ইতিপূর্বে আলুর চাষ কিছু কিছু অঞ্চলে হলেও এর চাহিদা ও ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় দিন দিন উৎপাদন বাড়ছে। মূলত সবজি হিসেবে তরকারির তালিকায় আলুর ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একজন মানুষ বছরে ২৩ কেজি আলু খায়। শুধু খাওয়াই নয়, আলু প্রক্রিয়াজাত করে নানা পণ্য উৎপাদনও করছে। তবে দেশে আলু প্রক্রিয়াজাতকরণ হলেও এ পরিসর সীমিত। যা আরও বাড়ানো উচিত। এ জন্য সরকারের সঠিক পরিকল্পনা, পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো হলে আলুর বহুবিধ ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। মাত্র ক’বছর আগেও আলুর উৎপাদন কম ছিল। অথচ এখন তরতর করে উৎপাদন বাড়ছে। প্রতি বছরই ৮০/৯০ লাখ টন করে আলু উৎপাদন হলেও এ বছর এক কোাটি টন ছাড়িয়েছে। মূলত কমদামি সবজির মধ্যে আলু অন্যতম। যে কারণে এর ব্যবহারও বেশি। টানা ক’বছর ধরে চাষিরা আলুর ভালো দাম পাচ্ছে। কিন্তু গত বছর কল্পনাতীত দাম বেশি পেয়েছে। ফলে এ বছর আলুর ব্যাপক উৎপাদন হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের দেশে কোনো ফসলের বাড়তি ফলন হলেই কৃষকের বিপদের সীমা থাকে না। সংরক্ষণের অভাবে ক্ষেতেই কম দামে আলু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয় চাষিরা। এরই মধ্যে গোটা দেশের ৩৯২টি হিমাগার ভর্তি হয়ে গেছে। আর হিমাগারে মোট আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব ২২ লাখ টন। অর্থাৎ মাত্র ৫ ভাগের এক ভাগ আলু হিমাগারে সংরক্ষণ হয়, বাকি চার ভাগ আলু হিমাগারের বাইরে থাকে। এ বছর কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর অঞ্চলে আলুর ব্যাপক চাষ হয়েছে এবং ফলনও ভালো হয়েছে। ইতিমধ্যেই কুড়িগ্রামের ৪টি হিমাগারের সব ক’টিই ভর্তি হয়েছে। আর দিনাজপুরের সাত উপজেলায় একমাত্র ফুলবাড়ী হিমাগার। সেখানে মাত্র ১ লাখ ৫৬ হাজার বস্তা সংরক্ষণ করা সম্ভব। অথচ আলু উৎপাদন হয়েছে ৩ লাখ ৯ হাজার ৩০৭ মেট্রিক টন। ফলে আলু চাষিরা সংরক্ষণের অভাবে ক্ষেতেই আলু বিক্রি করায় লোকসানে পড়েছে। এ জন্য উৎপাদনের পাশাপাশি হিমাগারও স্থাপন করা উচিত। যেহেতু আমাদের দেশে ফসল চাষাবাদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না, সে কারণে উদ্যোক্তারা হিমাগার স্থাপনের ঝুঁকি নিতে চান না। যদি ফলন বিপর্যয়ের কারণে হিমাগারের ব্যবসায় মন্দা যায়, এ শঙ্কা থেকেই উদ্যোক্তা পর্যায়ে হিমাগার স্থাপনের আগ্রহ কম। এ জন্য সরকারিভাবে সবজি সংরক্ষণ উপযোগী হিমাগার স্থাপন করা জরুরি।
আলু উৎপাদনে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে চীন, ভারত, রাশিয়া, ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি। অথচ গত ১০ বছর আগেও বাংলাদেশের নাম আলু উৎপাদনকারী ২০ দেশের তালিকার মধ্যে ছিল না। আর এখন কোটি টনের ওপর আলু উৎপাদন করে বিশ্বের আলু উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় সপ্তম স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। আলু চাষিদের নিরন্তর প্রচেষ্টা, ঐকান্তিকতা, কৃষি বিজ্ঞানী ও কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন ঈর্ষণীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জোরদারকরণ প্রকল্পের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতি বছরই আলুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় মানসম্মত আলু সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশীয় চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করাও সম্ভব। আলুর মানকে নিশ্চিত করতে হলে কৃষি বিভাগকে সহযোগিতা করতে হবে বলে আমরা মনে করি। সংরক্ষণের অভাবে বিপুল পরিমাণ আলু প্রতি বছরই নষ্ট হয়ে যায়। বাস্তবতা হচ্ছে, মোট উৎপাদনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ আলু এখন হিমাগারে সংরক্ষণ করার মতো হিমাগার রয়েছে। বাকি আলু কৃষক ও ব্যবসায়ী পর্যায়ে সংরক্ষণ করা হয়। আবার সংরক্ষণ উপযোগী আলু ও জমি থেকে সংগ্রহ করা উচিত। অপরিপক্ব আলু কোনোভাবেই সংগ্রহ করা যাবে না। যেহেতু উৎপাদনের প্রায় ৭৫ ভাগ আলু হিমাগারের বাইরে সংরক্ষণ করতে হয়, সেহেতু কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উদ্ভাবিত অহিমায়িত ঘর ব্যবহার করে আলু গুদামজাত করা সম্ভব। এ পদ্ধতিতে খরচও অনেক কম। যেখানে হিমাগারে এক বস্তা আলু রাখার খরচ প্রায় বস্তাপ্রতি ৩০০ টাকা। সেখানে অহিমায়িত পদ্ধতিতে মাত্র বস্তাপ্রতি ৩০/৩৫ টাকা খরচে আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব। এ জন্য ছায়াযুক্ত স্থানে মাচার ওপর নির্মিত ঘরে টিনের ছাউনি দিয়ে চারদিকে বাঁশের বেড়া দিতে হবে। এই পদ্ধতিতে এক শতাংশ জমির ওপর নির্মিত ঘরের ধারণ ক্ষমতা প্রায় ১৪ থেকে ১৫ টন। এখন এই পদ্ধতির মাধ্যমে আলু সংরক্ষণ করতে পারলে আলু পচে নষ্ট যেমন হবে না, তেমনি চাষিরা ভালো দামে আলু বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবানও হতে পারবেন। আলু চাষিদের অনেক অর্থ, মেধা খরচ করেই তবে আলুর ভালো ফলন আনতে হয়। সেখানে সংরক্ষণের অভাবে জমিতে আলু বিক্রি করে দেওয়ার কারণে অনেক সময়ই আলু চাষিদের লোকসান গুনতে হয়। তবে আগ্রহ এবং কৌশল জানা থাকলে অত্যন্ত সহজ পদ্ধতির অহিমায়িত পদ্ধতিতে ৪ মাস পর্যন্ত আলু ভালোভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব।
আমাদের প্রধান খাদ্য যেমন ভাত, তেমনি বিশ্বের ৪০টি দেশের লোকদের অন্যতম খাদ্য আলু। আমাদেরও খাদ্যাভ্যাস বাড়াতে হবে। অনেকের ধারণা, আলুর কোনো পুষ্টিগুণ নেই এবং আলু খেলে ভুঁড়ি বাড়ে। এ ধারণা পুরোপুরি ভুল। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, আলুতে ভিটামিন-এ ও ভিটামিন-সি রয়েছে। চালে কিন্তু তা মোটেও নেই। এছাড়া আলুতে শর্করা, আমিষ, ক্যালসিয়াম, লৌহ আছেই। আবার আলুতে চর্বির পরিমাণও চালের থেকে কম এবং আটার পঞ্চমাংশ। ফলে আলু বেশি পরিমাণ খেলেও স্বাস্থ্যঝুঁকি হবে না।
প্রতিনিয়তই মানুষ বাড়ছে। মানুষ বাড়ার অর্থ হলো, খাদ্য চাহিদাও বাড়ছে। ফলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে। তাহলে চালের ওপর যেমন চাপ কমবে, তেমনি আলু উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে। অবশ্য কৃষি বিপণন অধিদপ্তর গত ১৬ মার্চ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে, ভাতের পর আলু এখন দেশের প্রধান খাদ্য। উক্ত প্রতিবেদনে খাদ্য হিসেবে আলুর ব্যবহারের এক চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২০১৬ সালে ৩৭ লাখ ৪১ হাজার টন আলুর ব্যবহার হলেও ২০২০ সালে এসে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৪৬ লাখ ১৪ হাজার টনে। পশু খাদ্যে ২০২০ সালে ১১ লাখ ৪৯ হাজার টন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ২ লাখ ৫৩০ টন ও রপ্তানি হয়েছে ৪৫ হাজার টন। অবশ্যই আলু উৎপাদনের তুলনায় প্রক্রিয়াজাত শিল্পে ব্যবহার ও রপ্তানি দু’টোর পরিমাণ কম। এক্ষেত্রে জরুরি হচ্ছে, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠান বাড়াতে হবে এবং বিশ্বের নানা দেশে রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি গোটা দেশেই হিমাগার নির্মাণ করে আলু সংরক্ষণের যে সংকট তা দূর করতে হবে। তাহলে আলুর উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পাবে।
লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক
