সংসদ সদস্যপদ খারিজ হতে ‘এই দন্ডই যথেষ্ট’

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২১, ০২:৩৪ এএম

অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগে কুয়েতের একটি আদালত চার বছরের কারাদন্ড দিয়েছে জাতীয় সংসদের লক্ষ্মীপুর-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলকে। একজন আইন প্রণেতা হিসেবে দন্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় তার সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকবে কি নাএমন সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সংবিধান, আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দন্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় তিনি আর সংসদ সদস্য  হিসেবে বিবেচিত হবেন না। কেননা সংসদ সদস্য হিসেবে অযোগ্যতা নিয়ে  সংবিধানে যেসব বিধান রয়েছে সেগুলো এবং মামলার আইনি মোকাবিলা করতে হলেও অনেক যদি কিন্তুর ওপর নির্ভর করতে হবে। আর যেহেতু তিনি বিদেশের আদালতে দন্ডিত এবং বন্দি এখন তাকে সেখানেই আইনি মোকাবিলা করে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হবে এবং এটি হলেও সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্ন থেকে যাবে।

গতকাল বৃহস্পতিবার কুয়েতের ফৌজদারি আদালতের বিচারক আবদুল্লাহ আল ওসমান এ রায় ঘোষণা করেন। বিদেশে বাংলাদেশের কোনো আইনপ্রণেতার  এভাবে দন্ডিত হওয়ার ঘটনা এই প্রথম। আদালতের রায়ে পাপুলের কাজে সহায়তাকারী হিসেবে কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মাজেন আল জারাহ এবং কুয়েতি দুই কর্মকর্তাকেও চার বছর করে কারাদন্ড এবং পাপুলসহ দন্ডিতদের প্রত্যেককে ১৯ লাখ কুয়েতি দিনার অর্থদন্ড দেওয়া হয়েছে ওই রায়ে। অর্থ ও মানব পাচারের অভিযোগের মামলায় কুয়েতের কারাগারে বন্দি পাপুল বেশ কয়েক বছর আগে সাধারণ একজন শ্রমিক হিসেবে কুয়েত গিয়ে অর্থবিত্তের সাম্রাজ্য গড়েন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর স্ত্রী সেলিনা  ইসলামকেও সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য করিয়ে আনেন তিনি। মানব পাচার, ভিসা জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পাপুলকে গত বছরের ৭ জুন গ্রেপ্তার করে কুয়েতের পুলিশ। তদন্তের পর সেখানকার একটি ব্যাংকে জমাকৃত পাপুল এবং তার কোম্পানির প্রায় ৫০ লাখ কুয়েতি দিনার (প্রায় ১৪০ কোটি টাকা) ফ্রিজ করে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গ্রেপ্তারের পর কুয়েতের পাবলিক প্রসিকিউশন তদন্ত করে পাপুলসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে অর্থ ও মানব পাচার, ঘুষ লেনদেন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভঙ্গের অভিযোগ আনে। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পাপুল ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। এরপর বিচার শেষে ২৮ সেপ্টেম্বর মামলার রায় ঘোষণার জন্য ২৮ জানুয়ারি (গতকাল) তারিখ ধার্য করে স্থানীয় আদালত।

এদিকে পাপুলের সংসদ সদস্য পদে থাকা নিয়ে সংবিধান, আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তিনি (পাপুল) এখন একজন দন্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তাই সংসদ সদস্য হিসেবে তার থাকার কথা নয়। তবে, তিনি আপিল করেছেন কি না এবং স্থগিত হয়েছে কি না সেটি দেখতে হবে। যদি আপিলে ওই দন্ডাদেশটি স্থগিত হয়ে যায়, তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন, অন্যথায় নয়। তবে সেখানেও আইনি এবং সাংবিধানিক প্রশ্ন থেকে যায়। আর বিদেশে যে আদালত তাকে দন্ড দিয়েছে এখন সেই আদালতেই তাকে আপিল করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সংবিধানে বলা আছে দুই বছরের বেশি সাজা হলে কেউ সংসদ সদস্য হিসেবে থাকতে পারবেন না। যদিও সংবিধানে এটা বলা নেই যে, বিদেশে দন্ডপ্রাপ্ত হলে কী হবে? কিন্তু বলা না থাকলেও বিদেশে তিনি দন্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন, এটিকেই ধরে নিতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো বিদেশে সাজাপ্রাপ্ত হলে তো তাকে বিদেশেই আপিল করতে হবে। দেশের আদালতে তো আপিলের সুযোগ নেই। সে হিসেবে তার সংসদ সদস্য পদে থাকার প্রশ্নই আসে না।’  

বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর অন্যূন দুই বছরের বেশি কারাদন্ডে দন্ডিত হলে এবং তার মুক্তি লাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন না। এছাড়া কোনো উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করলে, দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় হতে অব্যাহতি লাভ না করলে তিনি সংসদ সদস্য হতে পারেন না। সংবিধানের ৬৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ হতে নব্বই দিনের মধ্যে যদি কোনো সংসদ সদস্য নির্ধারিত শপথ গ্রহণ না করেন, সংসদের  অনুমতি না নিয়ে তিনি সংসদের নব্বই কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকেন, তাহলে তিনি সংসদ সদস্যপদে অযোগ্য হবেন।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংবিধানের ৬৬ ও ৬৭ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্যতার কথা বলা আছে। দেশে কিংবা দেশের বাইরে হোক নৈতিক স্খলনজনিত কারণে ফৌজদারি অপরাধে তিনি (পাপুল) দুই বছরের বেশি কারাদন্ডে দন্ডিত হয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না। এক প্রশ্নের জবাবে প্রবীণ এই আইনজীবী বলেন, ‘যদি, কিন্তুর বিষয়টি অনেক দূরের বিষয়। তিনি দন্ডিত হয়েছেন, সংসদ সদস্য পদে অযোগ্যতার জন্য এটিই যথেষ্ট।’      

এদিকে ২ কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৩৮ জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত ১১ নভেম্বর পাপুল এবং তার স্ত্রী জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনের সদস্য সেলিনা ইসলাম, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও পাপুলের শ্যালিকা জেসমিনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এ মামলায় সেলিনা ইসলাম ও ওয়াফা ইসলাম জামিনে  রয়েছেন। তবে, তথ্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে তারা জামিন নিয়েছেনএমন অভিযোগ উঠেছে। নথি জালিয়াতি হয়েছিল কি না সে বিষয়ে হাইকোর্টের আদেশ জানা যাবে আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি। গত ২২ জুন বাংলাদেশ ব্যাংকে দুদকের দেওয়া চিঠিতে দেশি-বিদেশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাপুল, স্ত্রী সেলিনা, মেয়ে ওয়াফা ইসলাম ও শ্যালিকা জেসমিনের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক সব হিসাব স্থগিত রাখতে অনুরোধ জানানো হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত