রাজধানীর হাজারীবাগের চা দোকানি আমিনুল হক। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতির আগে তার কাছে প্লাস্টিকের ওয়ানটাইম কাপ ছিল অনেকটা অচেনা। অথচ এখন তিনি দিনে আড়াইশোর বেশি এ ধরনের কাপে চা বিক্রি করছেন। কথা প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরকে আমিনুল জানান, ভাইরাস আতঙ্কে মানুষ কাচের কাপে চা নিতে চান না। বাধ্য হয়ে প্লাস্টিকের কাপে দিচ্ছেন। প্রত্যেক দিনই এ সংখ্যা বাড়ছে।
আমিনুলের দোকানের অদূরে বেড়িবাঁধ সড়ক। সড়কের দুধারে কামরাঙ্গীরচরের সেকশন পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় উৎপাদিত বর্জ্যরে স্তূপ। এগুলো প্রত্যেক দিন আগুন দিয়ে পোড়ানোর চেষ্টা চলে। এর বাইরে বিভিন্ন দোকান ও রেস্তোরাঁ থেকে প্লাস্টিক পণ্য উন্মুক্ত স্থানে ফেলা হয়, যার সিংহভাগ বর্জ্যরে স্থান সিটি করপোরেশনের উন্মুক্ত ড্রেন।
পরিবেশবিদরা বলছেন, করোনা পরিস্থিতিতে দেশে প্রচুর পরিমাণে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব প্লাস্টিকের কণা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের পেটে গিয়ে ক্যানসারের মতো বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। সপ্তাহে একজন মানুষ নানাভাবে ৫ গ্রামের বেশি প্লাস্টিক খেতে বাধ্য হচ্ছেন। একই সঙ্গে সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব প্লাস্টিক বর্জ্য।
দেশে মার্চের শুরুতে করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর দ্রুত প্লাস্টিক ও পলিথিন জাতীয় পণ্যের ব্যবহার বেড়ে যায়। ফলে উৎপাদনও বৃদ্ধি পায়। বেসরকারি এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অরগানাইজেশন (এসডো) মে মাসে এক জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তাতে বলা হয় করোনা শুরুর পরবর্তী এক মাসে ১৪ হাজার ১৬৫ টন একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৭৬ টন উৎপন্ন হয় ঢাকা শহরে।
করোনা থেকে সুরক্ষায় বাসাবাড়ি ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিকের তৈরি সার্জিক্যাল ফেস মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস ও পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার বেড়ে যায়। শুধু এসডোর ওই হিসাব ধরলেও নভেম্বর পর্যন্ত গত আট মাসে দেশে একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৩২০ টন। বাস্তবে এর চেয়েও বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। অথচ এসডোর হিসাবে গত বছর এ বর্জ্যরে পরিমাণ ছিল মাত্র ৮৬ হাজার ৭০৭ টন।
ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফান্ড (ডব্লিউডব্লিউএফ) ইন্টারন্যাশনালের গত বছরের এক গবেষণায় দেখানো হয়, পৃথিবীতে প্লাস্টিকসংক্রান্ত দূষণ মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রতি সপ্তাহে এক ব্যক্তি ৫ গ্রাম বা একটি এটিএম কার্ডের সমপরিমাণ প্লাস্টিক কণা খেতে বাধ্য হচ্ছেন। খাবার পানি, সামুদ্রিক মাছ ও ব্যবহার্য প্লাস্টিকের মাধ্যমে এ পরিমাণ প্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে ৩৮১ মিলিয়ন মেট্রিক টনের বেশি প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়। এসব বর্জ্যরে মধ্যে পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ৫৭, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় ৪৫ ও উত্তর আমেরিকায় ৩৫ মিলিয়ন টন উৎপন্ন হয়। এ বর্জ্যরে ৫০ শতাংশই একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক থেকে।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা দেশ রূপান্তরকে জানান, করোনায় আমাদের দেশে ওয়ানটাইম প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। প্লাস্টিক পণ্যের ক্ষতিকর দিক হলো এর মধ্যে গরম কিছু দিলে, তাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা মিশে শরীরে প্রবেশ করে, যা থেকে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। বারবার ব্যবহৃত প্লাস্টিক পণ্য থেকেও মানুষ প্লাস্টিক খাচ্ছে। করোনা থেকে রক্ষায় আমরা হ্যান্ড গ্লাভস, মাস্ক ব্যবহার করে ফেলে দিচ্ছি। এগুলো মাটি, পানি, বায়ুতে দীর্ঘদিন থেকে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ করছে বলে জানান তিনি।
এসডো বলছে, দেশে যে প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, তার ৯০ ভাগের সঠিক ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না। এর ফলে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জলবায়ু অর্থায়নে সুশাসন প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি ব্যবস্থাপক জাকির হোসেন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্লাস্টিক ও পলিথিনে বাস্তুসংস্থান নষ্ট হচ্ছে। মাটি থেকে পানি, পানি থেকে জলজ প্রাণী এবং সেখান থেকে মানবদেহে প্রবেশ করছে প্লাস্টিক।’ অবশ্য তিনি বলেন, ‘প্লাস্টিক মানবদেহে কী ক্ষতি করে তা নিয়ে এখনো বিস্তারিত গবেষণা হয়নি। তবে এটি ক্যানসার সৃষ্টির বড় কারণ বলে মনে করা হয়।’
ক্ষতিকর প্লাস্টিকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত আইনি কাঠামো হলো বাসেল কনভেনশন। এতে প্লাস্টিক পণ্যের মতো রাসায়নিকভাবে ক্ষতিকর পণ্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে আমদানি-রপ্তানি নিষিদ্ধ। বাংলাদেশ বিষয়টি সমর্থন করলেও সংসদে এ পর্যন্ত অনুসমর্থন হয়নি। বাংলাদেশ সরকার পলিথিন নিষিদ্ধে আইন করলেও প্লাস্টিক বিষয়ে তাতে কিছু বলা নেই। তবে ২০১৫-১৮ আমদানি নীতিমালা অনুযায়ী, যেকোনো প্রকার বর্জ্য আমদানি নিষিদ্ধ। অবশ্য অসাধু চক্র প্লাস্টিক তৈরির অনেক কাঁচামাল বিভিন্ন কায়দায় আমদানি করে আসছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানী ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিঝুম দ্বীপে সমুদ্রের তলদেশের ছবিতে পলিথিন ও প্লাস্টিকের স্তূপ দেখা যায়। এগুলো দীর্ঘদিন পানিতে থাকায় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়ে মাছের পেটে যাচ্ছে। মাছ থেকে মানুষের পেটে আসছে। করোনায় নিঃসন্দেহে এ সংকট আরও তীব্র হয়েছে। কারণ মানুষ আগের চেয়ে প্লাস্টিকের তৈরি ওয়ানটাইমসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।’
