দেশে নারী ও মেয়েশিশু ধর্ষণের পাশাপাশি ছেলেশিশু ধর্ষণের ঘটনাও দীর্ঘদিনের এক প্রকট সামাজিক সংকট। আগে ততটা চোখে না পড়লেও আজকাল প্রায়ই জাতীয় গণমাধ্যমে ছেলেশিশু ধর্ষণের সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু ছেলেশিশুরা কেবলই যে ধর্ষণের এই গভীর সামাজিক অসুখের নির্মম বলি হচ্ছে তা-ই নয়, আইনি জটিলতা আর সামাজিক অসচেতনতার কারণে একই সঙ্গে ছেলেশিশুরা ন্যায়বিচার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। দেশে শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ নামে একটি আলাদা কঠোর আইন থাকলেও এখনো ছেলেশিশুর ধর্ষণের বিচার অনেক ক্ষেত্রেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে না হয়ে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের অধীনেই হচ্ছে। সামাজিকভাবে সাধারণত ‘ধর্ষণ’ শব্দটি দ্বারা কোনো নারী বা মেয়েশিশুর ধর্ষিত হওয়াকে বোঝানো হয়, আর ছেলেশিশু ধর্ষিত হলে সেটিকে প্রচলিতভাবে ‘বলাৎকার’ বলেই উল্লেখ করা হয়। অনেক অভিধানেই ‘ধর্ষণ’-এর সমার্থক শব্দ হিসেবে ‘বলাৎকার’ ব্যবহার করা হলেও, প্রচলিত ধারণাটি হলো একজন পুরুষ বা ছেলেশিশু যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন সেটাকে ‘বলাৎকার’ বলা হবে ‘ধর্ষণ’ নয়।
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, আইনি অস্পষ্টতা এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি দুটোই এই সংকট সমাধানের অন্তরায়। বিদ্যমান নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ‘শিশু’ বলতে যে কোনো লিঙ্গের শিশুকেই বোঝানো হচ্ছে, তাই সঠিক আইনি ব্যাখ্যা অনুযায়ী ছেলেশিশু ধর্ষণকেও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনেই বিচার করতে হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনটিতে ‘শিশু’ শব্দের ব্যখ্যা দিয়ে মেয়েশিশু ও ছেলেশিশু উভয়ের উল্লেখ করা যেতে পারত। এছাড়া আরেকটি বড় সংকট হলো কোনো আইনেই ‘পেনিট্রেশন’ বলতে আসলে কী কী ধরনের যৌনসঙ্গমকে বোঝাবে, তার কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা করা নেই। তাই পুলিশের কাছে যখন ধর্ষণের শিকার ছেলেশিশুর পক্ষ থেকে বিচার চাওয়া হয়, তখন মামলাটি অনেক সময়ই ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’-এর ধারা ৯-এ নেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় মামলার এফআইআর রুজু হয় দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৭-এ। ব্রিটিশ আমল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই ৩৭৭ ধারা আসলে সমকামিতাসহ ‘প্রাকৃতিক’ নিয়মবিরুদ্ধ যৌনসঙ্গমকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে সমলিঙ্গের মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার ছেলেশিশুর মামলাও তাই ৩৭৭-এর অধীনে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এই আইনে (৩৭৭-এ) অপরাধী বা অপরাধের শিকার ব্যক্তির বয়স, সম্মতি বা অসম্মতির প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক। আবার, ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’-এর ৯ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও, ৩৭৭-এ সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং তাতে কোনো সর্বনিম্ন শাস্তির বিধান নির্দিষ্ট করা নেই।
এসব সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো নিয়ে সাধারণ মানুষ তো বটেই আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বরতদের অনেকেই সচেতন নন। এমনকি এখনো অনেক সংবাদপত্রেও ছেলেশিশু ধর্ষণের ঘটনাকে ‘ধর্ষণ’ হিসেবে উল্লেখ না করে ‘বলাৎকার’ লেখা হয়। যদিও অভিধান অনুসারে এ দুই শব্দের তেমন কোনো পার্থক্য নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাইকোর্ট এ ধরনের মামলা ও বিচার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে তেমন কিছুই হয়নি। সম্ভবত এ কারণেই দেখা যাচ্ছে ‘বলাৎকার’ সংক্রান্ত মামলায় বিগত ১০ বছরে কারও সাজার নজিরও নেই। এজন্য ছেলেশিশু ধর্ষণ এবং ছেলেশিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতনের ঘটনা আড়াল না করে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ধর্ষণসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা সংশোধনের তাগিদ দিয়ে আসছেন মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা।
মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাস ও এতিমখানায় ছেলেশিশু ধর্ষণের ঘটনা বহুল আলোচিত-সমালোচিত হয়েছে। এছাড়া ছিন্নমূল ও শিশুশ্রমে নিয়োজিত ছেলেশিশুরা এ ধরণের যৌন নির্যাতনের বড় শিকার। এ কারণে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ছাত্রাবাসগুলোতে যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ সেল তৈরি ও সক্রিয় করার পাশাপাশি সতর্ক পর্যবেক্ষণ ও নজরদারি বাড়ানো দরকার। একইসঙ্গে ছেলেমেয়েদের যৌন নিপীড়ন বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতনতা আরও বাড়াতে হবে। কেননা, শিশুরা অবুঝ বলে তাদের প্রতি অপরাধ ঘটানো সহজ। ছেলেশিশু নির্যাতনের শিকার হলেও সেটি ধর্ষণ বলে বিবেচনা করা হয় না। বিচার অঙ্গন সংশ্লিষ্টরা এসব নিয়ে সোচ্চার হলেও তেমন কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। গত বছরের ২৯ অক্টোবর ‘বলাৎকার’-কে ‘ধর্ষণ’ গণ্য করতে আইন সংশোধন এবং এ অপরাধে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড চেয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের আইনি নোটিস পাঠান আইনজীবী হুমায়ুন কবির পল্লব ও ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাউছার। এ ছাড়া সম্প্রতি দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারায় ‘পুরুষ ধর্ষণ’ শব্দটি সংযুক্ত করে আইন সংশোধনে হাইকোর্টে রিট করেছেন আইনজীবী তাপস কুমার বল। আইন মন্ত্রণালয় এবং বিচার বিভাগের উচিত হবে ছেলেশিশু ধর্ষণ বন্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রেখে সংশ্লিষ্ট আইন সংস্কারের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
