চট্টগ্রামে কয়েক দিন ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও গতকাল রবিবার সকালে শুরু হয় ভারী বর্ষণ। এর মধ্যে সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র এক ঘণ্টায় ১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস। এতে বন্দরনগরীর বিস্তীর্ণ এলাকায় দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। ডুবে যায় দেশের বৃহৎ ভোগ্যপণ্যের পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ। এরপর বাজারের ব্যবসায়ীরা মালামাল নিরাপদ স্থানে সরাতে থাকেন। এরই মধ্যে বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি মিলে বিকেলে আরেক দফা ডুবে যায় পাইকারি বাজারটি।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, গুদাম ও দোকানে বৃষ্টির পানি ঢোকায় মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে। বাজারে প্রবেশের প্রধান সড়ক জোয়ারের পানিতে ডুবে থাকায় যানবাহন আসতে পারছে না। এতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও তাদের দুর্ভোগ দেখার কোনো ‘অভিভাবক’ নেই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সুøইসগেটের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ, চাক্তাই খাল আবর্জনামুক্ত ও কর্ণফুলী নদীতে ড্রেজিংয়ের দাবি জানান তারা।
কর্ণফুলী নদী এবং চাক্তাই খালের পাশেই চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ বাজারের অবস্থান। পতেঙ্গা অফিসের আবহাওয়াবিদ ড. শহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, আজ (গতকাল) সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে তারা ৯৮ দশমিক ০৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছেন। এর মধ্যে সকাল ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত এক ঘণ্টায় ১১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী দুদিন বৃষ্টিপাতের এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। এতেই চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি যুক্ত হয়ে গতকাল নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক ও অলিগলি তলিয়ে যায়। এর মধ্যে নগরীর চকবাজার, বাদুরতলা, কার্পাসগোলা, ষোলশহর, প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, বহদ্দারহাট মোড়, ফরিদার পাড়া, মোগলটুলি, আগ্রাবাদ, ট্রাঙ্ক রোড, বাকলিয়া ডিসি রোড, তালতলা, জিইসি মোড়, চান্দগাঁও, খতিবের হাট, সিঅ্যান্ডবি কলোনি, নাসিরাবাদ হাউজিং সোসাইটি, আগ্রাবাদ, বিবিরহাট এলাকা, কাতালগঞ্জ, শুলকবহর, হালিশহর, ঈদগাহসহ বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরপানি দেখা দেয়। সড়কের পাশাপাশি অলিগলি, নিচু এলাকার বাসাবাড়ি ও দোকানে পানি ঢুকে পড়ে। নগরীর ৪১ নম্বর ওয়ার্ডের নিম্নাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়। এমনকি এবার নগরীর কিছু উঁচু এলাকায়ও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে দিনভর চরম দুর্ভোগ পোহায় নগরবাসী। চকবাজারের বাসিন্দা সাবের আহমদ বলেন, ‘আগে বৃষ্টি হলে পানি উঠে একটু পর নেমে যেত। কিন্তু এবার সকালের জমা পানি বিকেলেও কমেনি। আশপাশের নালাগুলো বন্ধ থাকায় এমন হচ্ছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জোয়ার ও ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কাঁচাপণ্য ও চালের আড়ত। লাখ লাখ টাকার মালামাল নষ্টের শঙ্কা রয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে ইতিমধ্যে দেশের অনেক শিল্প গ্রুপ চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ থেকে তাদের প্রধান অফিস সরিয়ে নিয়েছে। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।
সামান্য বৃষ্টি এবং অমাবস্যা-পূর্ণিমাসহ অন্যান্য সময়ে জোয়ারের পানিতে নতুন চাক্তাই, মধ্যম চাক্তাই, পুরনো চাক্তাই ও আছাদগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে হাঁটুপানি দেখা দেয়। খাতুনগঞ্জের বাদশা মার্কেট, আমির মার্কেট, নবী মার্কেট, চাক্তাই মসজিদ গলি, ইলিয়াছ মার্কেট ও চাক্তাই চালপট্টির সামনের সড়কও ডুবে যায়। সারা বছরই জোয়ারের পানি দোকান ও গুদামে প্রবেশ করে। পণ্য ভিজে নষ্ট হয়।
খাতুনগঞ্জের স্থায়ী বাসিন্দা শুভজিৎ ঘোষ বলেন, ‘সকালে অফিসে যাওয়ার সময় পানি ছিল না। বিকেলে সড়কের পানি মাড়িয়ে বাসায় ফিরেছি। এ এলাকায় জলাবদ্ধতা ও জোয়ারের পানির অভিশাপ থেকে কবে মুক্তি মিলবে, জানি না।’
গতকাল সরেজমিনে খাতুনগঞ্জ, আছাদগঞ্জ ও চাক্তাই ঘুরে দেখা গেছে, দোকানের কর্মচারী ও শ্রমিকরা পণ্যসামগ্রী নিরাপদ স্থানে সরাতে ব্যস্ত। খাতুনগঞ্জের কাঁচাপণ্যের আড়ত হামিদুল্লাহ মিয়া মার্কেটের সাধারণ সম্পাদক হাজি মো. ইদ্রিস আলী বলেন, ‘জোয়ারের পানি আড়তে আসা শুরু করেছে। মালামাল উঁচু স্থানে নিচ্ছি। জোয়ারের পানি থেকে বাঁচতে দুই ফিটের বেশি উঁচু করেছি। কিন্তু প্রতি বছর পানির উচ্চতাও বাড়ছে। আদা, রসুন, পেঁয়াজ ভিজলে পচে যায়। ভারী বর্ষণে ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।’
চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকাল সাড়ে ১০টায় বাজার ডুবে যায়। এরপর বিকেলে জোয়ারের পানিতে ফের ডুবে গেলে গুদামের অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। জানি না এ বছর কত কোটি টাকা লোকসান গুনতে হবে?’ তিনি আরও বলেন, ‘সিডিএর সøুইসগেটের নির্মাণকাজ প্রায় চার বছর চলছে। কবে শেষ হবে, কেউই জানে না। চাক্তাই খালের মোহনা বন্ধ, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। এ জন্য সব পানি বাজারে ঢুকছে। সামান্য বৃষ্টিতে ত্রাহি অবস্থা, টানা বর্ষণে কী হবে, ভাবছি।’
খাতুনগঞ্জ ট্রেড ও ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ছগীর আহমদ বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রী এত টাকা দিলেন। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের অগ্রগতির সুফল আমরা পাচ্ছি না। চাক্তাই খাল আবর্জনায় পূর্ণ। পানি যাওয়ার কোনো পথ নেই। আসলে চট্টগ্রাম শহরের ‘মা-বাবা’ নেই। থাকলে এ অবস্থা হতো না। ভারী বর্ষণ দুদিন চললে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ পুরোপুরি পানিতে ডুবে যাবে।’
এ বিষয়ে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী রাজিব দাশের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তা বন্ধ পাওয়া গেছে।
