রাজধানী ঢাকার বাইরে শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে করোনায় শনাক্ত ও মৃত্যুর হার দুটোই বাড়ছে। বিশেষ করে ভারত সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে কঠোর বিধিনিষেধ ও লকডাউন দিয়েও থামানো যাচ্ছে না সংক্রমণ। দিন যত যাচ্ছে, সংক্রমণ ও মৃত্যু ততই বাড়ছে খুলনা ও রাজশাহী বিভাগের কয়েকটি জেলায়। খুলনা বিভাগে সবশেষ ২৪ ঘণ্টার তথ্য অনুযায়ী করোনা আক্রান্ত হয়ে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৭৬৫ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সীমান্তবর্তী কয়েকটি জায়গায় লকডাউনের মেয়াদ আরও বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে বাড়তি রোগীর চাপে বেশি সংক্রমিত জেলার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবাও ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। খুলনা, রাজশাহী, যশোর ও ফরিদপুরের হাসপাতালগুলোতে করোনা চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত শয্যার চেয়ে অনেক বেশি রোগী ভর্তি আছেন। কোথাও কোথাও আবার শুধু সংকটাপন্ন রোগীদেরই হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া হচ্ছে। বিস্তারিত দেশ রূপান্তরের সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদকদের পাঠানো খবরে :
খুলনা : এ বিভাগে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় করোনা আক্রান্ত হয়ে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ৭৬৫ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া সুস্থ হয়েছেন আরও ২৮১ জন। গতকাল দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক রাশেদা সুলতানা এসব তথ্য দিয়েছেন।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় খুলনায় ৪, কুষ্টিয়ায় ৪, যশোরে ৩, চুয়াডাঙ্গায় ২, মেহেরপুরে ২, বাগেরহাটে ১, মাগুরায় ১ ও ঝিনাইদহে একজন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খুলনায় ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত হয়েছেন ১৮১ জন। এছাড়া একই সময়ে বাগেরহাটে ৫২, সাতক্ষীরায় ৮৮, যশোরে ২০৩, ঝিনাইদহে ৩১, মাগুরায় ১১, নড়াইলে ৩৮, কুষ্টিয়ায় ৭৩, চুয়াডাঙ্গায় ৫৯ ও মেহেরপুরে ১৯ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।
রামেকে আরও ১০ মৃত্যু : রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে এক দিনে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার সকাল থেকে গতকাল সকালের মধ্যে তাদের মৃত্যু হয়। এদের মধ্যে তিনজন করোনা পজিটিভ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। করোনা উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন সাতজন। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, করোনা শনাক্ত হয়ে মৃতদের মধ্যে একজনের বাড়ি রাজশাহী, একজন চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং একজনের বাড়ি নওগাঁয়। উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া সাতজনের মধ্যে ছয়জন রাজশাহীর ও একজন নাটোরের। ১ থেকে ১৭ জুন সকাল পর্যন্ত এ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে মারা গেলেন ১৭১ জন। এর মধ্যে ৯৬ জন মারা গেছেন করোনা শনাক্ত হওয়ার পর। বাকিরা উপসর্গ নিয়ে মারা যান।
রামেক হাসপাতালের করোনা ইউনিটে ৩০৯ শয্যার বিপরীতে গতকাল সকালে রোগী ভর্তি ছিলেন ৩৫৮ জন। এর মধ্যে করোনা পজিটিভ রোগীর সংখ্যা ১৬৪ জন। করোনা সন্দেহে চিকিৎসা চলছে ১৫৮ জনের। এখানকার আইসিইউর ২০টি বেডের সবকটিতেই রোগী ভর্তি রয়েছেন। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় করোনা ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন ৪৪ জন। এর মধ্যে রাজশাহীর ২৬, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৭, নাটোরের ৪, নওগাঁর ৪, মেহেরপুরের ২ এবং চুয়াডাঙ্গার ১ জন।
এদিকে করোনা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি না হওয়ায় রাজশাহীর ‘লকডাউন’ আরও এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে। গতকাল মধ্যরাতে এক সপ্তাহের ‘লকডাউন’ শেষ হওয়ার কথা ছিল। গত বুধবার রাতে জেলা প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ‘লকডাউন’ আরও সাত দিন বাড়ানোর ঘোষণা দেয়।
পঞ্চগড়ে এক দিনে সর্বোচ্চ ১২ জনের করোনা শনাক্ত : দেশে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ে এক দিনে সর্বোচ্চ ১২ জনের করোনা শনাক্তের নতুন রেকর্ড হয়েছে। পঞ্চগড়ের সদ্যবিদায়ী জেলা প্রশাসক ড. সাবিনা ইয়াসমিনের ছেলেসহ সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১২ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৫, আটোয়ারীতে ৪, বোদায় ১ এবং দেবীগঞ্জে ২ জনের করোনা শনাক্ত হয়। সিভিল সার্জন ডা. মো. ফজলুর রহমান এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ৪৪টি নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে করোনা শনাক্তের হার ২৭ দশমিক ২৭ শতাংশ। এটি এ বছরের এক দিনে সর্বোচ্চ করোনা শনাক্ত। চলতি বছর এ পর্যন্ত ১০৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের গত বৃহস্পতিবার এ বছরের সর্বোচ্চ সাতজনের করোনা শনাক্তের পর নমুনা সংগ্রহ বাড়তে থাকে। সে হিসাবে আক্রান্তের হারও বৃদ্ধি পায়।
জামালপুরে ২৪ ঘণ্টায় শনাক্ত ৪২ : জামালপুরে বেড়েই চলছে করোনা সংক্রমণ। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় জামালপুরে নতুন করে শনাক্ত হয়েছে ৪২ জনের। সংক্রমণ ঠেকাতে জামালপুর পৌর এলাকায় গত ১৪ জুন থেকে ‘লকডাউন’ চলছে।
সিভিল সার্জন ডা. প্রণয় কান্তি দাস জানিয়েছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭৬টি নমুনা পরীক্ষায় ৪২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ২৩.৮৬ শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে ৩৬ জন জামালপুর সদরের। এছাড়াও সরিষাবাড়ীতে ২, বকশীগঞ্জে ১, মাদারগঞ্জে ১ ও মেলান্দহের ২ জনের করোনা শনাক্ত হয়।
২৪ ঘণ্টায় দিনাজপুর সদরে ৩ জনের মৃত্যু : কঠোর ‘লকডাউন’ ঘোষণার পরও দিনাজপুর সদর উপজেলায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে করোনা পজিটিভ হয়েছেন ২৭৫ জন। এর মধ্যে শুধু দিনাজপুর সদর উপজেলায় পজিটিভ এসেছে ১৯০ জনের। একই সময়ে দিনাজপুর সদরে করোনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন শহরের পাহাড়পুর ইকবাল স্কুল মোড়ের মো. আলম (৪৫), পুলহাট রূপম মোড়ের হাসনা বানু (৫৫) ও সিপাহিপাড়ার তমিজ উদ্দীন আহমেদ (৮২)।
দিনাজপুরের সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ৭৪৪টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ২৭৫ জনের নমুনা পজিটিভ পাওয়া যায়, যা আক্রান্তের হার হিসাবে ৩৭ শতাংশ। গতকাল ছিল কঠোর ‘লকডাউনের’ তৃতীয় দিন।
দিনাজপুরের সিভিল সার্জন ও জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব ডা. আবদুল কুদ্দুস জানান, কয়েক দিন ধরে সদরে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক সদর উপজেলায় প্রবেশের সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
যশোরে নতুন শনাক্ত ২০৩ : যশোরে বুধবার সকাল থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত নতুন করে ২০৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছেন চারজন। শনাক্তের হার ৪২ শতাংশ। ইতিমধ্যে যশোর জেনারেল হাসপাতালের ৮০ শয্যার করোনা ডেডিকেটেড ইউনিট পূর্ণ হয়ে গেছে। সেখানে ৯১ জন ভর্তি রয়েছেন। আইসোলেশন ওয়ার্ডের চিত্রও একই। রোগীর চাপ সামাল দিতে নতুন ওয়ার্ড খোলার পাশাপাশি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসা কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিভিল সার্জন শেখ আবু শাহীন।
তিনি আরও জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যসেবা বৃদ্ধি করতে নতুন করে যশোর জেনারেল হাসপাতালে ২৪ শয্যার আরেকটি ওয়ার্ড প্রস্তুত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সেই সঙ্গে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সাজেদা ফাউন্ডেশনের অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিয়েও চিকিৎসা কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানো হয়েছে।
সাতক্ষীরায় ‘লকডাউন’ বাড়ল এক সপ্তাহ : মৃত্যু ও সংক্রমণ বাড়ায় সাতক্ষীরায় তৃতীয় ধাপে বাড়ল আরও এক সপ্তাহের ‘লকডাউন’। জেলায় জুন মাসে করোনা শনাক্ত এক হাজার ছাড়িয়েছে। এ মাসের প্রথম ১৭ দিনে ২ হাজার ১৬০টি নমুনা পরীক্ষা করে ১ হাজার ৮১ জনের করোনা শনাক্ত হয়। গড় শনাক্ত হার ৫০ দশমিক ০৫ শতাংশ। এ সময়ে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আটজন এবং সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে মারা গেছেন ৪৬ জন। এসব তথ্য জানিয়েছেন সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য কর্মকর্তা ডা. জয়ন্ত সরকার।
মোংলায় আরও ৭ দিন বাড়ল কঠোর বিধিনিষেধ : বাগেরহাটে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় (গত বুধবার ভোর ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত) করোনায় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া নমুনা পরীক্ষায় আরও ৫২ জনের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ১০৭টি নমুনা পরীক্ষায় ৫২ জন শনাক্ত হন। সংক্রমণের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। যা গতদিনের তুলনায় ১৪ শতাংশ বেশি। জেলার সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মোংলার ৩০টি নমুনা পরীক্ষায় ১৪ জনের সংক্রমণ ধরা পড়ে। হার ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। যা আগের ২৪ ঘণ্টার তুলনায় ১৯ শতাংশ কম।
জেলার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মোংলা উপজেলায় তৃতীয় দফায় আরও সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে প্রশাসন। তবে কঠোর বিধিনিষেধ ও স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের চলাফেরা বেড়েছে।
নোয়াখালী পৌরসভা ও ৬ ইউনিয়নে ফের ৭ দিনের ‘লকডাউন’ : নোয়াখালীতে করোনার প্রকোপ না কমায় নোয়াখালী পৌরসভা ও ছয়টি ইউনিয়নে চলমান ‘লকডাউন’ আরও এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টায় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। জেলা প্রশাসক ও করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জানান, করোনার প্রকোপ না কমায় চলমান ‘লকডাউন’ দ্বিতীয় দফায় আরও সাত দিন বর্ধিত করা হয়েছে। ২৫ জুন রাত ১২টা পর্যন্ত ‘লকডাউন’ কার্যকর থাকবে।
নোয়াখালীতে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে সদর উপজেলা ও বেগমগঞ্জে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৯ জনে। মৃত্যুর হার ১ দশমিক ২৯ শতাংশ। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় নতুন করে আরও ১০১ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার ২৫ দশমিক ৭০ শতাংশ।
হিলিতে তৃতীয় দিনের মতো চলছে কঠোর বিধিনিষেধ : দিনাজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকা হাকিমপুরের হিলিতে করোনার সংক্রমণের হার বেড়ে যাওয়ায় গতকাল তৃতীয় দিনের মতো চলেছে কঠোর বিধিনিষেধ।
