শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল

করোনাকালেও থামেনি কাজ দৃশ্যমান হচ্ছে অবকাঠামো

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১২:৫২ এএম

মাত্র ১৪ মাসে শেষ হয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের ১১ শতাংশ কাজ। গোটা প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজ প্রায় শেষের পথে। মূল টার্মিনালের ৩০৪৯টি পিলারের সবই দাঁড়িয়ে গেছে। এয়ারসাইট, ট্যাক্সিওয়ে ও দুটি উইংসের জন্য প্রয়োজনীয় পিলার নির্মাণের কাজও অর্ধেক শেষ। আগামী এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয় তলার গুরুত্বপূর্ণ কাজও শেষ হয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটির এই অগ্রগতিতে অভিভূত ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি। গত সোমবার দেশের অন্যতম বৃহত্তম এ প্রকল্পের মূল ভিত পরিদর্শনে গিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন তিনি।

এ ব্যাপারে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যে কোনো মূল্যে নির্ধারিত সময়ে শেষ করা হবে স্বপ্নের এ প্রকল্পটি। করোনাভীতি উপেক্ষা করে যেভাবে শ্রমিক, প্রকৌশলীসহ অন্যান্য দক্ষ জনবল তাদের পারফনমেন্স দেখিয়েছেন তা সত্যিই অসাধারণ। এভাবে কাজ চলতে থাকলে সবার পরিশ্রমই সার্থক হবে। প্রয় ৩৫০ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন টার্মিনালে একসঙ্গে কতগুলো ফ্লাইট বোর্ডিং ব্রিজ, ইমিগ্রেশন কতটা আধুনিক ও যানজট মোকাবিলার সুযোগ-সুবিধা থাকবে তা নিয়ে অনেকেরই কৌতূহল রয়েছে। মিডিয়াসহ অনেকেই প্রতিদিন প্রশ্ন করে জানতে চান। আসলে থার্ড টার্মিনাল বর্তমান টার্মিনাল থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের টার্গেট ২০২৩ সালের জুনে সব কাজ শেষ করা।’

জাপানের রাষ্ট্রদূতের পরিদর্শনের সময় তার সঙ্গে ছিলেন বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মালেক, প্রজেক্ট ডাইরেক্টর (পিডি) প্রকৌশলী মাকুসুদুল আলম ও নিপ্পন কইয়ের পরামর্শক মাহতাবুর রহমানসহ আরও অনেকে। তারা প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে গোটা প্রকল্পের প্রধান প্রধান স্থাপনাগুলো পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করেন। বিশেষ করে করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও জাপানি রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি স্বাস্থ্যবিধি মেনে দেড় হাজার শ্রমিকের দিন-রাত পরিশ্রমের দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়ে তাদের উৎসাহ দেন। এ সময় কাজের পরবর্তী ধাপ ও পর্যায় সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেন বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মালেক। পরিদর্শনরত বিদেশি অতিথিদের জানানো হয়Ñ প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং কাজ হচ্ছে মাটি ভরাট। সেটি হয়ে গেছে আশি শতাংশেরও মতো। আগামী বর্ষার আগেই এয়ার সাইট ও ট্যাক্সিওয়ের কাজও শেষ হয়ে যাবে। তারপর বর্ষা মৌসুমে মাটির উপরিভাগের মূল মেঝের ঢালাই দেওয়া হবে। যার ওপর ভিত্তি করে উঠে যাবে প্রতিটি তলার অবকাঠামো।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১৯ সালের নভেম্বরে এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। থার্ড টার্মিনালে কেবিন এক্সরে মেশিন ৪০টি, বোর্ডিং ব্রিজ ১২টি, কনভেয়ার বেল্ট ১৬টি, বডি স্ক্যানার ১১টি, টানেলসহ বহুতলবিশিষ্ট কার পার্কিং ৫৪ হাজার বর্গমিটার, নতুন ইমপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স ও এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স ৬৩ হাজার বর্গমিটার, রেসকিউ ও ফায়ার ফাইটিং স্টেশন এবং ইক্যুইপমেন্ট ৪ হাজার বর্গমিটার, ভূমি উন্নয়ন, কানেক্টিং ট্যাক্সিওয়ে (উত্তর) ২৪ হাজার বর্গমিটার, কানেক্টিং ট্যাক্সিওয়ে (অন্যান্য) ৪২ হাজার ৫০০ বর্গমিটার, র‌্যাপিড এক্সিট ট্যাক্সিওয়ে (উত্তর) ২২ হাজার বর্গমিটার, র‌্যাপিড এক্সিট ট্যাক্সিওয়ে (দক্ষিণ) ১৯ হাজার ৫০০ বর্গমিটার, সোল্ডার ৯৬ হাজার ৫০০ বর্গমিটার, জিএসই রোড ৮৩ হাজার ৮০০ বর্গমিটার, সার্ভিস রোড ৩৩ হাজার বর্গমিটার, ড্রেনেজ ওয়ার্কস (বক্স কালভার্ট ও প্রোটেক্টিভ ওয়ার্কস), বাউন্ডারি ওয়াল, সিকিউরিটি গেট, গার্ড রুম ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ, ল্যান্ড সাইড, সার্ভিস রোডসহ এলিভেটেড রোড, ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেম, স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, ইনটেক পাওয়ার প্লান্ট ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম, কার্গো কমপ্লেক্সের জন্য সিকিউরিটি ও টার্মিনাল ইক্যুইপমেন্ট, এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম এবং হাইড্রেন্ট ফুয়েল সিস্টেমসহ আনুষঙ্গিক সব সুবিধা থাকবে। এছাড়া অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে ফানেল টানেল রাখা হবে। ৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটারে ৩৭টি উড়োজাহাজ রাখার অ্যাপ্রোন ও ১ হাজার ২৩০টি গাড়ি রাখার সুবিধা, ৬৩ হাজার বর্গফুট জায়গায় আমদানি রপ্তানি কার্গো কমপ্লেক্স এবং ১১৫টি চেক থার্ড টার্মিনাল ইন কাউন্টারসহ সব মিলিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমানবন্দরের সব সুযোগ-সুবিধা থাকবে থার্ড টার্মিনালে। ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর শাহজালাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণে এই প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক। প্রায় একুশ হাজার কোটি টাকার এ নির্মাণকাজে অর্থায়ন করছে জাইকা। আর জাপানের সিমুজি ও কোরিয়ার স্যামসাং যৌথভাবে এভিয়েশন ঢাকা কনসোর্টিয়াম (এডিসি) নামে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। দুই দেশের চার শতাধিক দক্ষ জনবল কাজ করছে এই প্রকল্পে। প্রখ্যাত স্থপতি রোহানি বাহারিনের নকশায় টার্মিনালে ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের একটি ভবন তৈরি হবে।

প্রকল্প পরিচালক বেবিচকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাকসুদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশাল প্রকল্পে ত্রুটি এড়াতে সবাই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে কাজ করছেন। বেবিচক চেয়ারম্যান সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। প্রতি সপ্তাহে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ডেকে কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নিচ্ছেন। অসংগতি পেলে পরামর্শ দিচ্ছেন। এজন্য করোনাও আমাদের কাজে বাধা হতে পারেনি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত