ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম চার উপাচার্য

আপডেট : ৩০ জুন ২০২১, ১১:০১ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। নানা চড়াই-উতরাই পার করে এখনকার অবস্থানে এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা পালন করেছেন অনেক শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও প্রশাসক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম চার উপাচার্যকে নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা

স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ

১৯২০ সালের জুন মাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির প্রাক্কালে ইংল্যান্ডের শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা জে ই ফারার্ড উপাচার্য হওয়ার প্রস্তাব পাঠান স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগের কাছে। উপাচার্যের মাসিক বেতন চার হাজার টাকা। ব্যক্তিগত যানবাহন সুবিধা না থাকলেও আছে বাসভবন সুবিধা। ঢাকা থেকে লন্ডন যাতায়াতের জন্য প্রথম শ্রেণির স্টিমার-ট্রেন ভাড়া পাবেন, মেয়াদ শেষে পাবেন প্রত্যাবর্তন ভাতাও। অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর বাঙালিদের জন্য নির্মিত বিশ্ববিদ্যালয় বলে সুযোগ-সুবিধা যে কম কম থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। প্রস্তাবটা লুফে নিলেন তিনি। সাউথ কেনসিংটন থেকে চিঠির জবাবে লিখলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হওয়ার প্রস্তাব আমি সাদরে গ্রহণ করছি।’ কবে নাগাদ যোগ দিতে পারবেন সে প্রশ্নের জবাবে জানালেন, ১৯২০ সালের ১ ডিসেম্বর যোগ দেবেন তিনি। পাশ্চাত্যে তখন টানটান উত্তেজনা চলছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে। টাইমসহ বড় বড় পত্রিকা তাকে অভিনন্দন জানাল। দুই সন্তান ও স্ত্রী মাবেল হার্টগকে নিয়ে চলে এলেন কলকাতায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পের অফিস তখন কলকাতায়। নতুন বাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার জন্য ২ মাসের অগ্রিম আবেদন করেন তিনি। প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ ছিল না বলে বিনা শর্তে সে টাকা তাকে দেওয়া হয়নি। ব্যক্তি ফিলিপ ছিলেন কাজপাগল। এসব অসুবিধা তার গায়ে লাগেনি। একজন শিক্ষাবিদ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন। জাঁকজমকপূর্ণ গভর্নমেন্ট হাউজ তার জন্য বরাদ্দ করা হলে তাতে তিনি সায় দেননি। কারণ ঢাবি থেকে গভর্নমেন্ট হাউজ ছিল বেশ দূরে।

নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড ও বোরনের মতো অনেক আধুনিক মানুষ ছিলেন হার্টগের বন্ধুস্থানীয়। ব্রিটেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে ঘুরে অনেক মানুষের পরামর্শ নিয়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সাজানোর চেষ্টা করেন। পূর্ববঙ্গের মুসলিম সংস্কৃতির কথাও মাথায় রাখেন তিনি। উপমহাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে গিয়ে নতুন করে বিশ্ববিদ্যালয় সাজানোর স্বপ্ন দেখেন। জার্মান ও ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা থাকায় তার সুবিধা হয় এই কাজ বাস্তবায়নের পথে হাঁটতে। জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায়চৌধুরীর ‘সাহিত্যসমাজ’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। একজন নতুন মুখ হিসেবে মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা ও নিষ্ঠার প্রমাণ দেওয়ার জন্য সেই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে মুসলিম প্রতিনিধিদলের আলোচনার ফসল এই বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের সর্বাধিক প্রচেষ্টা থাকবে অধিকসংখ্যক মুসলমান ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয়ে টেনে আনতে। তাদের শিক্ষিত করতে হবে যেন রাজনৈতিক ব্যাপারে তারা আরও বেশি অংশ নিতে পারে। ভবিষ্যৎ বাংলার সরকার পরিচালনার যথেষ্ট যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দেয়। তার মানে এই দাঁড়ায় না যে কেবল মুসলিমদের জন্যই এই বিশ্ববিদ্যালয় উন্মুক্ত। এই বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য উন্মুক্ত। অন্তত আমি যত দিন আছি।’

ব্রিটিশ নাগরিক ফিলিপ জোসেফ হার্টগ ১৮৬৪ সালের ২ মার্চ লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আলফন্সে হার্টগ ছিলেন ইহুদি বংশোদ্ভূত। হার্টগের পরিবার তাদের আদি বাসস্থান হল্যান্ড থেকে ফ্রান্সে চলে গেলে প্যারিসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তারা। আলফন্সে হার্টগ লন্ডনে ফরাসি ভাষার শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন।

জোসেফ হার্টগ লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ স্কুল ও ম্যানচেস্টারে ওয়েন্স কলেজে প্রাথমিক শিক্ষা নেন। তিনি ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮৮০ সালে বিএসসি ডিগ্রি এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৮৮৫ সালে রসায়নশাস্ত্রে বিএসসি (অনার্স) ডিগ্রি লাভ করেন। বেশ কয়েক বছর হার্টগ ফ্রান্স ও জার্মানিতে রাসায়নিক গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন।

১৮৯১ সালে ম্যানচেস্টারে ওয়েন্স কলেজে রসায়নের সহকারী প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন হার্টগ। কিছুদিনের জন্য তিনি ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ প্রকল্পে খণ্ডকালীন সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯০৩ সাল থেকে দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক রেজিস্ট্রার পদে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৬ সালে তাকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গভর্নিং বডিতে রাজ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯১৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য ছিলেন। এ কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন মাইকেল স্যাডলার। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক রেজিস্ট্রার থাকাকালে ভারতের গভর্নর জেনারেল জোসেফ হার্টগকে ১৯২০ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে পাঁচ বছরের জন্য নবপ্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিয়োগ দান করেন। তিনি ১৯২০ সালের ১০ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের গভর্নর জেনারেল তাকে সিআইই খেতাবে ভূষিত করেন। জোসেফ হার্টগ ১৯২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯২৫ সালে হার্টগকে সম্মানসূচক এলএল.ডি ডিগ্রি প্রদান করে।

ফিলিপ জোসেফ হার্টগ ইন্ডিয়ান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য, ১৯২৮-২৯ সাল মেয়াদে ভারতীয় শিক্ষাবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান এবং পরীক্ষাগুলোর নির্ভরযোগ্যতা অনুসন্ধানের জন্য গঠিত একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার ইংলিশ কমিটির ডিরেক্টর ছিলেন। ইন্ডিয়ান স্ট্যাটুটরি কমিশন কর্র্তৃক ভারতে শাসনতান্ত্রিক অগ্রগতি সম্পর্কিত তদন্তকাজের অংশবিশেষ পরিচালনার দায়িত্ব তার ওপর অর্পণ করা হয়েছিল। লন্ডনে বসবাসরত উদারপন্থি ইহুদিদের ধর্মমন্দির (সিন্যাগগ) পরিচালনা পরিষদের তিনি একজন সদস্য ছিলেন। ১৯৩০ সালে তাকে নাইটহুটে ভূষিত করা হয়।

হার্টগ ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি, হিন্দি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তার রচিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে An Examination of Examinations, The Marks of Examination, Culture : Its History and Meaning.

অধ্যাপক জর্জ হ্যারি ল্যাংলি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় উপাচার্য ছিলেন জর্জ হ্যারি ল্যাংলি। ১৪ জুলাই ১৮৮১-১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষাবিদ ব্রিটিশ নাগরিক জর্জ হ্যারি ল্যাংলি ১৮৮১ সালের ১৪ জুলাই লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯০৬ সালে স্নাতক এবং ১৯০৯ সালে দর্শনশাস্ত্রে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।

হ্যারি ল্যাংলি ১৯১৩ সালে ইন্ডিয়ান এডুকেশন সার্ভিসে যোগ দেন এবং কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক পদে নিয়োগ লাভ করেন। ওই বছরই তিনি ঢাকা কলেজে দর্শনশাস্ত্রের অধ্যাপক পদে যোগ দেন। তিনি ১৯২১ সাল পর্যন্ত ঢাকা কলেজে কর্মরত ছিলেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠালগ্নে তিনি দর্শন বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। ১৯২১ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকা হলের প্রাধ্যক্ষ ছিলেন। ১৯২৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিযুক্ত হন। ১৯৩৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত তিনি উপাচার্য পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

১৯২১ সালে ল্যাংলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য এবং ১৯২৪ সালে এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলের সদস্য ছিলেন। ১৯৩৩-৩৪ সালে তিনি ভারতের ইন্টার ইউনিভার্সিটি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৪৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের কাউন্সিল সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৩০ সালে অনুষ্ঠিত সপ্তম ইন্ডিয়ান ফিলসফিক্যাল কংগ্রেসে সভাপতিত্ব করেন এবং ১৯৩৪ সালে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ভারতীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তৃতীয় সম্মিলনেও সভাপতিত্ব করেন তিনি। ১৯৫১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

স্যার এ এফ রহমান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বাঙালি উপাচার্য স্যার এ এফ রহমানের পুরো নাম আহমেদ ফজলুর রহমান। এ এফ রহমান ছিলেন একাধারে একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ, রাজনীতিবিদ, সমাজসংস্কারক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ। ১৯৩৪ সালের ১ জুলাই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের

তৃতীয় উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান।

ফজলুর রহমান স্কুলজীবন থেকেই তার মেধার দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন। তিনি জলপাইগুড়ি জিলা স্কুল থেকে ১৯০৮ সালে বৃত্তিসহ প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৯১২ সালে ইংল্যান্ডে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ (সম্মান) ইতিহাসে ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে তিনি দুই বছর গবেষণা করেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি’। ইংল্যান্ড থেকে বাড়ি ফিরে ১৯১৪ সালে এবং আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। ১৯২১ সাল পর্যন্ত ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের একজন সদস্য হিসেবে স্যার এ এফ রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বাঙালি ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এর প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর পি জে হার্টগের অনুরোধে স্যার এ এফ রহমান ইতিহাস বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক পদে যোগ দেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হলের (বর্তমানে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল) প্রথম প্রভোস্ট হিসেবে নিযুক্ত হন। স্যার এ এফ রহমানের দক্ষতা ও সক্ষমতায় খুশি হয়ে ব্রিটিশ সরকার ১ জুলাই ১৯৩৪ সালে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিযুক্ত করেন। তিনি সফলতার সঙ্গে ১৯৩৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৩৭ সালে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনারারি ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া হয়। ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে রাজকীয় খেতাব ‘নাইটহুড’ সম্মাননায় ভূষিত করে। ১৯৪৫ সালের ১০ ডিসেম্বর পরলোকগমন করেন মহান এই শিক্ষাবিদ।

অধ্যাপক আর সি মজুমদার

অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদার ছিলেন শিক্ষাবিদ ও বাঙালি ঐতিহাসিক। তিনি ১৮৮৮ সালের ৪ ডিসেম্বর ফরিদপুরের খন্দরপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। হলধর মজুমদার ও বিন্দুমুখীর ছেলে রমেশচন্দ্র মজুমদার ছিলেন একজন মেধাবী ছাত্র। তিনি ১৯০৯ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাস বিষয়ে সম্মানসহ স্নাতক এবং ১৯১১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অধীনে রমেশচন্দ্রের ঐতিহাসিক গবেষণা শুরু হয়। ‘অন্ধ্র-কুষাণ কাল’ নামক গবেষণাপত্রের জন্য ১৯১২ সালে তিনি প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন। ১৯১৩ সালে ঢাকা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে তার কর্মজীবন শুরু হয় এবং ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের প্রভাষক নিযুক্ত হন।

১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় রমেশচন্দ্র মজুমদারের ‘Corporate life in Ancient India ’ শীর্ষক পিএইচডি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। ১৯২১ সালের জুলাই মাসে তিনি নবস্থাপিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। ১৯২৪ সালে Early History of Bengal নামে তার ছোট একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। Outline of Ancient Indian History and Civilization (পরবর্তী নাম Ancient India) প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে। এ সময় তিনি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ওপর উৎসাহী হয়ে ওঠেন। তিনি ফরাসি ও ডাচ্ ভাষা শেখেন এবং ভিয়েতনাম অঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ওপর ১৯২৭ সালে চম্পা নামে একটি বই প্রকাশ করেন। ১৯২৮ সালে তিনি লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম, লেইডেনের কার্ন ইনস্টিটিউটে ও প্যারিসের বিবলিওতেক ন্যাশনালেতে পড়াশোনা করেন। এরপর তিনি বেলজিয়াম, ইতালি ও জার্মানি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত এলাকা ঘুরে দেখেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ ভ্রমণ-পরবর্তী সময়ে তাকে প্রায় পাঁচটি বই লিখতে সহায়তা করেছিল। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুই খণ্ডের বই সাভারনেটভিপা। এসব খণ্ডের টুকরো টুকরো উপাদান জোড়া দিয়ে লেখা হয়েছে Hindu Colonies in the Far East। এটি প্রথম ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত হয় এবং এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে।

ঢাকায় অবস্থানকালে মজুমদার তিন খণ্ডে বাংলার পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার পরিকল্পনা করেন, যেগুলোর মধ্যে প্রাচীনকালের ওপর লেখা প্রথম খণ্ড তিনি নিজে সম্পাদনা করেন এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড সম্পাদনার দায়িত্ব অর্পিত হয় স্যার যদুনাথ সরকারের ওপর। ১৯৪৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম খণ্ডটি প্রকাশ করে। প্রাচীন বাংলার ওপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার প্রয়াস হিসেবে এটি বিশ্বব্যাপী পণ্ডিত মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। ১৯৩৬ সালে রমেশচন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে নিযুক্ত হন। ১৯৪২ সাল পর্যন্ত এ পদে তিনি অধিষ্ঠিত ছিলেন।

ভারতীয় বিদ্যাভবন সিরিজের ১১টি খণ্ডে রচিত History and Culture of the Indian People ছিল মজুমদারের এক গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি। এই প্রকল্পে ৭৫ জন পণ্ডিত কাজ করেন এবং তাদের অনেকের সবগুলো খ- প্রকাশিত হওয়ার আগেই মৃত্যু হয়।

এসব পণ্ডিতের অংশগ্রহণ সত্ত্বেও সিরিজের মোট পৃষ্ঠার অর্ধেকেরও বেশি লিখেছিলেন মজুমদার নিজেই। মূলত প্রাচীন ইতিহাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা সত্ত্বেও অবস্থার চাপে তাকে আধুনিককালের ইতিহাসচর্চায়ও হাত দিতে হয়েছিল। বৃদ্ধ বয়সে তাকে মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের ইতিহাসের ওপর গবেষণা করতে হয়েছে। প্রায় ৯ হাজার পৃষ্ঠা, ২৮৩টি প্লেট ও ২০টি মানচিত্র-সংবলিত ওই খ-গুলো শেষ করতে হয়েছে।

১৯৫০ সালে তিনি ‘ইন্দোলজি কলেজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে সেখানে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন এবং এর উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে মজুমদার ‘International Commission for a History of the Scientific and Cultural Development of Mankind’-এর সদস্য এবং সহসভাপতি নির্বাচিত হন। এই সিরিজের প্রথম গ্রন্থটি পশ্চিমা পণ্ডিতদের দ্বারা পরিবেশিত ভুল তথ্য যুক্ত ছিল। তিনি তার বিশেষ টীকা যোগ করে তা সংশোধনের পর প্রকাশ করেন।

‘স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস’ প্রকল্পে মজুমদার ভারতীয় সরকারের সঙ্গে মন-কষাকষি শুরু হয় তার। এই দ্বন্দ্ব তাকে The Sepoy Mutiny and the Revolt of 1857 এবং History of Freedom Movement in India নামের ৪টি সুবিশাল বই রচনায় উদ্বুদ্ধ করে। ১৯৫৫ সালে মজুমদার নাগপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্দোলজি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত তিনি শিকাগো ও পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ইতিহাসের ওপর শিক্ষাদান করেন। ১৯৬৬-৬৮ সাল পর্যন্ত তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি এবং ১৯৬৮-৬৯ সাল পর্যন্ত বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি ছিলেন। কিছুদিনের  জন্য তিনি কলকাতার শেরিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এইচ সি রায়চৌধুরী ও কালীকিংকর দত্তের সঙ্গে তিনি Advanced History of India  রচনা করেন। ভারতীয় ইতিহাসের ওপর রচিত স্নাতকপর্যায়ের একটি নির্ভরযোগ্য পাঠ্য ছিল এটি। অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে অতিথি বক্তা ও লেকচারার হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হতো। ৯২ বছর কর্মময় জীবন শেষে ১৯৮০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয় রমেশচন্দ্র মজুমদারের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত