দেশে করোনা সংক্রমণের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মৃত্যুও বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রোগটিতে ৮২ জনের মৃত্যু হয়। এ সংখ্যা গত ৫২ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর আগে গত ৫ এপ্রিল সর্বোচ্চ ৮৮ জন মারা গিয়েছিলেন। এমনকি গত ২৫ দিনে মৃত্যু ৫ গুণ বেড়েছে।
মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ দেখা দেয়। এপ্রিল থেকে সংক্রমণের সঙ্গে মৃত্যুও বাড়তে থাকে। ১ এপ্রিল যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৫৯ জন; সেখানে মাত্র ১৯ দিনে অর্থাৎ গত ১৯ এপ্রিল সর্বোচ্চ ১১২ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এর আগে গত বছর প্রথম ঢেউয়ের সময় সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল ৬৪ জন। এরপর মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমতে থাকে। সর্বশেষ গত ২৬ মে এ বছরের সর্বনি¤œ ১৭ জনের মৃত্যু হয়। কিন্তু তার পর থেকেই মৃত্যু বাড়তে থাকে। পরে গত ২৪ ঘণ্টায় ৫২ দিনের রেকর্ড ভেঙে মৃত্যু ৮২-তে পৌঁছায়।
এমন অবস্থায় সামনের দিনগুলোতে মৃত্যু আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই মৃত্যুটা তিন সপ্তাহ আগে যে সংক্রমণের সংখ্যা, সেটার সঙ্গে আনুপাতিক হার। সংক্রমণ যেহেতু বাড়ছে, মৃত্যুটাও বাড়ার আশঙ্কা আছে। তিন সপ্তাহ আগের যে সংক্রমণ, এখনকার মৃত্যুর সংখ্যাটা সেটার আনুপাতিক হার। এখন সংক্রমণ তো বাড়ছে। তার মানে সামনে মৃত্যুও আরও বাড়বে।
মৃত্যু কমাতে হলে আগে সংক্রমণ কমাতে হবে। এখন সংক্রমণ হার ২০ শতাংশের ওপরে যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৪ হাজার করে রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এখন সারা দেশে দুই সপ্তাহের জন্য যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। তা না হলে সামনের কোরবানির ঈদের সময় সংক্রমণের বিস্ফোরণ হবে।
মে’র শেষ সপ্তাহ থেকে মৃত্যুর ঊর্ধ্বগতি : গত মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে প্রতিদিনই মৃত্যু বাড়ছে। সর্বশেষ গত ২৬ মে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। গত ২৫ দিনে তা ৫ গুণ বেড়েছে। এমনকি গত ১০ দিনের মধ্যে গড়ে মৃত্যুর সংখ্যা ৪০-৫০ জনের মধ্যেই ছিল। সর্বশেষ গতকাল তা বাড়তে বাড়তে ৮২ জনে পৌঁছায়।
বাড়ছে শনাক্ত হার : গত বছরের মার্চে দেশে প্রথম করোনা শনাক্তের পর প্রথম ঢেউ স্থায়ী ছিল প্রায় এক বছর। প্রথম ঢেউয়ের সংক্রমণ কমে সর্বনি¤œ অবস্থায় আসে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। ওই মাসে শনাক্ত হার সর্বনি¤œ ২ শতাংশে নামে। একই সঙ্গে দৈনিক রোগী শনাক্ত ৫০০-এর নিচে এবং মৃত্যু ১০ জনে নেমে আসে। কিন্তু মার্চ থেকে আবার সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়। সেই ঢেউ চূড়ায় ওঠে গত এপ্রিলের মাঝামাঝিতে। শনাক্ত হার বেড়ে ২৩ শতাংশ ছাড়ানোর পাশাপাশি দৈনিক রোগী শনাক্ত রেকর্ড সাড়ে সাত হাজার ছাড়ায় এবং মৃত্যু ১০০ ছাড়িয়ে যায়। এপ্রিলের শেষ ভাগ থেকে সংক্রমণ আবার কমতে শুরু করে। টানা প্রায় এক মাস ধরে কমতে কমতে গত ১৫ মে শনাক্ত হার সর্বনি¤œ ৬ শতাংশে নামে। একই সময় দৈনিক শনাক্ত হাজারের নিচে এবং মৃত্যু ২০-এর নিচে নেমে আসে। কিন্তু রাজশাহী ও খুলনাসহ দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়াতে শুরু করলে দ্বিতীয় ঢেউয়ের নি¤œগতি আবার ঊর্ধ্বগতিতে মোড় নেয়। গত এক মাস ধরে সংক্রমণ আবার বাড়ছে। তবে গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ বাড়ছে লাফিয়ে। গত ৯ দিনে শনাক্ত হার ১৪ শতাংশ থেকে বেড়ে আবার ১৬ শতাংশে উঠেছে। এর মধ্যে গত ১৮ জুন শনাক্ত ১৯ শতাংশ হয়েছিল।
বেশি মারা গেছে ঢাকা বিভাগে : গতকাল পর্যন্ত দেশে করোনায় মোট মৃত্যু হয়েছে ১৩ হাজার ৫৪৮ জনের। এর মধ্যে বেশি মারা গেছে ঢাকা বিভাগে, মোট মৃত্যুর ৫৪ শতাংশ। এরপর সর্বোচ্চ মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে ১৯ শতাংশ। সবচেয়ে কম মারা গেছে ময়মনসিংহে, ২ শতাংশ।
ষাটোর্ধ্বদের মৃত্যু বেশি : বয়স অনুপাতে সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষ। এদের সংখ্যা মোট মৃত্যুর ৫৬ শতাংশের বেশি। এরপর বেশি মারা গেছেন ৫১-৬০ বছরের ২৪ শতাংশ; ৪১-৫০ বছরের ১১ শতাংশ, ৩১-৪০ বছরের ৫ শতাংশ, ২১-৩০ বছরের ২ শতাংশ মানুষ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য : গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ হাজার ৬৪১ জনের শরীরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এর ফলে শনাক্ত কভিড রোগীর সংখ্যা পেরিয়ে গেল সাড়ে ৮ লাখ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, নতুন রোগীদের নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৫১ হাজার ৬৬৮ জনে। শনাক্ত হওয়া নতুন রোগীদের মধ্যে ২ হাজারই ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের বাসিন্দা। আর মারা যাওয়া ৮২ জনের মধ্যে ৩২ জনই খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলার।
সরকারি হিসাবে এক দিনে আরও ২ হাজার ৫০৯ জন সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এ পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছেন ৭ লাখ ৮২ হাজার ৬৫৫ জন।
