১৯৭১ সালে বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন বিশ্বে তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের যুগ চলছিল। পাশাপাশি ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেট আবিষ্কার এ বিপ্লবের গতি, প্রভাব ও ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করে দেয়। জাপান, চীন, কোরিয়াসহ এশিয়ার কিছু কিছু দেশ তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের আবির্ভাব থেকে সৃষ্ট সুযোগকে কাজে লাগাতে শুরু করে। বঙ্গবন্ধু দেখলেন তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের সম্ভাবনা ও সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশ উন্নতির শিখরে পৌঁছে যাচ্ছে। তাই অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি মৌলিক চাহিদাগুলোর মতো তথ্যপ্রযুক্তির সম্প্রসারণকেও তিনি গুরুত্ব দেন। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের বিকাশে উদ্যোগ গ্রহণ করেন দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু।
বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়নের (আইটিইউ) সদস্যপদ লাভ করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালের ১৪ জুন বঙ্গবন্ধু বেতবুনিয়ায় স্যাটেলাইট আর্থ-স্টেশন স্থাপন করেন। ফলে বাংলাদেশ সহজেই বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়। একটি দেশের উন্নতিতে বহির্বিশ্বের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখা অত্যাবশ্যকীয়। বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টির কারণে এর সুফল আজ আমরা ভোগ করছি। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তির বহুবিধ ব্যবহার এবং গুরুত্ব নতুন করে বলার কিছুই নেই। ইন্টারনেটের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। অফিসের কাজ, ব্যবসা, লেনদেন, কৃষি, চিকিৎসা, শিক্ষাক্ষেত্রসহ প্রাত্যহিক জীবনের বহু কাজ কত দ্রুত আর সহজেই হয়ে যাচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে। আমরা এখন এতটাই তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর হয়ে গেছি যে একটা দিনও আমরা তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া চলতে পারি না।
বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে। যেখানে প্রকৃতি, প্রযুক্তি এবং মানুষ এই তিনের সমন্বয় ঘটিয়েই বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে। মানুষের বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট এবং উন্নত প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে রিয়েল এবং ভার্চুয়াল জগৎকে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উদ্দেশ্যই হচ্ছে মানুষের জীবনকে আরও সহজতর করে দেওয়া। মানুষ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, আইওটি, থ্রি-ডি, ন্যানোটেকনোলজি, বায়োটেকনোলজি এবং আরও অনেক প্রযুক্তির ব্যবহার করছে নানা ক্ষেত্রে। এসব বিষয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের সুবিধার্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এরই মধ্যে কয়েকটি বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার তৃতীয় এবং বিশ্বের ১২তম মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি ২০১৬ সালে যাত্রা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০১৯ সালে। বর্তমানে প্রায় প্রতিটি জেলায়ই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হচ্ছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের দেশে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নবযুগের সূচনা ঘটাবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। আজকের বাংলাদেশের মুকুটে সাফল্যের যেসব পালক যুক্ত হয়েছে, বঙ্গবন্ধুই সে স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন।
বর্তমানে উন্নত বিশ্ব প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েই অভূতপূর্ব উন্নতি করে চলেছে। এ বিষয়টি বঙ্গবন্ধু অনুধাবন করতে পেরেছিলেন অনেক আগেই। তিনি চেয়েছিলেন এমন শিক্ষাব্যবস্থা, যার মাধ্যমে শুরু থেকেই দেশের ছোট্ট শিশু-কিশোররা সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে এবং প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠে। তাই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই তিনি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে একটি যুগোপযোগী শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। একইভাবে তিনি ১৯৭২ সালের সংবিধানে শিক্ষাকে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেন। পরে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ’ (বিসিএসআইআর) প্রতিষ্ঠা করেন। এসবই তিনি করেছিলেন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার তিন বছরের মধ্যে।
বঙ্গবন্ধুর এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ভূমিকা পালন করছেন তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়। যার নিদর্শন আমরা দেখতে পাই যখন বাংলাদেশ বিশ্বের ৫৭তম যোগাযোগ উপগ্রহের মালিকানা লাভ করে। এই স্যাটেলাইটের নাম দেওয়া হয় ‘বঙ্গবন্ধু-১’। এই স্যাটেলাইটের কারণে দেশ প্রযুক্তিগতভাবে অনেক এগিয়েছে। এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সুবিধা পাচ্ছে মানুষ। অত্যন্ত দ্রুতগতির ইন্টারনেট (ফোর-জি) সুবিধা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে। রিমোট লার্নিং বা দূরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থা এবং বাসা থেকে অফিশিয়াল কাজ করা সম্ভব হয়েছে, যা এই করোনাকালে আমাদের উপকারে এসেছে। সব থেকে বড় কথা, পুরো বিশ্বই এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। শুধু স্মার্টফোন ব্যবহার করেই যেকোনো স্থান থেকে ইন্টারনেট সুবিধা গ্রহণ সহজ হয়েছে। প্রতি মুহূর্তেই আমরা প্রয়োজনীয় তথ্য খুব সহজেই পেয়ে যাচ্ছি।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে একটি তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সরকার যে ‘রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণা করেছিল, সেই ঘোষণার আলোকে এরই মধ্যে জেলা ও ইউনিয়নপর্যায়ে ইন্টারনেটসেবা, মোবাইল মানি ট্রান্সফার, বিমানের টিকিট, ই-টেন্ডারিংসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, বাণিজ্য ইত্যাদি ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। জনগণের দোরগোড়ায় তথ্যপ্রযুক্তির সেবা তথা ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল পৌঁছে দিতে সরকারের এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সে লক্ষ্যে প্রতিটি ইউনিয়নে ইন্টারনেট কানেকটিভিটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। প্রকল্পের মূল কার্যক্রম হচ্ছে জেলা, উপজেলা সদর এবং ইউনিয়ন পরিষদে আইপি যন্ত্রপাতি স্থাপন ও আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে ও জাতীয় ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জগুলোর ক্যাপাসিটি বৃদ্ধি, ডট বিডি বাংলা ডোমেইন, ওয়েব হোস্টিং, কানেকশন, সার্ভার, ভার্চুয়াল মেশিন, স্ট্রেঞ্জ, আলউড কমপিউটিং ইত্যাদির স্ট্যান্ডার্ড প্ল্যাটফর্ম এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ডিজিটাল যন্ত্রপাতি ক্রয় ও স্থাপন করা। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) টার্গেটগুলো বিবেচনায় নিয়ে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশের মোট ব্যান্ডউইথ চাহিদা ১১ হাজার ৫০০ জিবিপিএস প্রক্ষেপণ করা হয়েছে। ২০২০ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ব্যান্ডউইথের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৬২৫ জিবিপিএস। ২০৩০ সাল পর্যন্ত ব্যান্ডউইথের চাহিদা নিরূপণ করে ৪৭২টি উপজেলায় ১০ গিগাবাইট/সেকেন্ড এবং এর গুণিতক ক্যাপাসিটির রাউটার ও সুইচ, ১ হাজার ২১৬টি ইউনিয়ন পরিষদে ১/১০ বা গিগাবাইট/সেকেন্ড ক্যাপাসিটির সুইচ স্থাপন কাজ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে প্রতিটি ইউনিয়নপর্যায়ে কমপক্ষে ১০ জিবিএস ক্ষমতার ইন্টারনেট ব্যাকবোন তৈরি করা সম্ভব হবে।
ই-গভর্নমেন্ট কার্যক্রমে বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলো দ্রুত প্রসার লাভ করছে। বিশ্বের ১৯৮ দেশের ই-গভর্নমেন্ট কার্যক্রমে অগ্রগতির ভিত্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৬তম, প্রথম স্থানে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। আর ই-পার্টিসিপেশন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৪১তম। এভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের ফলে জাতিসংঘের ই-গভর্নমেন্ট সূচকে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানের প্রকাশ ঘটে ২০১৮ সালে। ই-কমার্সের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। এখনো পর্যন্ত শহরাঞ্চলের মধ্যে ই-কমার্স অনেকখানি সীমাবদ্ধ থাকলেও গ্রামাঞ্চলেও লেগেছে ই-কমার্সের ছোঁয়া। নিকট ভবিষ্যতে ই-কমার্স দেশের প্রতিটি অঞ্চলেই ছড়িয়ে পড়বে, সেই সম্ভাবনা এখন স্পষ্ট। এই তো মাত্র ২০০৮-০৯ সালে বাংলাদেশে ই-কমার্সের যাত্রা শুরু। সেই হিসাবে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আমাদের দেশে যেভাবে ই-কমার্স সাইটগুলো প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, সেটি বড় একটি অর্জন। বলা চলে মহাহামারী এই করোনাকালে অনেক ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামলেও ইন্টারনেটের কল্যাণে বাংলাদেশসহ বিশ্বে ই-বিজনেসের প্রসার ঘটেছে বহু গুণ। রাস্তায় জ্যাম, টিকিট পাইনি, গাড়ি অচল, অতিবৃষ্টি, গরম কিংবা কনকনে শীত এসব বলার দিন শেষ। কে, কোথায়, কীভাবে আছি তা আজ আর বিবেচ্য বিষয় নয়। এসবের সময়, দূরত্ব এবং খরচ আজ শূন্যের কোঠায় যাচ্ছে এই ডিজিটাল প্রযুক্তির বদৌলতে। এ সময়ের জনপ্রিয় পেশা ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং। আউটসোর্সিং পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশের ফ্রিল্যান্সাররা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা বিদেশ থেকে আয় করছেন। বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিংয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। দেশে নিবন্ধিত দুই লাখের অধিক ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী রয়েছেন।
তবে সব সম্ভাবনাকে ছাড়িয়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, সেটি হলো তথ্য ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের বাস্তব অস্তিত্ব। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য ও প্রযুক্তিগত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাবে আরও হাজার বছর সম্মুখে এটাই হোক আজকের তরুণ প্রজন্মের শপথ।
লেখক তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, অধ্যাপক ও পরিচালক, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
