চলে গেলেন খ্যাতিমান প্রকাশক মহিউদ্দিন আহমেদ। গত সোমবার রাত ১টার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)’-এর প্রতিষ্ঠাতা মহিউদ্দিন আহমেদ দেশের বইয়ের বাজারকে আন্তর্জাতিক পরিসরে ছড়িয়ে দিতে বিশেষ অবদান রেখেছেন। গতকাল বুধবার জোহরের নামাজের পর গুলশানের আজাদ মসজিদে জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
মহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
‘ইমেরিটাস প্রকাশক’ পদবিপ্রাপ্ত এ প্রকাশক দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন তার মেয়ে মাহরুখ মহিউদ্দিন। কিছুদিন ধরে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। প্রায় ২০ বছর ধরে পারকিনসন্সসহ বেশ কিছু বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন মহিউদ্দিন। কিছুদিন আগে তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে পরে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন।
ইউপিএলের পরিচালক ও মহিউদ্দিন আহমেদের মেয়ে মাহরুখ মহিউদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। সে স্বপ্নগুলো পূরণে আমরা জোর দিতে চাই। একটি স্মরণসভার আয়োজন করার ব্যাপারেও আমরা চেষ্টা করব। তবে সেটি করোনা পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।’
বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রকাশনার ভাবমূর্তিটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরেছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ। আমাদের সংগঠনের গোড়াপত্তনের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন এবং দীর্ঘদিন সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন। তাকে দেখেই অনেকে সৃজনশীল প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।’
মহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুতে শোক জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলা একাডেমি, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণসংহতি আন্দোলন, জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি, পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি, থিয়েটার বিষয়ক পত্রিকা ‘ক্ষ্যাপা’সহ বিভিন্ন সংগঠন।
১৯৪৪ সালে ফেনীর পরশুরামে জন্মগ্রহণ করেন মহিউদ্দিন আহমেদ। নটর ডেম কলেজে পড়ার সময়ে তিনি ‘বল্গু অ্যান্ড গোল্ড’ নামের কলেজ ম্যাগাজিনের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। উচ্চ মাধ্যমিক শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করেন। পরে পাকিস্তান কাউন্সিল স্কলারশিপ নিয়ে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়তে যান। স্নাতকোত্তর শেষে তিনি পাকিস্তান টাইমসে শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন।
মহিউদ্দিন আহমেদ অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসের (ওইউপি) পাকিস্তান শাখার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে দুই বছর ওইউপি ঢাকা শাখার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫ সালে ওইউপির ঢাকা কার্যালয় বন্ধ হয়ে গেলে মহিউদ্দিন আহমেদকে করাচি শাখায় ‘এডিটর-অ্যাট-লার্জ’ বা রোভিং এডিটর পদে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে তিনি দেশে নিজের প্রকাশনা সংস্থা ‘ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করেন। ইউপিএল প্রধানত পাঠ্যবই ও গবেষণাধর্মী বই প্রকাশ করে। বাংলাদেশি লেখক ছাড়াও বিশ্বের নানা দেশের প্রখ্যাত লেখক ও শিক্ষাবিদদের বই প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
১৯৮৮ সালে অ্যারিজোনার বেনসনে অবস্থিত ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি’র আন্তর্জাতিক কার্যালয় থেকে মহিউদ্দিন আহমেদকে ‘পাবলিশিং ম্যানেজমেন্ট’ বিষয়ে ‘কালচারাল ডক্টরেট’ ডিগ্রি দেওয়া হয়। তার নেতৃত্বে ১৯৮১ সাল থেকে মোট ১৬ বার ‘জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র’ পুরস্কার লাভ করে ইউপিএল। প্রকাশনায় অনন্য অবদান রাখার কারণে তাকে ১৯৯১ সালে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র স্বর্ণপদকে ভূষিত করা হয়।
২০১২ সালে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রকাশ করেন মহিউদ্দিন আহমেদ। বাংলা ভাষার পাশাপাশি ভারত (পেঙ্গুইন) ও পাকিস্তানে (ওইউপি) ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় বইটি প্রকাশের ব্যবস্থাও করেন তিনি। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ‘জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি’ থেকে তাকে ‘ইমেরিটাস প্রকাশক’ পদবি দেওয়া হয়। প্রকাশনার পাশাপাশি মহিউদ্দিন আহমেদ নিজে লেখালেখিও করেছেন। ইউপিএল থেকে প্রকাশিত সমকালীন গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধের সংকলনও সম্পাদনা করেছেন তিনি।
