রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে বাড়ছে করোনা রোগী। পাশাপাশি প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যু। গত শনিবার দুপুর থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড ও আইসিইউতে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রামেক হাসপাতালে করোনা ইউনিটে এক দিনে এটিই সর্বোচ্চ মৃত্যু। এর আগের দিন শুক্রবার দুপুর থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় মারা যান ৭ জন। প্রতিদিনই ৮-১০ জনের মৃত্যু হচ্ছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ড ও আইসিইউতে। শেষ ছয় দিনে রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে মোট ৫১ জন।
রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার শামীম ইয়াজদানী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় যে ১২ জন মারা গেছে তাদের মধ্যে ৮ জনের করোনা পজিটিভ। বাকি চারজনের করোনা উপসর্গ ছিল। তাদের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পরীক্ষার আগেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যান।
রামেক হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস জানান, মারা যাওয়া ১২ জনের মধ্যে ৯ জনের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ। আর দুজনের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ী। বাকি একজনের বাড়ি নাটোর।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গতকাল দুপুর পর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিট ও আইসিইউতে ২০৪ রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। ভর্তি থাকা রোগীর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৯৩ জন, রাজশাহীর ৮৪ জন, নাটোরের ১০ জন, নওগাঁর ৭ জন, পাবনার ৩ জন, কুষ্টিয়ার ৩ জন।
এদিকে, সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি দিন দিন ভয়ংকর হচ্ছে। অবস্থার উন্নতি করতে হলে এখন রাজশাহীতে কঠোর লকডাউন দরকার।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রামেক হাসপাতালে গত ৬ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত করোনা ওয়ার্ড ও আইসিইউতে ১০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ঈদের আগে গত ৬ মে থেকে ১৩ মে পর্যন্ত এক সপ্তাহে মারা যান ২৫ জন। আর ঈদের পর থেকে গত দুই সপ্তাহে মৃত্যু হয়েছে ৭৭ জনের ।
এদের মধ্যে ঈদের আগে গত ৬ মে ২ জনের মৃত্যু হয়। ৭ মে মারা যায় ২ জন, ৮ মে মারা যায় ২ জন, ৯ মে মারা যায় ৫ জন, ১০ মে মারা যায় ২ জন, ১১ মে মারা যায় ৪ জন, ১২ মে মারা যায় ৬ জন ও ১৩ মে মারা যায় ২ জন।
ঈদের পর থেকেই পরিস্থিতির অবনতি হতে থাকে। গত ১৬ মে মৃত্যু হয় ১৬ জনের। ১৭ মে মারা যায় ৩ জন, ১৮ মে মারা যায় ৪ জন, ১৯ মে ২ জন, ২০ মে ৫ জন, ২১ মে ২ জন, ২২ মে মারা যায় ২ জন। এর পর থেকে দিন যত যাচ্ছে করোনার মৃত্যু আতঙ্কিত করে তুলছে মানুষকে। গত ২৩ মে রামেক হাসপাতালে মারা যান ৫ জন, ২৪ মে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১০ জন, ২৫ মে ৪ জন, ২৬ মে ৪ জন, ২৭ মে ৪ জন, ২৮ মে ৯ জন ও সর্বশেষ ২৯ মে মারা যান ৭ জন ।
হাসপাতালের উপপরিচালক সাইফুল ফেরদৌস বলেন, গত বছর করোনার তীব্রতর সময়ে হাসপাতালে সর্বোচ্চ ১৩৬ জন ভর্তি হয়েছিলেন। এ বছর ঈদের পর থেকে ক্রমাগত হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে বেশি চাপে পড়ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, মূলত ঈদের পর থেকে করোনা আক্রান্ত রোগী ও মৃত্যু বাড়তে থাকে। শেষ দুই সপ্তাহে এ হাসপাতালে যারা মারা গেছেন তাদের অর্ধেকেরও বেশি চাঁপাইনবাবগঞ্জের। আমাদের রোগীও বাড়ছে। বাড়তি রোগী নিয়ে আমরা জায়গা সঙ্কুলানও করতে পরছি না। হাসপাতাল পরিচালক বলেন, জায়গার অভাবে এখানে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া এখন খুবই কষ্টসাধ্য হয়েছে। সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এদিকে, করোনা রোগীর মৃত্যু, আক্রান্ত বেড়ে যাওয়ার পরও স্বাস্থ্যবিধি মানতে চলছে গড়িমসি। এ অবস্থায় প্রশাসনিক কঠোরতা দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী বলেন, ঈদের পর থেকে পরিস্থিতি খারাপই হচ্ছে, অথচ স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে উদাসীনতাও বাড়ছে। এ অবস্থায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিস্থিতি আমাদের জন্য উদ্বেগের। আবার সেখান থেকে অনেকেই চলে আসছে রাজশাহীতে। এটা ঠেকানো খুব দরকার। রাজশাহীর পরিস্থিতির উন্নতি করতে হলে রাজশাহীতেও বিশেষ লকডাউন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মুহাম্মদ শরিফুল হক বলেন, ঈদের আগে মানুষের চলাচল একটু বেশি হয়েছিল। এছাড়া রাজশাহীর পাশের জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের অবস্থা ভয়াবহ। সেজন্য বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানও নিয়মিত চলছে। আবার অর্থনৈতিক কার্যক্রমও কিন্তু কিছুটা চলতে হবে। আপাতত আমাদের যেগুলো বিধিনিষেধ আছে সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করছি। রাজশাহীতে যেন করোনার প্রকোপ বৃদ্ধি না পায় সেজন্য স্বাস্থ্য বিভাগও কাজ করছে।
