বাড়ির পাশে বাস টার্মিনাল এমপির বাধায় কাজ বন্ধ!

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০৩:৪৯ এএম

বাড়ির পাশে বাস টার্মিনাল হলে পরিবেশ ‘নোংরা’ হবে এমন অজুহাত তুলে খুলনার পাইকগাছায় পৌরসভার বাস টার্মিনাল নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. আকতারুজ্জামান বাবুর বিরুদ্ধে।

সরকারিভাবে জায়গা বরাদ্দ হলেও ক্ষমতাসীন দলের এ সাংসদের বাধায় পাইকগাছাবাসীর দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ফসল বাস টার্মিনাল নির্মাণের কাজ থমকে আছে। ফলে প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে খুলনা-পাইকগাছা সড়ক দিয়ে চলাচলকারী হাজারো মানুষকে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে এলাকাবাসী। তবে সাংসদ বাবু বলছেন, টার্মিনাল নির্মাণের জন্য যে জায়গা নির্বাচন করা হয়েছিল সেটি এখন আবাসিক এলাকায় রূপ নিচ্ছে। যে কারণে সেখানে টার্মিনাল নির্মাণের পক্ষে নন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশ স্বাধীনের পর থেকে পাইকগাছায় এ পর্যন্ত নির্মিত হয়নি কোনো বাস টার্মিনাল। ফলে খুলনা-পাইকগাছা সড়কের জিরোপয়েন্ট এলাকায় সড়কের ওপর রাখা হয় সংশ্লিষ্ট রুটে চলাচলকারী বাসগুলো। প্রতিদিন প্রায় সময়ই শতাধিক বাস রাখায় ওই সড়কের আধা কিলোমিটারের একপাশ আটকে থাকে। তখন চলাচল করতে পারে না পথচারী ও ছোট-বড় যানবাহন। সৃষ্টি হয় যানজটের। এ জট ছাড়তে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় হাজারো মানুষকে। আর শুধু জনভোগান্তিই নয়, সেখানে প্রায় প্রতিদিনই ঘটে ছোট-বড় দুর্ঘটনাও। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য উপজেলায় একটি বাস টার্মিনাল নির্মাণের জন্য পাইকগাছাবাসীর আন্দোলন দীর্ঘদিনের। সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে খুলনা জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ২০১৯ সালের ২ মে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পৌরসভার বাস টার্মিনাল নির্মাণের জন্য পৌর এলাকার ৬নং শিববাটি মৌজার বজলুর কাটা নামে জায়গায় ১.৫০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেন। জমি অধিগ্রহণের সময় পাইকগাছার পৌর মেয়র নতুন প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, পৌরসভার সীমানার মধ্যে হওয়ায় পৌরসভা থেকে অধিগ্রহণের টাকা দিয়ে বাস টার্মিনাল করা হবে। পরে তা বাস মালিক সমিতিকে ভাড়া দেওয়া হবে। তাতে কিছু আয় হলে সচ্ছলতা আসবে পৌরসভায়। কিন্তু পৌরসভার তহবিলে যথেষ্ট টাকা না থাকায় অধিগ্রহণে দেরি হয়। এরই মধ্যে ছয় মাস আগে খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান বাবু টার্মিনাল নির্মাণের জন্য নির্ধারিত জায়গা থেকে ২৫০ মিটার দক্ষিণে শিববাটি সেতুর কাছে বিতর্কিত একটি জমি কিনে বাড়ির তৈরির কাজ শুরু করেন। একই সঙ্গে তার বাড়ির পাশে বাস টার্মিনাল হলে এলাকা নোংরা হবে, বাস টার্মিনালে বাসের শ্রমিক-কর্মচারীরাসহ নানা শ্রেণির মানুষ আসবে, বাস আসা-যাওয়ার সময় শব্দ হবে, নিরাপত্তার বিঘœ ঘটবে এমন বিস্তর যুক্তি তুলে ধরে কাজে বাধা সৃষ্টি করেন তিনি। ফলে আটকে যায় পৌরসভার বাস টার্মিনাল নির্মাণের কাজ।

সরেজমিন দেখা গেছে, অধিগ্রহণের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া জায়গাটি বিলের মধ্যে ফাঁকা পড়ে আছে। সেখানে রয়েছে কিছু মাছের ঘের ও একটি মাছের আড়ত। তার পাশেই সাংসদের বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে। সাংসদ নিজের বাড়ি নির্মাণের জন্য বাস টার্মিনালের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ ওই এলাকার সাধারণ মানুষ।

শিববাটি এলাকার বাসিন্দা হাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নের কথা বলে আর এমপি সাহেব সেই উন্নয়নে বিশ্বাস করে না। যদি বিশ্বাসই করতেন তাহলে তিনি উপজেলার হাজারো মানুষকে বিপাকে ফেলে নিজের স্বার্থ দেখতেন না।’

পাইকগাছা উপজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ জাহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যখন এখানে টার্মিনাল নির্মাণের জায়গা নির্ধারণ করা হয়, তখন এমপি সাহেবের জায়গা এখানে ছিল না। ছয় মাস আগে তিনি এখানে জায়গা কিনলেন। এখন বাড়ি তৈরির নামে বাস টার্মিনাল করা বন্ধ করে দিলেন। পরে ইউএনওকে বললে তিনি শিববাটি সেতুর নিচে একটি জায়গার কথা বললেন, কিন্তু তা খুব ছোট ও নদীর পাড়ে, পানি উঠে। তারপর সেখানে গাড়ির নিরাপত্তাও নেই। একটি গাড়ি চুরি হয়ে গেলে কে দেবে?’

একই সংগঠনের সভাপতি শেখ হারুনুর রশীদ হিরু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমপির বাধার কারণে টার্মিনাল আর হলো না। আমরা এমপির সঙ্গে কয়েকবার বসলাম, তিনি বললেন আমার বাড়ির পাশে টার্মিনাল হলে ছেলেরা গাঁজা-মদ খাবে, যেখানে সেখানে লোক পায়খানা-প্রস্রাব করবে। তখন এলাকা নোংরা হবে। এখানে কোনোভাবেই টার্মিনাল করা যাবে না। আর এমপি যে জমিতে বাড়ি বানাচ্ছেন তা অবৈধ জমি। জমিটি পাইকগাছার ব্যবসায়ী এসএম মুজিবুর রহমানের। গন্ডগোলের জমিতে বাড়ি বানিয়ে তিনি এটি বৈধ করে দিলেন। এমপি এখনো জমির টাকা পরিশোধ করেননি বলে জানি। এমপির সুবিধার কারণে উপজেলাবাসী একটি বড় সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলো।’

টার্মিনাল নির্মাণের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারে জানতে চাইলে পাইকগাছা পৌর মেয়র মো. সেলিম জাহাঙ্গীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণের কাজ আটকে গেছে। তাছাড়া এমপি সাহেবও বলছেন পৌরসভার মধ্যে না করার জন্য। এখন আলোচনা করে দেখা যাক কী হয়।’

অন্যদিকে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবিএম খালিদ হোসেন সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পৌরবাসীর সুবিধার কথা বিবেচনা করে ওই স্থানে টার্মিনাল না করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এখন সুবিধামতো জায়গায় টার্মিনাল করা হবে।’

নিজ বাড়ির জন্য বাস টার্মিনাল নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সাংসদ আকতারুজ্জামান বাবু বলেন, ‘শিববাটি সেতুর কাছে আমার বাড়ির পাশে যেখানে জায়গা নির্বাচন করা হয়েছিল, সেটা এখন আবাসিক এলাকা হয়ে গেছে। সেখানে বাস টার্মিনাল করা হলে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোক আসবে। এলাকার পরিবেশ নষ্ট হবে। আর আবাসিক এলাকায় তো বাস টার্মিনাল হতে পারে না। এখন চারা বটতলা নামে একটি জায়গা আছে, সেখানে টার্মিনাল করার চিন্তা করছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত