সচিবালয়ে পাঁচ ঘণ্টা হেনস্তার পর সাংবাদিক রোজিনা গ্রেপ্তার

আপডেট : ১৮ মে ২০২১, ০৩:৩১ এএম

সচিবালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তার পর করা এক মামলায় প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার কক্ষ থেকে ‘গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি সরানো ও মোবাইলে নথির ছবি তোলার’ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে গতকাল সোমবার রাতে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টে ওই মামলাটি করা হয়। মামলার বাদী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব শিব্বির আহমেদ ওসমানী।

তবে রোজিনা ইসলাম নথি সরানোর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তাকে আটক করার পর ‘নাজেহাল’ করা হয়েছে। তিনি সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা’ নিয়ে বেশকিছু আলোচিত প্রতিবেদন করেছেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ‘নিয়োগ দুর্নীতি’ নিয়েও তিনি প্রতিবেদন করেন।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের একান্ত সচিব মো. সাইফুল ইসলাম ভূঞার কক্ষে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রাখার পর গতকাল রাত সাড়ে ৮টার দিকে সাংবাদিক রোজিনাকে শাহবাগ থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। এর আগে সচিবালয়ে আটক অবস্থায় একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।

এদিকে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে সচিবালয়ে পাঁচ ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা এবং পরে শাহবাগ থানায় হস্তান্তরের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকরাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন। এছাড়া বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা নিউ ইয়র্কভিত্তিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে) এক টুইট বার্তায় রোজিনা ইসলামকে আটক এবং পুলিশের কাছে হস্তান্তরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

জানা গেছে, রোজিনা ইসলাম পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য গতকাল সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যান। সেখানে বেলা ৩টার দিকে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তাকে একটি কক্ষে আটক করেন। সচিবালয়ে কর্মরত সাংবাদিকরা তাকে আটকে রাখার খবর পেয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে ছুটে যান। যে কক্ষে রোজিনাকে রাখা হয়েছিল, ছয়জন নারী পুলিশ সদস্যকে সেখানে দেখা যায়। কক্ষের বাইরে আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। আসলে কী ঘটেছে জানতে উপস্থিত সাংবাদিকরা কয়েক দফা  স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব লোকমান হোসেন মিয়ার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি কথা বলতে চাননি।

আটক অবস্থায় রোজিনা ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘সচিবের সঙ্গে দেখা করতে আমি তার একান্ত সচিব সাইফুলের কক্ষে আসি। এরপর হঠাৎ করে পুলিশ ডেকে এনে আমাকে এই কক্ষে আটক করা হয়।’ আটকের পর তার দেহ তল্লাশি করা হয় জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘মিজান নামে এক পুলিশ সদস্য আমাকে নাজেহাল করেছে। এ দপ্তর থেকে কোনো ধরনের নথি আমি নিইনি।’

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রোজিনা অসুস্থ হয়ে পড়লে সচিবালয়ে কর্মরত সাংবাদিকরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার দাবি তোলেন। তবে কর্মকর্তারা তাতে সাড়া দেননি। পরে রাত সোয়া ৮টার দিকে পুলিশের কয়েকটি গাড়ি সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের (৩ নম্বর ভবন) নিচে এনে রাখা হয়। এরপর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চতুর্থ তলা থেকে রোজিনা ইসলামকে লিফটে করে নিচে নামিয়ে একটি সাদা রঙের গাড়িতে তুলে থানার দিকে রওনা হয় পুলিশ। রোজিনাকে কী অভিযোগে আটক করা হলোÑ তা সাংবাদিকরা জানতে চাইলে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা কোনো উত্তর দেননি। উপস্থিত সাংবাদিকরা এরপর আবারও সচিব লোকমান হোসেন মিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যান অভিযোগের বিষয়ে জানতে। তখনও তিনি কথা বলতে রাজি হননি। পরে রাত ৯টার দিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. মাইদুল ইসলাম প্রধান সাংবাদিকদের সামনে অভিযোগের বিষয়গুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘রোজিনা কাগজপত্র সরানোর সময় একজন অতিরিক্ত সচিব, পুলিশের একজন সদস্য দেখে তাকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন, এটা তিনি নিয়ে যেতে পারেন না। তখন পুলিশকে জানানোর পর মহিলা পুলিশ আসে। এখন তাকে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

রোজিনাকে শাহবাগ থানায় নেওয়ার পর তাকে ওসির কক্ষে রাখা হয়। অন্য সাংবাদিকদের সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। রোজিনাকে শাহবাগ থানায় নেওয়ার কিছুক্ষণ পর উপস্থিত সাংবাদিকরা বাইরে বসে বিক্ষোভ শুরু করেন। রাত ১০টার দিকে শাহবাগ থানার ওসির কক্ষ থেকে বেরিয়ে রোজিনার ছোট বোন সাবিনা পারভীন সুমী বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রোজিনা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।’

সাংবাদিক রোজিনাকে আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ থানার ওসি মামুনুর রশীদ গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা রজু হয়েছে। ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। আগামীকাল (আজ মঙ্গলবার) তাকে আদালতে পাঠানো হবে।’

নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের বিবৃতি : বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সিপিজে এক টুইট বার্তায় রোজিনা ইসলামকে আটক এবং পুলিশের কাছে হস্তান্তরের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাকে অবিলম্বে ছেড়ে দেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বিবৃতিতে রোজিনা ইসলামকে আটক রেখে পুলিশের কাছে হস্তান্তর ও তার বিরুদ্ধে মামলার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে তার মুক্তি দাবি করেছেন। গতকাল রাতে দলটির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ও সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে তিনি এ দাবি জানান।

এদিকে এ ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জিএম কাদের। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা করার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তার সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে তা লজ্জাজনক। স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সাংবাদিক রোজিনাকে আটক ও হেনস্তার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম ও সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। এছাড়া নিন্দা জানিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এক বিবৃতিতে বলেছে, বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে রোজিনা ইসলাম কাজ করছেন। তিনি তার প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়ম তুলে এনেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত