নকশাবহির্ভূত স্থাপনা তৈরি করে দোকান বরাদ্দের মাধ্যমে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম (সিএমএম) আদালতে অভিযোগটি করেন রাজধানীর ফুলবাড়িয়া সিটি মার্কেট ২, ব্লক-এ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলু। বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে ঢাকা মহানগর হাকিম আশেক ইমাম এ বিষয়ে আদেশের জন্য আজ বুধবার দিন ধার্য করেন। আবেদনে আরও যে ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা হলেন ডিএসসিসির সাবেক প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ইউসুফ আলী সরদার, সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী মাজেদ, কামরুল হাসান, হেলেনা আক্তার, আতিকুর রহমান ও ওয়ালিদ। তবে সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের দাবি, বর্তমান মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসের ইন্ধনে এ মামলা হয়েছে।
মামলার আরজিতে বাদী অভিযোগ করেন, ডিএসসিসির সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনসহ অন্য আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ফুলবাড়িয়া সিটি সুপার মার্কেটে নকশাবহির্ভূত স্থাপনা তৈরি করে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা দেন। পরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ডিএসসিসিতে যোগাযোগ করলে তৎকালীন মেয়র (সাঈদ খোকন) অন্য আসামিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দোকান বরাদ্দ নেওয়ার কথা বলেন। এরপর ব্যবসায়ীরা আসামি কামরুল হাসান, হেলেনা আক্তার ও আতিকুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সাঈদ খোকনসহ অন্য আসামিরা রাজধানীর ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২-এর এ-ব্লকে নির্মিত নকশাবহির্ভূত স্থাপনাগুলো বৈধতা দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন সময় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৩৪ কোটি ৮৯ লাখ ৭০ হাজার ৫৭৫ টাকা নিয়েছেন কিন্তু কোনো দলিলাদি দেননি। পরে তাদের সেসব দোকান থেকে উচ্ছেদ করা হলেও ব্যবসায়ীরা টাকা ফেরত পাননি। আর্জিতে সাতজনের বিরুদ্ধে দ-বিধির অর্থ আত্মসাৎ ও অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গসহ কয়েকটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাঈদ খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেলুকে দিয়ে তাপস (বর্তমান মেয়র) এসব নোংরামি করাচ্ছে। এতে সে নিজের ও দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে।’ সাবেক মেয়র সাঈদ খোকনের এ ধরনের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানতে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে মেয়র তাপসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে এর আগে তিনি গণমাধ্যমে এসব অবৈধ দোকানের পেছনে বিপুল অর্থ বাণিজ্যের ইঙ্গিত দিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন।
কর্মকর্তারা জানান, ডিএসসিসির খাতায় থাকা ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২-এর ব্লক-এ, বি, সি নামের তিনটি মার্কেটে তিলধারণের জায়গা ফাঁকা নেই। ফুটপাত, মার্কেটের গলি, সিঁড়ির স্থান, লিফটের জায়গা, পার্কিং স্পেস, মার্কেটের পেছনের অংশ, এমনকি বাথরুমের জায়গাও ভেঙে দোকান বসানো হয়েছে। ১৯৯৭ সালে ফুলবাড়িয়া মিউনিসিপ্যাল সুপার মার্কেটের ‘এ’ ব্লকে বেজমেন্টে ব্যবসায়ী সমিতির ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যদের মাঝে ১৭৬ জনকে টোলের বিনিময়ে অস্থায়ীভাবে ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়া হয়। একই বছরে বেজমেন্টের ‘বি’ ব্লকে ১৭৬ ও ‘সি’ ব্লকে ১৭৬ জনকে অস্থায়ী ব্যবসা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। মার্কেটের ‘এ’ ব্লকের নিচতলায় ১৯৯৪ ও ২০০৬ সালে মোট ৯৮ জনকে, মার্কেটের ‘বি’ ব্লকে ১১৭ জনকে ও ‘সি’ ব্লকে ১৭২টি দোকান সালামির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০০৬ সালে মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় ‘এ’ ব্লকে ১৫৭টি, ‘বি’ ব্লকে ১৭৮টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মার্কেটের তৃতীয় তলায় ‘এ’ ব্লকে ১৫৭টি ও ‘বি’ ব্লকে ১৭৮টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ মার্কেটের চতুর্থ তলায় ‘এ’ ব্লকে ১০০টি দোকান ২০০৬ সালে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দবিহীন রয়েছে ‘এ’ ব্লকের পঞ্চম তলায় ১০০টি, ‘বি’ ব্লকের চতুর্থ তলায় ১০০টি, পঞ্চম তলায় ৯৯টি, ‘সি’ ব্লকের দ্বিতীয় তলায় ৯৪টি, তৃতীয় তলায় ৯৪টি, চতুর্থ তলায় ৯৪টি দোকান। এর মধ্যে সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় রয়েছে ২৮২টি দোকান, যা করপোরেশন নির্মাণ করেছে। মোট ২ হাজার ৫৪৮টি দোকান রয়েছে। এগুলো বর্তমানে ভাড়া ও বিক্রিসহ সব নিয়ন্ত্রণ মার্কেট সমিতির কাছে থাকলেও মেয়র তাপস দায়িত্ব নেওয়ার পর দৃশ্যপট বদলে যায়। তিনি মার্কেটের সামনে ও বিভিন্ন তলায় থাকা অবৈধ দোকান উচ্ছেদে জোর তৎপরতা শুরু করে। এ উচ্ছেদ কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর বর্তমান মেয়র তাপস ও সাবেক মেয়র খোকন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে গতকাল মার্কেটটির সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দেলু সাবেক মেয়র খোকনের নামে আদালতে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এনে মামলার আবেদনের পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
