করজে হাসানা প্রসঙ্গে নির্দেশনা

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২১, ১১:৩৫ পিএম

মানুষকে সাহায্য করার অন্যতম একটি মাধ্যম হলো ঋণ প্রদান। যদিও আমাদের সমাজে এ ক্ষেত্রে সুদভিত্তিক লেনদেন বেশি হয়। এমতাবস্থায় করজে হাসানার প্রচলন অত্যন্ত জরুরি। করজে হাসানার অর্থ হচ্ছে ঋণ বা করজ দেওয়া, যা সময়মতো পরিশোধ করা হবে; কিন্তু দাতা কোনো অতিরিক্ত অর্থ অথবা সুবিধা নেবেন না। কোরআন-হাদিসে করজে হাসানার গুরুত্ব ও ফজিলতের কথা বেশ গুরুত্বসহকারে আলোচিত হয়েছে।

কোরআনে কারিমের কয়েকটি সুরার একাধিক স্থানে ‘করজে হাসানা’ প্রসঙ্গে আলোচনা এসেছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘কে সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহকে উত্তম করজে হাসানা দেবে, এরপর তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন এবং তার জন্য রয়েছে সম্মানিত পুরস্কার।’ সুরা আল হাদিদ : ১১

কোরআনে কারিমে আরও ইরশাদ হচ্ছে, ‘নিশ্চয় দানশীল ব্যক্তি ও দানশীল নারী, যারা আল্লাহকে উত্তমরূপে করজে হাসানা দেয়, তাদের দেওয়া হবে বহুগুণ এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার।’ সুরা আল হাদিদ : ১৮

বর্ণিত আয়াত দুটোতে সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহকে ঋণ দেওয়ার ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘বান্দাদের ঋণ দিয়ে তাদের অভাব মোচন করা। কেউ যদি মানুষের প্রতি করুণা করে তাহলে আল্লাহতায়ালাও তার প্রতি করুণা করবেন।’ মাআরেফুল কোরআন ঋণের ক্ষেত্রে সমাজে দুটি অবস্থা দেখা যায়। সেগুলো হলো সয়লাব ও সঙ্কট। অর্থাৎ সুদভিত্তিক ঋণের সয়লাব আর সুদবিহীন ঋণের সঙ্কট। একদিকে সামান্য প্রয়োজনে ঋণগ্রহণ করা এমনকি বিনা প্রয়োজনে গোনাহের কাজের জন্য ঋণ নেওয়া। অন্যদিকে সত্যিকারের অভাবীর প্রয়োজন মেটাতে ঋণ পাওয়া বিরল ঘটনা, কঠিন বিপদেও তা কদাচিৎই পাওয়া যায়।

করজে হাসানার বিষয়ে ইসলাম কল্যাণকর নির্দেশনা দিয়েছে। এর অন্যতম হলো ঋণ গ্রহীতার দায়িত্ব। ইসলাম মনে করে, ঋণ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা কোন পর্যায়ের, ঋণগ্রহণ ছাড়া অন্যভাবে প্রয়োজন পূরণ সম্ভব কি না, ঋণ সময়মতো পরিশোধ করা যাবে কি না এ বিষয়গুলো বিবেচনা করা অতি জরুরি। বিশেষ প্রয়োজন এবং সময়মতো পরিশোধের প্রবল সম্ভাবনা ছাড়া ঋণগ্রহণ জায়েজ নয়। আর অপচয় ও অন্যায় কাজের জন্য ঋণ নেওয়া এবং ঋণকে জীবনের সাধারণ নিয়মে পরিণত করার তো প্রশ্নই আসে না।

ঋণ একটি বোঝা। ঋণগ্রস্ততা অনেক সময় দুশ্চিন্তা, অশান্তি ও অনৈতিকতার কারণ হয়। এ জন্য বান্দার কর্তব্য, আল্লাহর কাছে ঋণ থেকে আশ্রয় চাওয়া এবং দোয়া করা। তিনি যেন ঋণ ছাড়া সব প্রয়োজন পূরণ করেন। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে ঋণ থেকে আশ্রয় চাইতেন। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয় তখন কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে।’সহিহ বোখারি : ৮৩২

ঋণ থেকে বাঁচতে ইসলামি স্কলারদের পরামর্শ হলো বিশেষ প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধের সম্ভাবনা ছাড়া ঋণ না নেওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা। আয়-ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় করে চলা। নামডাক, কৃত্রিমতা ইত্যাদি থেকে দূরে থাকা। যেসব কাজে জানমালের বরকত হয় তা গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা। বরকত বিনষ্টকারী কাজ ও অভ্যাস থেকে দূরে থাকা।

ঋণ থেকে বাঁচার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সাহায্য করা। পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে কাউকে ঋণ গ্রহণের দিকে ঠেলে না দেওয়া। এটিও সাহায্যের একটি বড় উপায়। ঋণ নিলেও নির্ধারিত সময়ে তা পরিশোধ করা। টালবাহানা, মিথ্যা কথা ও মিথ্যা ওয়াদার তো প্রশ্নই আসে না। এমন আচরণ সবসময়ই নাজায়েজ। আর যে বিপদে ঋণ দিয়ে অনুগ্রহ করেছেন তার সঙ্গে এসব করলে তা আরও ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।

ঋণ বান্দার হক, যা পরিশোধ করতে হয় অথবা দাতা কর্তৃক মাফ পেতে হয়। এছাড়া মুক্তির কোনো পথ নেই, আল্লাহ তা মাফ করেন না। এজন্য ঋণ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিশোধ করা উচিত। হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘ঋণ ছাড়া শহীদের সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’সহিহ মুসলিম : ১৮৮৬

নবী করিম (সা.) -এর কাছে মাইয়্যিত উপস্থিত করা হলে জিজ্ঞাসা করতেন ঋণ আছে কি না, থাকলে পরিশোধের মতো কিছু রেখে গিয়েছে কি না। রেখে না গেলে তিনি জানাজা পড়তেন না।

এতসব সতর্কতা শেষে প্রয়োজনে ইসলাম ঋণ গ্রহণের কথা বলে। সেই সঙ্গে ঋণদাতাকেও কিছু দায়িত্ব দিয়েছে। এসব দায়িত্বের অন্যতম হলো বিশেষ প্রয়োজনে কেউ ঋণ চাইলে সামর্থ্য থাকলে তাকে ঋণ দেওয়া। ঋণ দিয়ে মূলত অভাবী ও মুখাপেক্ষীকে সাহায্য করা। কোরআন-হাদিসে মুখাপেক্ষীকে সাহায্যের যে সওয়াব ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, তা এখানে প্রযোজ্য।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিম মুসলিমের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না। তার সাহায্য ত্যাগ করে না। যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে থাকে, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণে থাকেন। আর যেকোনো মুসলিমের একটি বিপদ দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার বিপদসমূহ থেকে একটি বিপদ দূর করবেন।’সহিহ বোখারি : ২৪৪২

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত