আত্মহত্যা থেকে আন্দোলনে ভারতের কৃষক সমাজ

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২০, ১২:১৯ এএম

এতদিন ভারতের কৃষকরা আলোচনায় আসতেন অভাবের তাড়নায়, মহাজনী ঋণের চাপে কিংবা বিক্ষুব্ধ হয়ে আত্মহত্যার কারণে। ভারত পরিচিত হয়ে উঠেছিলসবচেয়ে বেশি আত্মহত্যাকারী কৃষকের দেশ হিসেবে। সে দেশের লাখ লাখ কৃষক এখন দিল্লিতে। এত দীর্ঘস্থায়ী কৃষক আন্দোলন এর আগে ভারতে তো বটেই বিশ্বের কোথাও হয়েছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। লাখ লাখ কৃষক ট্রাক্টর ভর্তি করে রসদ আর মানুষ নিয়ে দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থান করছেন দিনের পর দিন। দিল্লি অনেক দূর হলেও সমস্ত ধরনের কষ্ট, প্রতিকূলতা, পুলিশি আক্রমণ, লাঠিপেটা, জলকামান, মামলা, হামলা উপেক্ষা করে প্রয়োজনে ৬ মাস অবস্থান করার প্রস্তুতি নিয়ে কৃষকরা এসেছেন। তারা এসেছেন পাঞ্জাব, হরিয়ানাসহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে। গত ২৬ নভেম্বর থেকে কৃষকরা অবরোধ করে রেখেছেন দিল্লির প্রবেশ পথ।

গত সেপ্টেম্বরে ভারতের কৃষি খাত সংস্কারের লক্ষ্যে তিনটি কৃষি আইন পাস হয়। মোদি সরকার বলছে, নতুন আইনের মাধ্যমের মধ্যস্বত্বভোগীদের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাবে কৃষকরা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্নভাবে বঞ্চিত কৃষকরা মনে করছেন নতুন এই আইনের ফলে তাদের লাভের চেয়ে ক্ষতিই হবে বেশি। এই আইনের প্রয়োগ হলে করপোরেট হাউজ এবং বড় প্রতিষ্ঠানগুলোই লাভবান হবে এমন আশঙ্কা থেকেই ন্যায়সংগত দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছেন তারা। এর ফলে শুরু হয়েছে সাম্প্রতিককালের মধ্যে সবচেয়ে বড় কৃষক বিদ্রোহ। দিল্লিতে প্রবেশের আগেই শহরের সীমান্তে পুলিশি বাধার মুখে পড়েছিলেন তারা। কিন্তু তাদের থামানো যায়নি। লাখ লাখ কৃষক রাজপথে অবস্থান নিয়ে দিল্লির সঙ্গে পাঞ্জাব ও হারিয়ানার সংযোগ সড়ক অচল করে রেখেছেন। নতুন এ আইনে কৃষিপণ্য বিক্রি, গুদামজাতকরণ ও মূল্য নির্ধারণ নীতিতে পরিবর্তন এসেছে। নতুন আইনে ব্যবসায়ীদের পণ্য মজুদের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মহামারীর সময় ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে পণ্য মজুদ করে লাভবান হবেন ব্যবসায়ীরাই। ইতিপূর্বে ভারতের কৃষি আইনে পণ্য মজুদ করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতো।

নতুন আইনের ব্যাপারে কৃষকদের অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো এ আইনের মাধ্যমে তাদের রক্ষাকবচ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ভারতের মোট কৃষিজমির ৮৬ শতাংশই ক্ষুদ্র কৃষকদের। গড়ে তাদের জমির পরিমাণ ২ হেক্টরেরও কম। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দরদাম করে ন্যায্যমূল্য পাবেন না তারা এমনটাই আশঙ্কা তাদের। পাঞ্জাবের কৃষকদের প্রতিনিধিরা বলেছেন, সরকার বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আমাদের জিম্মি করে রেখে করুণার পাত্র বানাতে চাইছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দরদাম করে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবে এ চিন্তা একেবারেই অমূলক।

বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যবসা করার অন্যান্য সমস্যা তো আছেই। সার ও বীজের মতো কৃষিপণ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রি করায় প্রতি বছর বর্ধিত দাম পরিশোধ করতে হয় কৃষকদের। ফলে ঋণ করা ছাড়া উপায় থাকে না। মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিলে প্রায় ২৫ শতাংশ সুদ দিতে হয়। যার চাপ সহ্য করতে না পেরে ভারতে কৃষকদের একটা অংশ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়।

ভারতে গত বছর ৪২ হাজার ৮৪৪ জন কৃষক ও দিনমজুর আত্মহত্যা করেছেন। সম্প্রতি দেশটির ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এমন ভয়াবহ পরিসংখ্যানই উঠে এসেছে। এনসিআরবির তথ্যমতে, ২০১৯ সালে ভারতে মোট ১০ হাজার ২৮১ জন কৃষক ও ৩২ হাজার ৫৬৩ জন দিনমজুর আত্মহত্যা করেছেন। এ সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে ৬ শতাংশ বেশি। ২০১৮ সালে দেশটিতে ১০ হাজার ৩৫৭ জন কৃষক ও ৩০ হাজার ১৩২ জন দিনমজুর আত্মহত্যা করেছিলেন। ভারতের অপরাধ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০ বছরে প্রায় ৩ লাখ কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। কৃষিতে লোকসান, অনিশ্চয়তা,

প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসহায় হয়ে পড়া, ঋণের বোঝা, মহাজনদের চাপ কৃষকদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়। কৃষক ও দিনমজুর আত্মহত্যার নিরিখে শীর্ষ রয়েছে মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানা। বর্তমান আইন সে সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কায় আছেন কৃষক সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

কৃষি ভারতীয় সংবিধানের যৌথ তালিকায় থাকলেও কৃষি ও কৃষকের অধিকার সম্পর্কিত ক্ষেত্রে রাজ্যের অধিকার ছিল প্রশ্নাতীত। নতুন সংস্কারের ফলে সেই অধিকার একচেটিয়াভাবে চলে যাবে কেন্দ্রের হাতে। নতুন আইনে কৃষিবাজারের (ভারতে যাকে বলে ‘মান্ডি’) ওপর রাজ্যের একচেটিয়া অধিকার আর থাকবে না। কৃষকদের মতো বেসরকারি বহুজাতিক সংস্থাও তাদের পছন্দমতো ‘মান্ডি’ তৈরি করতে পারবে। বহুজাতিক কোম্পানি চুক্তিভিত্তিক চাষ করতে ‘কন্টাক্ট গ্রোয়ারস’ প্রথা চালু করতে পারবে। এর ফলে কৃষক উৎপাদন ও বিক্রির ক্ষেত্রে বহুজাতিক কোম্পানি বা বড় দেশীয় কোম্পানির কাছে বাঁধা পড়ে থাকবে। এরচেয়েও বড় কথা কৃষক বাজারের কাছে অসহায় হয়ে পড়বে কারণ কোন দামে চাষি তার পণ্য বেচবেন, তা রাজ্য সরকার নয় বাজারই ঠিক করে দেবে। কৃষক বিক্ষোভের বড় কারণগুলোর মধ্যে এটা অন্যতম।

তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ ন্যূনতম সহায়ক মূল্য বা মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস (এমএসপি) নিয়ে। ভারতের কৃষিব্যবস্থায় এমএসপি প্রথা চালু রয়েছে বহু দশক ধরে। পণ্য বিক্রিতে আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে চাষিকে বাঁচিয়ে ন্যায্যমূল্য দিতে সরকার প্রতি বছর বিভিন্ন ফসলের এমএসপি ঠিক করে দেয়। এটাই ছিল ভারতের কৃষকদের অন্যতম প্রধান সুরক্ষা। সরকার নির্ধারিত দামের নিচে ফসল কিনতে পারত না, ফলে এই ব্যবস্থা চাষির কাছে ছিল একটা বড় নিরাপত্তাও। নতুন আইনে কিন্তু এই প্রথা বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রী আন্দোলনের মুখে বলছেন যে, এমএসপি ছিল, আছে ও থাকবে। কিন্তু নতুন আইনে তার কোনো স্বীকৃতি রাখা হয়নি। কৃষক সংগঠন ও বিরোধীরা চাইছেন, এমএসপি প্রথাকে নতুন আইনের আওতায় এনে সবার জন্য বাধ্যতামূলক করতে, যাতে বেসরকারি দেশি ও বহুজাতিক সংস্থা কম দামে ফসল বিক্রিতে কৃষককে বাধ্য করাতে না পারে। সংস্কার আরও একটি বিষয় অনিশ্চিত করে দিয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আইনের আওতা থেকে বাদ দিয়েছে চাল, ডাল,  তেলবীজ, পেঁয়াজ ও আলুকে। এই পাঁচ পণ্যের উৎপাদন ও মজুদের ওপর কেন্দ্র বা রাজ্য কোনো সরকারেরই আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। আলু ও পেঁয়াজের মতো পচনশীল পণ্যের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ও অন্য পণ্যের দাম ১০০ শতাংশ বাড়লে একমাত্র তবেই রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করতে পারবে। নচেৎ বাজারই সর্বেসর্বা। এর ফলে ভয়ংকর বিপদের আশঙ্কা করছেন খোদ কৃষকরাও। কারণ কৃষক তো মজুদ করে না, কৃষকের হাত থেকে পণ্য মজুদদারের হাতে যাওয়ার পর বেশি দামে সেই পণ্য তো কৃষককেও কিনতে হবে।

এই আইন সংসদে সহজেই পাস করা যায়নি। রাজ্যসভায় ‘ধ্বনি ভোটে’ পাস করা নিয়ে প্রচণ্ড বিরোধিতা ও তুলকালাম হলে আট বিরোধী সদস্যকে পুরো অধিবেশনের জন্য বহিষ্কার করা হয়। প্রতিবাদে সব বিরোধী দল রাজ্যসভা বর্জন করে সংসদ ভবন চত্বরে ধরনায় বসেন। বিরোধী দলবিহীন রাজ্যসভায় বিনা বাধা ও আলোচনায় কৃষি সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে পাস করিয়ে নেয় শ্রম আইন সংস্কার বিল। এর ফলে ৩০০ কর্মী কাজ করেন, এমন শিল্পের মালিক সরকারের অনুমতি ছাড়াই কর্মী নিয়োগ ও ছাঁটাই করতে পারবেন। একই সঙ্গে কৃষক ও শ্রমিকের ওপর আঘাত নামিয়ে এনেছে মোদি সরকার। মোদি ও বিরোধীরা তাই মুখোমুখি। মোদি যে সংস্কারকে ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ বলেছেন, বিরোধীদের কাছে তা ‘গণতন্ত্রের কৃষ্ণপক্ষ’ ও ‘কৃষকদের মৃত্যু পরোয়ানা’। বিরোধীরা বলছেন, স্বাধীন কৃষকরা এখন হতে চলেছেন বেসরকারি পুঁজির হাতের পুতুল ও ক্রীতদাস। এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য আরও বাড়বে। কৃষকদের  আশঙ্কা, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য না থাকায় কৃষক শোষণ তীব্র হবে। এর বিপদের গুরুত্ব বুঝতে পেরে বিজেপি সমর্থিত ভারতীয় কিষাণ সংঘ ও স্বদেশি জাগরণ মঞ্চও এই সংস্কার করার দাবি জানিয়েছে।

ভারতের ২ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির প্রায় ১৫ শতাংশই কৃষির ওপর নির্ভরশীল; দেশটির ১৩০ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে ৫০ কোটি প্রত্যক্ষভাবে এবং ৮৫ কোটিরও বেশি মানুষ পরোক্ষভাবে এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কৃষকদের আশঙ্কা, নতুন এ কৃষি সংস্কার আইনগুলো ভারতের নিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থাকে ভেঙে দেবে এবং সরকারও ধীরে ধীরে নির্ধারিত মূল্যে গম ও ধান কেনা বন্ধ করে দেবে; যার ফলে তাদের ফসল বেচতে বেসরকারি ক্রেতাদের সঙ্গে দরকষাকষিতে নামতে হবে। আইনগুলো এভাবে জীবন-জীবিকাকে অনিশ্চিত অবস্থার দিকে ঠেলে দেবে দাবি করে ভারতের কৃষকরা আইনগুলো বাতিল, ফসল কিনতে সরকারের বাধ্যবাধকতা বহাল রাখাসহ আরও বেশ কিছু দাবি নিয়ে মরিয়া হয়ে এই বিদ্রোহ করছেন দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থান নিয়েছেন।

ভারত এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামরিক বড় শক্তি। বিশ্বের বড় ধনীদের তালিকায় ভারতের পুঁজিপতিদের নাম আছে, বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি, চতুর্থ বৃহৎ সামরিক শক্তি তাদের। কিন্তু ভারতের কৃষক আন্দোলন এই সত্য আবারও দৃশ্যমান করল যে পুঁজিবাদী আকাশচুম্বী উন্নয়নের ঢাকের আওয়াজ শ্রমিক কৃষকের কান্না চাপা দিতে পারে না। কিন্তু নীরব কান্না রাষ্ট্র ও সরকার শোনে না। ফলে নীরবে আত্মহত্যা নয় সরব ও সংগঠিত প্রতিবাদের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত