জাতীয় রাজস্ব বিভাগের (এনবিআর) অতিরিক্ত করারোপ থেকে বাঁচতে ভেজাল মদ সরবরাহকারীদের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিদেশি মদের নামে ভেজাল মদ সরবরাহ করে সাধারণ মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে তারা। এসব ভেজাল মদ পান করে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।
গতকাল মঙ্গলবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য জানা গেছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, মদের আমদানি বন্ধ নেই। তবে চোরাইপথে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন বার, ক্লাব ও রেস্টুরেন্টের অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট মদের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি মুনাফা লাভের চেষ্টা করছে। এর ফলে ভেজাল মদ তৈরি ও সরবরাহ বেড়ে গেছে। এসব মদ পান করে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অনেকেই মারা গেছেন। এর মধ্যে গত দুই সপ্তাহে ২০ জনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে রাজধানীতে মারা যান ৯ জন। বগুড়াতে মারা যান ১১ জন। সর্বশেষ গতকাল অসুস্থদের মধ্যে রামনাথ রবিদাস ও ক্ষিতিশ চন্দ্র ভেলু নামে দুজনের মৃত্যু হয়। এর আগে আরও ৯ জন মারা যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানীর একটি বারের এক ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) দেশ রূপান্তরকে বলেন, কেউ ১ হাজার টাকার মদ কিনলে ভ্যাট গুনতে হয় ৩৫০ টাকার বেশি। এর বাইরে আরও খরচ আছে। এসব সরকার নিয়ে গেলে আমাদের মুনাফা কোথায়? তাই আমরা আমদানি বন্ধ করে দিয়েছি। এতে প্রতারকচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা নিজেরাই ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে মদ তৈরি করে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। সেগুলো পান করেই মানুষ মারা যাচ্ছে। তবে আমাদের বারে বসে মদ খেয়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
জানতে চাইলে ভ্যাট ও গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (সাবেক শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক) ড. মইনুল খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেকোনো লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান মদ আমদানি করতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি নিয়ে আমদানি করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের শুল্ক কর্র্তৃপক্ষের নির্ধারিত ট্যাক্স প্রদান করতে হয়। এটি অনেক আমদানিকারকের কাছে অলাভজনক ও জটিল প্রক্রিয়া মনে হওয়ায় তারা ভিন্নপথ অবলম্বনের চেষ্টা করে থাকেন। আমরা সেসব অবৈধ পথে নজরদারি বাড়িয়েছি। এতে চোরাচালানীর মাধ্যমে মদ সংগ্রহ অনেক কমে গেছে। এ খাতে সরকারের রাজস্ব বেড়েছে। বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন কেউ কেউ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, দেশে অনুমোদিত ১৪১টি বারসহ অসংখ্য ক্লাব ও রেস্টুরেন্ট মালিকরা এতদিন নামকাওয়াস্তে থোক বরাদ্দের মাধ্যমে মদ আমদানি করে প্রচুর মুনাফা কামিয়েছেন। এছাড়া কূটনৈতিক পাসপোর্ট ও বন্ডেড ওয়্যার হাউজের মাধ্যমে নানা কৌশলে কম দামে মদ কিনে তা গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করেছেন। বিষয়টি এনবিআরের নজরে আসার পর কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের অতিরিক্ত মদ কেনার বিষয়ে কঠোর নজরদারি শুরু হয়। এছাড়া সরকারের রাজস্ব আদায়ের প্রতি জোর দিয়ে ওয়্যার হাউজের অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এতে বৈধ আমদানিকারক কিংবা পরিবেশকরা নাখোশ হয়েছেন। তারা মদ আমদানির ক্ষেত্রে সরকারি নীতিমালা কিংবা নিয়মকানুন না মেনে কোনো ধরনের রাজস্ব প্রদান না করেই মদ আমদানিতে আগ্রহী। এজন্য তারা অবৈধ পথে বিশেষ করে চোরাচালানীর মাধ্যমে মদ সংগ্রহ করে থাকেন। এতে যেমন তাদের কোনো ভ্যাট, ট্যাক্স দিতে হয় না, আবার আমদানির ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা পরিহার করে সহজেই নিয়ে আসতে পারেন। এতে তাদের সময় কম লাগে, লাভও বেশি হয়। সম্প্রতি শুল্ক, ভ্যাট কর্র্তৃপক্ষ চোরাচালানের ওপর কঠোর নজরদারি করার ফলে এই পথে মদ আমদানি অনেক কমে গেছে।
তারা আরও জানান, ধর্মীয় কারণেই এ দেশে মদ ব্যবসা সীমিত করা হয়েছে। ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী অনুমোদিত সীমার মধ্যে থেকে বিদেশি পর্যটক, কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীরা ওয়্যার হাউজ থেকে প্রতি মাসে ২০০ ডলারের মদ কিনতে পারেন। এর বাইরে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পারমিটধারী ব্যক্তিরা মদ কিনতে পারেন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অনুসরণে দেখা গেছে, বিদেশি পর্যটক কিংবা কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের কাছে বিক্রি হওয়া মদ বিভিন্ন বার, ক্লাব ও রেস্টুরেন্টে পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি নজরে আনে শুল্ক কর্র্তৃপক্ষ। তারা নজরদারি বৃদ্ধি করে। এর ফলে বিদেশি মদের অবৈধ লেনদেন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে অনেক মানুষকে মদ পানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে সুযোগ দেওয়া হয়নি। সরকারি বিভিন্ন জটিল প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কোনো আমদানিকারক মদ আনার পর তাকে প্রায় ৬০০ ভাগ কর দিতে হয়। এতে প্রকৃতপক্ষে তারা বেশি সুবিধা করতে পারে না। এজন্যই মদ কারবারিদের সহায়তায় ভেজাল মদ তৈরিসহ চোরাইপথে আমদানির অনেক সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। এদের অধিকাংশই চায়নিজ মদ নিয়ে আসছে। আবার অনেকে এক বোতল থেকে বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে আরও অনেক বোতল তৈরি করে তা সরবরাহ করছে। তারা কখনো ইথাইল অ্যালকোহল আবার কখনো মিথাইল অ্যালকোহলের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের উপাদান মিশিয়ে বিক্রি করছে। এতে দুর্ঘটনার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, গত দুই মাস ধরে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বৈধ মদের বারে বিদেশি মদের সংকট শুরু হয়েছে। কেউ বারে গিয়ে এক বোতল মদ কিনতে চাইলেও দেওয়া হচ্ছে না। ভেঙে ভেঙে বিক্রি করা হচ্ছে। আর এ সুযোগটাই গ্রহণ করেছে মদের অবৈধ কারবারিরা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, বাড্ডা, ভাটারা, শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত ভেজাল মদের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এরা এক বোতল বিদেশি মদের সহায়তায় একাধিক বোতল তৈরি করতে পারে। যদিও অ্যালকোহল কিংবা অন্যান্য উপকরণের সঠিক মাত্রা বজায় রাখতে পারে না। কখনো কখনো নেশাজাতীয় বিভিন্ন ট্যাবলেট, ঘুমের ওষুধ ও ক্ষতিকর পদার্থ মিশিয়ে নতুন বোতল তৈরি করে। এসব পানীর বিভিন্ন উপাদানের পরিমাপের জন্য কোনো হাইড্রোমিটার ব্যবহারের বালাই নেই তাদের। ফলে এসব ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিকর পানীয় পান করে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। মৃত্যুবরণ করছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আহসানুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ভেজাল মদ কারবারিদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আরেক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, শুধু রাজধানী ঢাকায় নয়, সারা দেশেই ভেজাল মদ কারবারিদের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব আস্তানায় একযোগে অভিযান পরিচালনা করা হবে। ওই কর্মকর্তা আরও জানান, সংকট শুরু হওয়ার পর পটুয়াখালী জেলায় এক মাসে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে ভেজাল মদপানের কারণে। যদিও এসব ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, প্রতিটি জেলার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মৃত্যুর তালিকা তৈরির নির্দেশনাও দেওয়া হবে। শিগগিরই এসব বিষয়ে তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হবে।
রাজধানীর অনুমোদিত বারের একাধিক ম্যানেজার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মদের আমদানি পেপার্স মাসের পর মাস পড়ে থাকে এনবিআরে। টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না। এর ফলে মানুষ হাবিজাবি খেয়ে মারা যাচ্ছে। এ দায় তাদেরই নিতে হবে।’ তারা আরও বলেন, ‘আমাদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সাড়ে ৩৭ ভাগ ভ্যাট নিচ্ছে। তার ওপর সম্পূরক কর ২০ ভাগ আদায় করছে। এতে আমরা ক্ষতির মুখে পড়েছি। এভাবে ব্যবসা হবে কীভাবে?’
সংশ্লিষ্টরা জানায়, প্রায় তিন মাস আগে ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্টের সহায়তায় বিভিন্ন মদ সরবরাহকারী ক্লাব ও প্রতিষ্ঠান নামমাত্র মূল্যে মদ সংগ্রহ করে তা বিক্রি করা শুরু করে। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বিষয়টি জানার পর এনবিআর এসব ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি শুরু করে তা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। এরপর থেকেই মদ সরবরাহের সংকট তৈরি হয়েছে। এ সুযোগে অবৈধ কারবারিরা কখনো ভাত পচিয়ে চিনি মিশিয়ে তার সঙ্গে ইথাইল অ্যালকোহল যুক্ত করে বিক্রি করছে।
হোমিওপ্যাথিক প্রতিষ্ঠানের আমদানি করা স্পিরিটে তৈরি হচ্ছে মদ : ইথাইল অ্যালকোহল বা রেকটিফাইড স্পিরিট আমদানির ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা না থাকায় ব্যবসায়ীরা তা দেদার আমদানি করছে। এসব পদার্থ বিভিন্ন অসাধু ব্যবসায়ী সংগ্রহ করে তা চোলাই মদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নামে বোতলজাত শুরু করে। কখনো কখনো তারা বিষাক্ত মিথাইল অ্যালকোহলও মিশিয়ে দিচ্ছে। এর ফলেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
বগুড়াতে আরও মৃত্যু : বগুড়া প্রতিনিধি জানান, রামনাথ রবিদাস শহরের পুরান বগুড়া ঋষিপল্লীর মৃত রামপদ রবিদাসের ছেলে এবং ক্ষিতিশ চন্দ্র ভেলু পাশের পুরান বগুড়া হিন্দুপাড়ার নিতাই চন্দ্রের ছেলে। রামনাথ রবিদাস মারা যাওয়ায় ঋষিপল্লীর একই পরিবারে বাবা-ছেলেসহ তিনজনের মৃত্যু হলো। ঋষিপল্লীতে বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে গত রবিবার রাতে তারা অ্যালকোহল জাতীয় মদ পান করে। এতে বিষক্রিয়ায় ঋষিপল্লীর সুমন, তার বাবা প্রেমনাথ ও চাচা রামনাথ মারা যান। একই রাতে এবং পরদিন সোমবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন এলাকায় আরও আটজনের মৃত্যু হয়। এই আটজন হলেন পুরান বগুড়া এলাকার রমজান আলী (৪০), শহরের কাটনারপাড়ার সাজু মিয়া (৫৫) ও মোজাহার আলী (৭০), ফুলবাড়ী সরকারপাড়ার আবদুল জলিল (৬৫), ফাঁপোড়ের জুলফিকার আলী (৫২), ফুলবাড়ী মধ্যপাড়ার পলাশ (৩৫), নিশিন্দারা ধমকপাড়ার আলমগীর হোসেন (৪০) ও ক্ষিতিশ চন্দ্র ভেলু (৫৫)। এদিকে বিষাক্ত মদপানে মৃত্যুর ঘটনায় অবৈধভাবে অ্যালকোহল বিক্রির অভিযোগে মনোয়ার হোসেন রিপন নামে একজন বাদী হয়ে সোমবার রাতে বগুড়া সদর থানায় মামলা করেছেন। তিনি রবিবার রাতে অ্যালকোহল পান করে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রঞ্জুর ভাই।
বগুড়া সদর থানার ওসি হুমায়ুন কবীর বলেন, মামলায় তিনজন অ্যালকোহল বিক্রেতাকে আসামি করা হয়েছে। তারা গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপন করেছে। বিষাক্ত মদপানে মৃত্যুর অভিযোগে গতকাল পর্যন্ত আটজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত করা হয়। অন্যদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান ওসি।
এর আগে রাজধানীর একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার তিনজন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের (ইউল্যাব) ছাত্রী ও তার ছেলেবন্ধু, বাড্ডা খিলবাড়ির টেকের তিনজনের মৃত্যু হয় ভেজাল মদ পান করে। এসব মদ তারা বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সদস্যদের মাধ্যমে সংগ্রহ করেছিলেন।
