্লাবের সামনে যাই। আমাদের বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রেস ক্লাব পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
’৯০ এর গণআন্দোলনে ও ডা. মিলন হত্যার প্রতিবাদে দেশের আটটি মেডিকেল ও একটি ডেন্টাল কলেজ ছাত্র সংসদ ও ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের ভূমিকা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ভিপি ফরহাদ আলী খান, জিএস আবেশ কুমার ভট্টাচার্য্য, সমাজ কল্যাণ সম্পাদক আবুল হাসনাত মিল্টন, বহি ক্রীড়া সম্পাদক মশিউর রহমান, বার্ষিক ক্রীড়া সম্পাদক জসিম উদ্দিন, সাহিত্য সম্পাদক ইশতিয়াক মান্নান, সাংস্কৃতিক সম্পাদক হাসান মাহবুব কাজল এবং আন্তক্রীড়া সম্পাদক কামরুল হুদা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
এ ছাড়া ছাত্রসংসদের নির্বাচিত সদস্য রাজশ্রী রায়, আব্দুন নূর তুষার, আরিফুল ইসলাম, বিলকিস ফেরদৌস আরা, সামসুন নাহার ঝুমা, পারভেজ আহমেদ সুমন, মুস্তাফিজুল আজিজ জামি, শেখ মাহফুজুল হক, জিয়া হাসান তুলিন, শৈবাল দাস, ফাওয়াজ হোসেন, এম এ মুহিত প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে।
বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে ছাত্রলীগ সভাপতি একেএম কাউসারুজ্জামান, দেবেশ ভট্টাচার্য্য, জহিরুল করিম, মাহফুজুল্লাহ চিশতী, ছাত্র ইউনিয়নের ইমরান আলম, দেবাশীষ দে দেবু, জাসদ ছাত্রলীগের দিলীপ দাস, আশেকুল ইসলাম হিমু, রাশেদুজ্জামান পাপ্পু, মুনির ইসলাম, ছাত্রদলের কাজী সাইফুদ্দিন বেন্নুর, জাকিউল ইসলাম সুমনসহ আরো অনেকেই ভূমিকা রাখেন। নাতিদীর্ঘ এ আলোচনায় সবার নাম সংকুলান হচ্ছে না, পরবর্তীতে বিস্তারিত লেখার আশা রইল।
বিশেষ করে মিলন হত্যার প্রতিবাদে ঢাকা মেডিকেল কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক কবির উদ্দিন আহমেদ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজশিক্ষক সমিতির মহাসচিব অধ্যাপক কামরুল হাসান খানের ভূমিকা ছিল আমাদের জন্য প্রেরণাদায়ক। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদ ছাড়াও অন্যান্য মেডিকেল যেমন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি কায়সার নসরুল্লাহ খান, প্রোভিপি সামিউল ইসলাম সাদি, জিএস সারোয়ার রোমেল; ময়মনসিংহের ভিপি সালাহউদ্দিন শাহ, জিএস আমিনুল ইসলাম লিটন, বরিশালের ভিপি তারিক মেহেদী পারভেজ, জিএস মুহিতুর রহমান, সম্পাদক মিজানুর রহমান কল্লোল; চিটাগাংয়ের ভিপি নাজমুল ইসলাম মুন্না, জিএস তিতাস মাহমুদ, ছাত্রলীগ সভাপতি হাবিব হাসান শিল্পী; সিলেটের ভিপি সাব্বির খান; রংপুরের ভিপি মামুনুর রহমান, ছাত্রলীগ সভাপতি আবু রায়হান, রাজশাহীর প্রো-ভিপি চিত্তরঞ্জন দাস, জিএস পিনাকী ভট্টাচার্য; ঢাকা ডেন্টাল কলেজের মোশারফ হোসেন মুসাসহ অগণিত ছাত্রনেতা কর্মী আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের সব আন্দোলন সংগ্রামে চিকিৎসক সমাজের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র এবং ছাত্র সংসদের উদ্যোগেই নির্মিত হয়েছিল প্রথম শহীদ মিনার। ঠিক তেমনি এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং ঢামেকসুর প্রাক্তন নেতা ডা. শামসুল আলম খান মিলন নিজের জীবন উৎসর্গ করে উপহার দিয়েছিলেন স্বৈরাচারমুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রা। ১৯৭৫ এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল একের পর এক সামরিক শাসন। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘ পনের বছর পর অবসান হয়েছিল সেই স্বৈরাচারী সামরিক শাসনের। ডা. মিলন বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন এবং যুগ যুগ ধরে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। মিলন দিবসে স্মরণ করি সব মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের সহযোদ্ধাদের, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়েও মিলন ভাই হত্যার প্রতিবাদে রাজপথে আন্দোলনে শরিক হয়েছিলেন এবং ’৯০ এর গণ আন্দোলনকে সফল করেছিলেন। আমি শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করছি বাঙালী জাতির ইতিহাসের অন্যতম এই শ্রেষ্ঠ সন্তানকে যার আত্মত্যাগের কারণেই স্বৈরাচার নিপাত যায়, গণতন্ত্র মুক্তি পায়।
ড. ফরহাদ আলী খান: সাবেক ভিপি, ডামেকসু ১৯৯০-৯১, আহ্বায়ক ৯০ এর গণআন্দোলনকালীন সর্বদলীয় মেডিকেল ও ডেন্টাল ছাত্র ঐক্য পরিষদ।
