পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা

আপডেট : ০৩ মে ২০২১, ০৩:১৯ এএম

ভারতীয় জনতা পার্টি বিজেপি টানা দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসেই সংবিধান সংশোধন করে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়েছিল। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে কাশ্মীরে এক বেদনাদায়ক পরিস্থিতি তৈরি হয়। যা ভারতের সংবিধান নির্দেশিত ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির প্রতি মারাত্মক আঘাত হিসেবে তুমুলভাবে সমালোচিতও হয়। একইভাবে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে ভারতজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিরোধী রাজনীতিক ও সমালোচকরা বলেন, বিজেপির এসব বিতর্কিত কর্মসূচির লক্ষ্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার সংকোচন করা এবং ভারতকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে পরিণত করা। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনেও বিজেপির অন্যতম হাতিয়ার ছিল সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে ঠেকিয়ে দিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের বড় বিজয়।

সোমবার রাত সাড়ে আটটা নাগাদ সবশেষ খবরে, ভোট হওয়া ২৯২টি আসনের মধ্যে ২১৩ টিতে তৃণমূল কংগ্রেস, ৭৭টিতে বিজেপি আর একটিতে কংগ্রেস-বাম জোট জয়ী হয়েছে। অবশ্য ভোটদানের হিসাবে তৃণমূলের ঝুলিতে এরই মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পড়ার খবর মিলেছে। এর আগে ১৯৮৭ সালের নির্বাচনে ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে রেকর্ড গড়েছিল বামফ্রন্ট। অবশ্য বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী আরেক ঘনিষ্ঠ রাজ্য আসামে বিজেপি জয় ছিনিয়ে নিয়েছে। আসামে মোট ১২৬টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ৭৬টি আসন। কংগ্রেস পেয়েছে ৪৮টি এবং অন্যরা বাকি ২টি। উল্লেখ্য, আসাম রাজ্যেই বিতর্কিত ‘সিএএ’ ও ‘এনআরসি’ প্রথম প্রয়োগ করার চেষ্টা করে বিজেপি সরকার। অভিন্ন সীমান্ত, ভাষা, ধর্মীয় পরিচয় এবং একই সংস্কৃতির উত্তরাধিকারের বিবেচনাতেও বাংলাদেশের নিকটতম রাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার ভোটের ফল ও রাজনৈতিক চালচিত্রের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। সেটা যেমন ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তেমনি বাংলাদেশের জন্যও। এসব কারণেই বাংলাদেশের মানুষও পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের ভোটের ফল দেখার অপেক্ষায় ছিলেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের একটা সাম্প্রদায়িক রূপান্তর ঘটাতে চেয়েছিল বিজেপি শিবির। কিন্তু বিজেপির নির্বাচনী প্রচারাভিযান শেষ পর্যন্ত এতটা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে যে, তাতেই হয়তো আঁতে ঘা লাগে বাঙালির। লক্ষ করবার মতো বিষয় হলো বিজেপির সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের রাজনীতি ঠেকাতে বামফ্রন্ট-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট রীতিমতো ব্যর্থ প্রমাণিত হলো। বিপরীতে বিজেপির ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান ও হিন্দি আধিপত্যের বিরুদ্ধে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের তৃণমূল-মমতার কৌশলই সবচেয়ে কার্যকর ফল এনে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। খোদ নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ থেকে শুরু করে বিজেপির স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা যে ভাষায় প্রচারণা চালিয়েছেন তাতে তাদের অনেক বক্তব্যই সরাসরি বাঙালির সংস্কৃতির ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করেছে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন একপ্রকার দখল করে নেওয়া থেকে শুরু করে নানা ঘটনা যেমন, তেমনি বিজেপি নেতাদের হিন্দি বুলি আর হিন্দি ভাষণও বাঙালি গ্রহণ করেনি। বেশ কিছু বছর ধরেই পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ‘জয় বাংলা’ জনপ্রিয় করছিলেন মমতা। এবারের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে বিজেপির ‘জয় শ্রীরাম’-এর বিপরীতে ‘জয় বাংলা’-কে রীতিমতো যুদ্ধাস্ত্রের মতো ব্যবহার করেছেন তিনি। এখানে উল্লেখ যেতে পারে যে, বহু বছর ধরেই পশ্চিমবঙ্গে একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপিত হচ্ছে। সম্প্রতি সেখানে ভাষা আন্দোলনের স্মরণে স্থায়ী শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর কয়েক বছর ধরে ঢাকার মতোই পহেলা বৈশাখে মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রচলনের একটা চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে কলকাতায়। আর এই সবকিছুকেই বাঙালিত্বের গর্ব হিসেবে নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের হিন্দি-সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে পশ্চিমবাংলায় একটা নতুন বাঙালি জাতীয়তাবাদ উচ্চে তুলে ধরেছেন গেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

মমতার এই বিপুল বিজয়ে লক্ষ করার মতো আরেকটা বিষয় হলো, পর পর দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই যে ‘সরকারবিরোধী’ ভোট তৃণমূলের বিপক্ষে যেতে পারত সেটা ঘটেনি। সম্ভবত এক্ষেত্রেও মমতার ‘বাঙালি কার্ড’ আর বামফ্রন্ট-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটের রাজনৈতিক ব্যর্থতা যুগপৎভাবে কাজ করেছে। এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের টানা তৃতীয় দফায় সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হলো পশ্চিমবঙ্গে। তবে, মমতার বিজয়ে সবচেয়ে বড় যে আশাবাদের সঞ্চার হয়েছে সেটা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে বাঙালিদের ঘুরে দাঁড়ানোর বার্তা। বাংলাদেশের নিকটতম ও বৃহত্তম প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বহু সংকট রয়েছে। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামসহ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর সংস্কৃতি-রাজনীতিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। তিস্তাচুক্তি নিয়ে সংকটের কারণে বাংলাদেশে মমতাবিরোধী মনোভাব থাকলেও মমতার বিজয়ে দেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে সেটা লক্ষ করবার মতো। অর্থাৎ এখানেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিবেচনাকে আগে স্থান দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মতোই পুরো ভারতে এবং বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পরাস্ত হবে এটাই কাম্য।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত