আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ছোট ভাই স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আবদুল কাদেরের সাম্প্রতিক এক বক্তব্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।। এই নিয়ে দলের নানা স্তরে ফিসফাস কানাকানি চললেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা এখনো কিছু বলছেন না। তারা দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে আছেন। এ ব্যাপারে শেখ হাসিনা মুখ খুললে অথবা কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তারপরই কেন্দ্রীয় নেতারা বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন। তবে মির্জা কাদের দায়িত্বে থেকে দায়িত্বহীন বক্তব্য প্রকৃতপক্ষে দিয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানান দলের সভাপতিমন্ডলীর তিন সদস্য।
এদিকে মির্জা আবদুল কাদের গতকাল এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেন তার এ বক্তব্য খ-িতভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, বক্তব্য নিয়ে একটি কুচক্রীমহল নানা ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। নির্বাচন নিয়ে নানা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে মানুষের মাঝে। বিবৃতিতে তিনি আরও দাবি করেন, ‘শুধু বৃহত্তম নোয়াখালীর আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে নানা অনিয়মের কথা বলেছিলাম। জাতীয় ইস্যুতে আমি কোনো বক্তব্য রাখিনি।’
সম্প্রতি মির্জা কাদের নোয়াখালীর বসুরহাটে এক সমাবেশে দলের বিভিন্ন নেতার সমালোচনা করে, ভোটের সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। বিভিন্ন গণমাধ্যম এ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে।
মির্জা কাদের দলের সাধারণ সম্পাদকের ভাই হওয়ায় কেন্দ্রীয় নেতারা ইস্যুটি নিয়ে আগ বাড়িয়ে কথা বলতে রাজি নন। তবে সভাপতিমন্ডলী ও সম্পাদকমন্ডলীর একাধিক সদস্য দাবি করেন, মির্জা কাদেরের এ বক্তব্য দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করেছে। সরকারবিরোধী মহলে আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করার ইস্যু তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে আরেকটি অংশ দাবি করেন, মির্জা কাদের তার বক্তব্যে বলেন শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। আমাদের কিছু নেতার আচার-আচরণে দলের জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে একমত প্রকাশ করে ওইসব নেতা বলেন, বক্তব্যের একটি অংশে সত্য বলেছেন মির্জা কাদের।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে এ প্রসঙ্গে বলেন, মির্জা কাদেরের এ বক্তব্য ব্যক্তিগত। কারও ওপর রাগ-ক্ষোভ থেকে বলে থাকতে পারেন তিনি। তবে হানিফ বলেন, দায়িত্বশীল জায়গা থেকে যে কারও কথা বলার সময় সতর্ক থাকা উচিত।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ বলেন, মির্জা কাদেরের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করা হবে। কোন পরিপ্রেক্ষিতে কীভাবে বক্তব্য রেখেছেন তার ওপর নির্ভর করবে অনেক কিছু। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের এক সাংগঠনিক সম্পাদক দেশ রূপান্তরকে বলেন, মির্জা আবদুল কাদের অনেক কথা সত্য বলেছেন। দলের সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য বলেন, মির্জা কাদেরের বক্তব্য পাগলের প্রলাপ।
এ প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপচারিতায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অনেক নেতা বলেন, দায়িত্বহীন বক্তব্য দেওয়ার জন্য নিশ্চয়ই যাচাই-বাছাইয়ের পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মির্জা আবদুল কাদেরের বক্তব্য প্রসঙ্গে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খায়রুল আনাম সেলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মির্জা কাদের আমাদের বলেছেন উনি এই বক্তব্য দেননি। তিনি বৃহত্তর নোয়াখালীর দুই এমপির বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে কথা বলেছেন। ওই দুজন হলেন একরামুল করিম চৌধুরী ও নিজাম উদ্দীন হাজারী। ব্যক্তিগত অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলতেই পারেন মির্জা কাদের।’
তৃণমূল থেকে রাজনীতি করে আসা আবদুল কাদের মির্জা শুধু আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের নেতা নন, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের আপন ছোট ভাই। ৩১ ডিসেম্বর বসুরহাট পৌরভবন চত্বরে নির্বাচনের ইশতেহার ঘোষণাকালে তিনি বলেছেন, ‘বৃহত্তর নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগের কিছু কিছু চামচা নেতা আছেন, যারা বলেন অমুক নেতা, তমুক নেতার নেতৃত্বে বিএনপির দুর্গ ভেঙেছে। সুষ্ঠ নির্বাচন হলে বৃহত্তর নোয়াখালীতে তিন-চারটা আসন ছাড়া বাকি আসনে আমাদের এমপিরা দরজা খুঁজে পাবে না পালানোর জন্য। এটাই হলো সত্য কথা। সত্য কথা বলতে হবে। আমি সাহস করে সত্য কথা বলছি।’
আবদুল কাদের মির্জার এ বক্তব্যের ভিডিও ফেইসবুক ও ইউটিউবে ভাইরাল হয়েছে। সেখানে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় দলীয় কিছু নেতাকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, ‘নোয়াখালীর মানুষজন বলে, শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এটা সত্য। কিন্তু আপনাদের (নোয়াখালীর আওয়ামী লীগ নেতা) জনপ্রিয়তা বাড়েনি। আপনারা প্রতিদিন ভোট কমান। টাকা দিয়ে বড় জনসভা করা, মিছিল করা কোনো ব্যাপার নয়। টাকা দিলে, গাড়ি দিলে আমিও অনেক লোক জড়ো করতে পারব। না হয় রাজনীতি থেকে বিদায় নেব।’
১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচনে আবদুল কাদের মির্জা নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট পৌরসভার মেয়র পদে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন।
নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সহসভাপতি আবদুল কাদের মির্জা তার বক্তৃতায় আরও বলেন, ‘নোয়াখালীর রাজনীতি অতি কষ্টের। এই বৃহত্তর নোয়াখালীতে আমাদের নেতা ওবায়দুল কাদের, মওদুদ সাহেব (বিএনপির মওদুদ আহমদ), আবু নাছের সাহেব (জামায়াতের) এ তিনজন ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ, তাদের সমমর্যাদার কেউ নেই। কোনো নেতা সৃষ্টি হয়নি। এখন তো ওবায়দুল কাদের, মওদুদ আহমদের নাম বিক্রি করি। তারা তিনজন তো অসুস্থ, তারা মারা গেলে কার নাম বিক্রি করবেন, কেউ নাই।’
কারও নাম উল্লেখ না করে আবদুল কাদের বলেন, ‘প্রকাশ্য দিবালোকে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা করেন, তারা হচ্ছেন নেতা। টেন্ডারবাজি করে কোটি কোটি টাকা লুটপাট যারা করেন, তারা হচ্ছেন নেতা। পুলিশের, প্রাথমিক শিক্ষকের চাকরি দিয়ে যারা পাঁচ লাখ টাকা নেন, তারা হচ্ছেন নেতা। গরিব পিয়নের চাকরি দিয়ে তিন লাখ টাকা যারা নেন, তারা হচ্ছেন নেতা।’
জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটির সমালোচনা করে আবদুল কাদেরকে ভাইরাল হওয়া বক্তৃতায় বলতে শোনা যায়, ‘সাবেক সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদের ছোট ভাই জাবেদ (মিনহাজ আহমেদ জাবেদ)। তার সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনো কোনো নেতা তখন (এক-এগারোর সময়কালে) নিজেদের রক্ষা করেছেন। এখন সেই জাবেদ এবং হাওয়া ভবনের মানিক (আতাউর রহমান ভূঁইয়া ওরফে মানিক) আজ জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। অথচ কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাহাবউদ্দিনের মতো ত্যাগী ও নির্যাতিত ব্যক্তিকে করা হয়েছে উপদেষ্টা। এটা হলো আমাদের কমিটি।’
